Published : 05 Jun 2026, 10:41 PM
মধ্যপ্রাচ্যের শ্রম বাজারে জনশক্তি রপ্তানিতে এক সময় চট্টগ্রাম জেলার ‘আধিক্য’ থাকলেও এখন তা পিছিয়েছে।
বিগত কয়েক বছরে জনশক্তি রপ্তানিতে এগিয়ে কুমিল্লা জেলা। এরপরের অবস্থানে রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর।
জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরোর কর্মকর্তারা বলছেন, নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের প্রতি ঝোঁক, সব ধরনের পেশায় সম্পৃক্ত না হওয়া এবং নিজ জেলায় কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকায় বিদেশ গমনে আগ্রহ কমছে চট্টগ্রামের মানুষের।

জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, ২০০৫ সালের আগ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে জনশক্তি রপ্তানিতে এগিয়ে ছিল চট্টগ্রাম। এরপরে চট্টগ্রামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যেতে শুরু করে কুমিল্লা, চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা।
২০১৯ সাল থেকে চট্টগ্রাম থেকে জনশক্তি রপ্তানি নিম্নগামী।
জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরোর ওয়েবসাইট ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্লাটফর্মের (ওইপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম থেকে চাকরির জন্য বিদেশ গেছে ৮৭ হাজার ৫২৪ জন।
একই সময়ে কুমিল্লা থেকে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৩৩ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৩৩৮ জন এবং চাঁদপুর থেকে বিদেশ গেছে ৮৪ হাজার ৯২৪ জন।
তবে ২০২৪ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত জনশক্তি রপ্তানির হিসাব ধরলে চট্টগ্রামের চেয়ে এগিয়ে আছে চাঁদপুর।
২০২৩ সালে চট্টগ্রাম থেকে বিদেশ গেছে ৭ হাজার ৪০৮ জন, কুমিল্লা থেকে ১৫ হাজার ১৩৮, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ১৪ হাজার ৬৫৩ জন ও চাঁদপুর থেকে ১ হাজার ৪৪ জন।
২০২৪ সালে চট্টগ্রাম থেকে ৩৮ হাজার ১৬২ জন, কুমিল্লা থেকে ৭৩ হাজার ৭৩৩ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ৫৯ হাজার ৯২৭ জন এবং চাঁদপুর থেকে ৪০ হাজার ৭৫৪ জন বিদেশ গেছে।
২০২৫ সালে চট্টগ্রাম থেকে ৪১ হাজার ৮৩৩ জন, কুমিল্লা থেকে ৭৬ হাজার ৫০১ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ৬৭ হাজার ২১৭ জন ও চাঁদপুর থেকে ৪২ হাজার ৯৮২ জন বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম থেকে গেছেন ১২১ জন, কুমিল্লা থেকে ২৬১, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ৫৪১ ও চাঁদপুর থেকে ১৪৪ জন গেছেন।
জনশক্তি রপ্তানির সঙ্গে সম্পৃক্তদের ভাষ্য, চট্টগ্রামের লোকজন মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই ও ওমানে যেতে বেশি আগ্রহী। সেখানে চট্টগ্রামের লোকজন বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। যারা নতুন করে বিদেশে যেতে চায়, তারাও সেখানে গিয়ে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাজ করার প্রতি আগ্রহী।
এই দুই দেশে ভিসা বন্ধ ও ধীরগতির কারণে বিদেশযাত্রা অনেকটা কমে এসেছে। তবে ইদানীং সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারে যাচ্ছেন অল্প কিছু বিদেশগামী। এছাড়াও চট্টগ্রামে কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকায় চট্টগ্রামের অনেক লোক এখন বিদেশে চাকরির খোঁজে যেতে চান না।
জনশক্তি ও কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) চট্টগ্রাম কার্যালয়ে এক দশকের বেশি সময় ধরে দায়িত্বে ছিলেন জহিরুল আলম মজুমদার। বর্তমানে তিনি সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের ১৭৬টি দেশে কর্মী যায়। তবে চট্টগ্রামের লোক যায় মধ্যপ্রাচ্যের নির্দিষ্ট কিছু দেশে, যেগুলোর মধ্যে অন্যতম ওমান ও দুবাই (সংযুক্ত আরব আমিরাত)। এসব দেশে ভিসা বন্ধ থাকায় চট্টগ্রাম থেকে জনসংখ্যা রপ্তানি কমেছে।”
ওমানে যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে ৬০ শতাংশই চট্টগ্রাম অঞ্চলের জানিয়ে তিনি বলেন, “চট্টগ্রামের লোকজন আঞ্চলিকতাকে প্রাধান্য দেয়। অন্য জেলার লোকজন কাজের সুবাদে যেকোনো দেশে যেতে আগ্রহী।
“তবে সেক্ষেত্রে চট্টগ্রামের লোকজন একটু ব্যতিক্রম। তারা নিজ এলাকার লোকজন যে দেশে বেশি, সেখানেই মূলত যেতে চান।”
জহিরুল আলম মজুমদারের পর্যবেক্ষণ, চট্টগ্রামের লোকজন সচরাচর সব ধরনের কাজ করতে চান না। তারা মূলত ব্যবসা এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে আগ্রহী। দুবাই, ওমানে চট্টগ্রামের লোকজন বেশি থাকায় সেদিকে যাবার প্রবণতাও বেশি।
এদিকে নিজ জেলায় কর্মসংস্থানের সুযোগের কারণে চট্টগ্রাম থেকে বিদেশগামী কর্মী কমার বিষয়টিও বলছেন জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরোর এ কর্মকর্তা।
জহিরুল বলেন, “চট্টগ্রামে বিভিন্ন ধরনের কারখানা গড়ে উঠেছে। সেগুলোতে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যার কারণে কাজের ক্ষেত্রও বেড়েছে।
“কেউ এক পেশায় থাকলে, সে অন্য পেশায় সহজেই যেতে পারছে। যেটা অন্য অঞ্চলের ক্ষেত্রে সম্ভব হয়ে উঠে না।”

জহিরুল আলম বলেন, “চট্টগ্রাম অঞ্চলের লোকজন তুলনামূলক কম পরিশ্রমী। বিদেশে গিয়ে অতিরিক্ত পরিশ্রমের চেয়ে, নিজ দেশে থেকে আয় রোজগারের বিষয়টিও এখন তাদের ভাবনায় যুক্ত হয়েছে।”
এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত পোষণ করে অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (অ্যাটাব) সাবেক চেয়ারম্যান মো. আবু জাফর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চট্টগ্রামের লোকজন মূলত যেতে চান ওমান, দুবাই কুয়েত ও সৌদি আরব। এসব দেশগুলোতে ভিসা বন্ধ থাকায় বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের লোকজনের সংখ্যা কমেছে।
“চট্টগ্রামের লোকজন সব ধরনের পেশায় কাজ করতে চান না। আর চাকরির উদ্দেশ্যে কম যান। তারা যেতে চান ব্যবসা করতে। আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে তারা গিয়ে ব্যবসা বাণিজ্যে যুক্ত হয়ে যান।”
আবু জাফর বলেন, “চট্টগ্রামে কাজের বিভিন্ন সোর্স আছে, যেটা অন্য জেলার লোকজনের নেই। অনেক দেশ আছে দৈনিক ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা মজুরিতে কাজ করতে হয়।
“এসব দেশে চট্টগ্রামের লোকজন যায় না, কারণ দেশে তার আয় রোজগার আরও বেশি হয়।”