১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

নৌযান চলাচলের পথে জালের ফাঁদ, ‘আল্টিমেটামের’ পর অভিযানে বন্দর

“জালের কারণে লাইটার জাহাজ আটকে গেলে নৌকায় থাকা জেলেরা জাহাজ লক্ষ্য করে অনবরত পাথর ছুড়তে থাকে। কখনো কখনো দা বা ধারালো অস্ত্র নিয়ে জাহাজে হামলাও করে।”

নৌযান চলাচলের পথে জালের ফাঁদ, ‘আল্টিমেটামের’ পর অভিযানে বন্দর
চট্টগ্রাম বন্দরের চ্যানেলে কর্ণফুলী নদীতে জাল পেতে নৌযান চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোর অপরাধে বুধবার ২৪ জন জেলেকে আটক করে বন্দর, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের যৌথ অভিযান দল। ছবি: চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ

চট্টগ্রাম ব্যুরো

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 12 Aug 2026, 09:32 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:49 PM

চট্টগ্রাম বন্দরের চ্যানেল ও বহির্নোঙরে জেলেদের জালের ‘ফাঁদ’ সরিয়ে জাহাজ চলাচলের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে অবশেষে যৌথ অভিযান চালিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড। 

বুধবার এ অভিযানে জাল পেতে রাখার অভিযোগে ২৪ জনকে আটক করার পর প্রত্যেককে এক মাস করে কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমান আদালত।

বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে জেলেদের জাল নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসছিল। তাদের অভিযোগ, জেলেরা কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন অংশে জাল পায় জাহাজ চলাচলের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।  

মাদার ভেসেল (বড় আকারের জাহাজ) পরিচালনাকারী শিপিং প্রতিষ্ঠানগুলোও বলে আসছে, নৌপথে পাতা জালের কারণে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে; তাতে শিপিং সেক্টরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে। 

গত কয়েক মাস ধরে এই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে জানিয়ে বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ন বন্দর চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে ১৭ অগাস্টের মধ্যে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানায়। 

এক বছরে তিনবার চিঠি দেওয়ার পরও ‘কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায়’ লাইটারেজ শ্রমিক নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। 

সবশেষ এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সময় বেঁধে দিয়ে সোমবার বন্দর চেয়ারম্যানকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ন। সেই প্রেক্ষাপটে বুধবার একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এরপর বুধবারই শুরু হয় যৌথ অভিযান।

অভিযান পরিচালনাকারী দল চট্টগ্রাম বন্দরের চ্যানেলে কর্ণফুলী নদীতেই জাল পেতে রাখার প্রমাণ পায়। এরপর ২৪ জেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় ভ্রাম্যমান আদালত। 

জালের ফাঁদে যত বিপদ 

বন্দর চেয়ারম্যানকে দেওয়া বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের চিঠিতে বলা হয়, পতেঙ্গা জেলেপাড়া থেকে পারকি বিচ, বহির্নোঙরের আলফা এলাকা থেকে কুতুবদিয়া এবং পতেঙ্গা সৈকত থেকে ভাসানচর পর্যন্ত জেলেরা জাল পেতে মাছ ধরার কারণে লাইটার জাহাজগুলো চলাচলে অসুবিধা হচ্ছে এবং বড় জাহাজের প্রপেলারে জাল জড়িয়ে বিপদ তৈরি হচ্ছে।

“নৌ চলাচলের চ্যানেলে জাল বসানো সম্পূর্ণরূপে অবৈধ হলেও জেলেরা কোন আইন বিধির তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।”

বুধবার বন্দর, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের যৌথ অভিযানে চট্টগ্রাম বন্দরের চ্যানেলে মাছ ধরার জাল পেতে রাখার প্রমাণ মেলে। ছবি: চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ

বুধবার বন্দর, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের যৌথ অভিযানে চট্টগ্রাম বন্দরের চ্যানেলে মাছ ধরার জাল পেতে রাখার প্রমাণ মেলে

বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. মিজানুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চলাচলের পথে জাল পাতা থাকলে প্রপেলারে পেঁচিয়ে জাহাজের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। এতে নিয়মিত ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে। যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। 

“৪২ বছর ধরে এই পেশায় আছি। গত বছর থেকে এই প্রবণতা দেখছি। আগে কখনো এত বেশি জাল পাতার ঘটনা দেখিনি। বর্ষা মৌসুমে এই জালের উপদ্রব বাড়ে। শীতে কিছুটা কমে।” 

সাগর ও নদীতে শুধু মাছ ধরার উদ্দেশ্যে এসব জাল পাতা হয় না দাবি করে মিজানুর রহমান বলেন, “জালের কারণে লাইটার জাহাজ আটকে গেলে নৌকায় থাকা জেলেরা জাহাজ লক্ষ্য করে অনবরত পাথর ছুড়তে থাকে। কখনো কখনো দা বা ধারালো অস্ত্র নিয়ে জাহাজে হামলাও করে। 

“জাহাজের লোকজন জাল কেটে প্রপেলার ছাড়ানোর চেষ্টা করলে জাল পাতা লোকজন এসে মোটা অংকের ক্ষতিপূরণ দাবি করে। কখনো কখনো লুটাপাট ও ডাকাতি করে। জাল পাতা এক ধরনের জিম্মি করার ফাঁদ। টাকা না দিলে জাহাজের সুকানি ও মাস্টারকে ধরে নিয়ে যাবে বলে হুমকি দেয়। সাগরের বিভিন্ন অংশে এরকম কয়েকটি চক্র আছে।” 

সোমবার ফেইসবুকে মো. ফরিদ নামের এক ব্যক্তির প্রকাশ করা ২৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে লাইটার জাহাজ লক্ষ্য করে একটি নৌকা থেকে অনবরত ঢিল ছোড়ার দৃশ্য দেখা যায়। 

জানতে চাইলে মিজানুর রহমান বলেন, “এরকম অনেক ভিডিও ফেইসবুকে দেখতে পাবেন। নিয়মিতই এরকম হামলা হচ্ছে। গত জুন থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিদিন একটি-দুটি ঘটনার খবর পাই।” 

আমদানি পণ্য বন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্য নিয়ে যায় এসব লাইটার জাহাজ। এছাড়া বন্দরের পথে আমদানি-রপ্তানি পণ্য নিয়ে চলাচল করে মাদার ভেসেল। 

একটি আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানির একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নৌপথে যেখানে সেখানে জাল পাতা ও নৌকা রাখার কারণে প্রতিনিয়িত জাহাজ চলাচলে সমস্যা হচ্ছে, বিশেষ করে রাতে। 

“প্রপেলারে জাল আটকে যাওয়ায় জাহাজের সাথে অন্য জাহাজ বা নৌযানের সংঘর্ষ হয়। এতে শিপিং সেক্টরে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হচ্ছে। বর্ষায় জাল পাতার ঘটনা বেশি হয়। আর শীতে মাছ ধরার ট্রলারের অবাধ বিচরণ সমস্যা তৈরি করে।” 

চট্টগ্রাম বন্দরের চ্যানেল ও বহির্নোঙরের এই সমস্যা নিরসনে ‘অতি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “তা না হলে বিশ্বব্যাপী একটি নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে।”

বন্দর চেয়ারম্যানকে বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, “কিছুদিন পূর্বে ভাসানচর এলাকা থেকে জেলেরা দুই জাহাজের একজন মাস্টার ও একজন সুকানিকে নিয়ে যায়। পরে স্থানীয় লোকজনর সহযোগিতায় তাদের উদ্ধার করা হয়। ফলে নাবিকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।”

ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে নৌকা থেকে লাইটার জাহাজে পাথর ছুড়তে দেখা যায়। লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের দাবি, পেতে রাখা জালে জাহাজ আটকে গেলে এভাবে পাথর ছোড়া হয়। জাল কাটতে গেলে ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়। ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি।

ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে নৌকা থেকে লাইটার জাহাজে পাথর ছুড়তে দেখা যায়। লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের দাবি, পেতে রাখা জালে জাহাজ আটকে গেলে এভাবে পাথর ছোড়া হয়। জাল কাটতে গেলে ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়। ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি।

এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে গত বছরের ৭ অগাস্ট ও ১৭ অগাস্ট এবং চলতি বছরের ২০ জুলাই বন্দর চেয়ারম্যানকে পরপর তিনটি চিঠি দেয় সংগঠনটি। 

১৭ অগাস্টের মধ্যে জেলেদের পাতানো জাল সরানো না হলে শ্রমিকরা জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেবে বলে হুঁশিয়ারি দেন সংগঠনটির নেতারা। 

অবশেষে অভিযান

চিঠি পাওয়ার পর বুধবার জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরের সীমা, প্রবেশপথ, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথ ও বহির্নোঙরে অননুমোদিত নৌযান চলাচল, অবৈধভাবে মাছ ধরার জাল স্থাপন ও মাছ ধরা সম্পূর্ণ অবৈধ।

এর ফলে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানায় বন্দর কর্তৃপক্ষ। 

বুধবারই জাহাজ চলাচল নিরাপদ করতে অভিযানে নামে বন্দর কর্তৃপক্ষ। অভিযানে অংশ নেয় নৌবাহিনী এবং কোস্টগার্ড। 

বন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাদিয়া আফরিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নৌযান চলাচলের পথে প্রতিবন্ধকতা অপসারণ ও জাহাজে পণ্য মজুদের বিরুদ্ধে আজকের অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে গিয়ে আমরা বন্দরের চ্যানেলে কর্ণফুলী নদীতে পেতে রাখা জাল পেয়েছি। 

“এই অপরাধে ২৪ জনকে আটক করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তাদের এক মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল অধ্যাদেশ অনুসারে এভাবে জাল পাতা অপরাধ।” 

জাল পাতার এই প্রবণতা থামাতে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি। 

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, “নৌপথ নিরাপদ রাখা একটি চলমান প্রক্রিয়া। সচেতনতার জন্য গণবিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। অভিযানও চলবে।”