২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

‘একাধিকবার ঘর ছাড়তে চেয়েছিল মিতু’

সাত বছর আগে মেয়ে খুন এবং ওই সময়কার আগে-পরের ঘটনা তুলে ধরার সময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা বাবুলের স্ত্রী মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন।

‘একাধিকবার ঘর ছাড়তে চেয়েছিল মিতু’

সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে মিতু হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরুর দিনে কারাগার থেকে তার স্বামী বাবুল আক্তারকে আদালতে আনা হয়।

মিঠুন চৌধুরী মিঠুন চৌধুরী

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 09 Apr 2023, 11:01 PM

Updated : 10 Apr 2023, 12:23 AM

মাহমুদা আক্তার মিতু হত্যাকাণ্ডের পেছনে তার স্বামী বাবুল আক্তারের ‘ইন্ধন’ থাকার সন্দেহের কথা ঘটনার দিনই পুলিশ কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন বলে দাবি মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেনের।

এ দম্পতির দাম্পত্যে কলহের কারণ কক্সবাজার থাকাকালে এক বিদেশি নারী এনজিও কর্মীর সঙ্গে বাবুলের সম্পর্ক জড়ানো, যা তুলে ধরে আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে মোশাররফ বলেন, “এ ঘটনা জানার পর চট্টগ্রামে ফিরে মিতু নিজ বাসায় আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন।”

বাবুলের ওই সম্পর্কের জের ধরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের অবনতি এবং মিতুর একাধিকবার ঘর ছাড়তে চাওয়ার কথাও এ মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে আদালতে তুলে ধরেন তিনি।

রোববার চট্টগ্রামের তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জসিম উদ্দিনের আদালতে মিতুর বাবা সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেনের সাক্ষ্য দেওয়া শুরুর মাধ্যমে সাত বছর আগের এ ঘটনার বিচার শুরু হয়।

চাঞ্চল্য তৈরি করা এ হত্যাকাণ্ড ও বিভিন্ন সময় পট পরিবর্তনের মাধ্যমে আলোচনায় আসা এ মামলায় মিতুর বাবা একদম শুরুর দিকে খুনের ঘটনায় বাবুল আক্তারের দোষ দেখতে না পেলেও পরে তার বিপক্ষে অবস্থান নেন।

প্রথম দিনের সাক্ষ্যে তিনি হত্যাকাণ্ডের জন্য সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারকে দায়ি করেন। অপর এক নারীর সঙ্গে বিবাহ বর্হিভূত সম্পর্কে জড়ানো এবং সেটি থেকে মিতু-বাবুলের মধ্যে সম্পর্কের বর্ণনা দেন।

Image

বাবুল আক্তার ও মাহমুদা আক্তার মিতু

এদিন বেলা ১২টায় শুরুর পর মাঝে আধ ঘণ্টা বিরতি দিয়ে বিকাল সোয়া ৩টা পর্যন্ত সাক্ষ্য দেন মোশাররফ। তার সাক্ষ্য অসমাপ্ত রেখেই দিনের কার্যক্রম শেষ হয়। আদালত আগামী ২ মে সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী দিন নির্ধারণ করেছেন।

দীর্ঘ সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আদালতে মোশাররফকে কয়েক দফায় কান্না করতে দেখা যায়। তিনি হত্যাকাণ্ডের পরের ঘটনা থেকে শুরু করে এ দম্পতির মধ্যে কলহ, হত্যার পর জানাজা ও দাফন, বাবুল আক্তারের বাদী হয়ে মামলা করা, পরে তাদের ঢাকার বাসায় বাবুলের অবস্থান, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাবুলকে ডিবি অফিসে নেওয়ার ঘটনার বর্ণনা দেন।

পাশাপাশি কক্সবাজারে বাবুলের কর্মরত অবস্থায় একজন নারী এনজিও কর্মীর সঙ্গে তার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া এবং মিতুর তা জেনে যাওয়া, এর জেরে মিতু-বাবুলের সম্পর্কের অবনতি, মিতুর একাধিকবার ঘর ছাড়া ও আত্মহত্যার চেষ্টার বিষয়ে বিস্তারিত আদালতকে বলেন।

সাক্ষ্য শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “বাবুল আক্তার পরকীয়ার কারণে ষড়যন্ত্র করে মিতুকে হত্যা করেছে। আসামিদের সাথে গোপনে বৈঠক করেছে, তাদের টাকা দিয়েছে। তারপর হত্যা বাস্তবায়ন করেছে। এই বিষয়টি আজ সাক্ষ্যে বলেছি।”

এদিন এ সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মিতুর স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারসহ সাত আসামির বিচার শুরু হয়।

মামলার বাকি আসামিরা হলেন- মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম, আনোয়ার হোসেন, এহতেশামুল হক ভোলা, শাহজাহান মিয়া, কামরুল ইসলাম শিকদার মুছা ও খায়রুল ইসলাম ওরফে কালু।

বাবুল আক্তারসহ তিন আসামিকে কারাগার থেকে আদালতে আনা হয় এবং জামিনে থাকা ভোলা আদালতে হাজিরা দেন। অপরদিকে পলাতক কালু ও নিখোঁজ মুছা হাজির হননি।

‘মিতুর প্রাণ ভিক্ষা চায় ছেলে’

সাক্ষ্যের শুরুতে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন ২০১৬ সালের ৫ জুন নগরীর জিইসি মোড়ে মিতু হত্যার ঘটনার বর্ণনা দেন।

তিনি বলেন, “সকাল ৬টা ৩৩ মিনিটের দিকে আমার মেয়ে মিতু তার ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছালে একজন সন্ত্রাসী (যার নাম পরে জেনেছি- মুছা) মিতুর কাছ থেকে আমার নাতিকে কেড়ে নিয়ে যায়।”

Image

মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন

ঘটনার বর্ণনা দেওয়ার সময় কান্নারত মোশাররফ বলেন, “সন্ত্রাসীরা মিতুকে আঘাত করার সময় মিতুর ছেলে সন্ত্রাসীদের কাছে তার মায়ের প্রাণভিক্ষা চায়। মিতু মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তিন আসামি ঘটনাস্থলের পূর্ব পাশে রাখা মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়।”

মিতু হত্যার সময় অন্য আসামি ভোলা, শাহজাহান, কালু ও সাইফুল নামের চারজন দূর থেকে আসামিদের উপর নজর রাখছিল বলে সাক্ষ্যে জানান মোশাররফ।

তিনি আদালতে বলেন, হামলার পর বাসায় গিয়ে মিতুর ছেলে শুরুতে বাবুল আক্তারকে এবং এরপর তার নানীকে (মোশাররফ হোসেনের স্ত্রী শাহিদা মোশাররফকে) ফোনে তার মাকে সন্ত্রাসীরা খুন করেছে বলে জানায়।

মিতুর বাবার দাবি, “মিতুকে হত্যার সংবাদ ওই সময় বাবুল আক্তার আমাদের জানায় নাই।”

নাতির ফোনে জানতে পেরে এবং টেলিভিশনে খবর দেখে মিতুর মা, বোন ডা. শায়লা মোশাররফ নিনজা, মোশাররফের ছোট ভাই শহিদুল ইসলাম ও তার স্ত্রী এবং মোশাররফের আরেক চাচাত ভাই আকাশপথে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে রওনা হন।

‘জানিয়েছিলাম, বাবুলের ইন্ধনে হত্যা’

হত্যাকাণ্ডের পরপরই ঢাকায় অবস্থানকারী বাবুল আক্তারকে র‌্যাবের একটি হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রামে আনার ব্যবস্থা করা হয় জানিয়ে মোশাররফ বলেন, “আমার স্ত্রী এবং আত্মীয়রা বিমানে চট্টগ্রাম পৌঁছার আগেই বাবুল আক্তার সেখানে পৌঁছে।”

মিতু হত্যার খবর প্রথম টেলিফোনে নিজের স্ত্রীর কাছ থেকে জানতে পারেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমি সেদিন বরিশালে ছিলাম। স্পিডবোটে বরিশাল থেকে নোয়াখালী, সেখান থেকে মাইক্রো নিয়ে চট্টগ্রাম রওনা হই।

“পথিমধ্যে মোবাইলে ওই সময়কার চট্টগ্রাম পুলিশ কমিশনারসহ ৩-৪ জন অফিসারকে ফোন করে আমার মেয়ের খুনের ব্যাপারে জানাই যে, বাবুল আক্তারের ইন্ধনে হত্যা হয়েছে। তারা ওই মুহূর্তে ব্যস্ততার জন্য আমার কথার কোনো সঠিক জবাব দেন নাই।”

‘মিতুর লাশ শৈলকূপা নিতে চেয়েছিল বাবুল’

চট্টগ্রামে রওনা দেওয়ার পথে মিতুর জানাজা শুরুর খবর পেয়ে বারৈয়ারহাট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রাপথ বদলের কথা জানিয়ে মোশাররফ বলেন, “মিতুর লাশের গাড়ির সাথে মাইক্রোবাসে থাকা আমার পরিবারের লোকজন জানায়, লাশের গাড়ির প্রটোকলে থাকা পুলিশের গাড়িকে সিসি দেওয়া হয়েছে শৈলকূপা (বাবুল আক্তারের গ্রামের বাড়ি) যেতে।

“কর্তৃপক্ষকে (পুলিশ) ফোনে জানাই, আমাকে না দেখিয়ে লাশ শৈলকূপা নিয়ে যেতে চায়। আমার পরিবারের লোকজন বলে, মিতুর বাবা ঢাকায় তাকে লাশ দেখিয়ে নিয়ে যেতে যায়।”

এরপর পুলিশ লাশের গাড়ি ঢাকায় নিতে সম্মত হয় জানিয়ে মোশাররফ বলেন, “ঢাকার বাসায় লাশের গাড়ি ও আমার পরিবারের লোকজনের মাইক্রোবাস পৌঁছার পরপরই বাবুল আক্তার আকস্মিকভাবে আমার বাসায় পৌঁছে।”

Image
২০১৬ সালের ৫ জুন নগরীর জিইসি মোড়ে হত্যা করা হয় মাহমুদা আক্তার মিতুকে

সেদিন রাত আনুমানিক ১১টার দিকে স্থানীয় বায়তুল ফালাহ জামে মসজিদে জানাজা শেষে মেরাদিয়া কবরস্থানে মিতুকে সমাহিত করা হয় বলে জানান তিনি।

দাফনের পর ৫-৭ দিন মিতুর কবরে এবং ২০-২৫ দিন বাসায় পুলিশ প্রহরা ছিল বলে জানিয়ে তিনি বলেন, “হত্যার পরপর চট্টগ্রামে ও পরে ঢাকায় বাবুল আক্তারের মায়াকান্না, কারো জামা ছেড়া, শোকে কাউকে লাথি মারা- তা সকলকে দেখাতে করেছে।

“তখন আমাদের ধারণা হচ্ছিল সে নিজের অপরাধ ঢাকা দিতে এসমস্ত অভিনয় করছিল।”

মোশাররফ বলেন, “আমাদের অবহিত না করে নিজে বাদী হয়ে বাবুল অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীদের আসামি করে থানায় হত্যা মামলা করে।”

ঢাকায় মোশাররফ হোসেনের বাসায় অবস্থানকালে ২০১৬ সালের ২২ থেকে ২৪ জুন টানা তিন দিন পুলিশ কর্মকর্তারা সকাল ৯-১০টার দিকে বাবুল আক্তারকে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে গিয়েছিল বলে আদালতে সাক্ষ্যে জানান মিতুর বাবা।

ওই সময় ২৪ জুন পুলিশ অফিসার্স ক্লাবে ইফতার পার্টি ও মিতুর জন্য দোয়া মাহফিলে একসঙ্গে গিয়েছিলেন মোশাররফ, বাবুল ও বাবুলের দুই সন্তান।

সেই অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পর রাত ১১টার দিকে পুলিশের এসপি মর্যাদার একজন এবং জুনিয়র ৫-৭ জন কর্মকর্তা বাবুলকে নিয়ে যান বলে জানান মোশাররফ।

পরদিন সন্ধ্যার পর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বাবুলকে বাসায় পৌঁছে দেয় জানিয়ে মোশাররফ বলেন, “ওই সময় বাবুলকে এই মামলার অন্য আসামিদের সাথে মুখোমুখি করা হয় বলে শুনেছি।”

Image

ডিজিটাল নিরাপত্তা ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে পিবিআই প্রধানের করা মামলায় সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়েছিল

ওই জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে তিনি জানতে পারেন জানিয়ে আদালতে বলেন, “বাবুল মুছাকে টাকা দিয়ে অস্ত্র কেনা, পরিকল্পনা ও মিতুকে হত্যার কথা স্বীকার করে। তখন তাকে বলে, ‘আপনাকে গ্রেপ্তার করা হবে।’ দুই বাচ্চার কথা বিবেচনা করতে অনুরোধ জানিয়ে বাবুল বলে, গ্রেপ্তার না করতে। সে চাকরি ছেড়ে দেবে।”

পরে বাবুলের চাকরি ছাড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পরবর্তীকালে চাকরি ফিরে পেতে বাবুল আদালতের মাধ্যমে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তখন আমরা পুরোপুরি নিশ্চিত হই বাবুলের পরিকল্পনায় মিতুকে হত্যা করা হয়েছে।”

‘আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল মিতু’

পদোন্নতি পেয়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে কক্সবাজারে বাবুল বদলি হলে সেখানে তার সঙ্গে এক এনজিও কর্মী বিদেশি নারীর পরিচয় হয়। আদালতে ওই নারীর নাম ও ওই নারীর এক মেয়ে শিশু থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বাবুলের কক্সবাজারের বাসায় তাদের আসা-যাওয়া ও সখ্যতার বর্ণনা দেন।

ওই নারীর সঙ্গে বাবুলের ‘অনৈতিক সম্পর্ক’ গড়ে ওঠার বিষয়ে শুনেছেন জানিয়ে, মিতুর এ সম্পর্ক জেনে যাওয়ার সেই রাতের ঘটনা তুলে ধরেন।

মোশাররফ বলেন, “কক্সবাজারে মিতু থাকার সময় বাসায় মেহমান আসায় বাবুল-মিতু ও তাদের সন্তানরা এবং ওই নারী ও তার সন্তানসহ একবার হোটেলে অবস্থান করে।

“বাবুল ওই নারীর রুমে কম্পিউটারে কাজ করছিল। মিতু ডাকার পরও বাবুল আসার কথা বলে আসেনি। মিতু বাচ্চাদের নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। এরপর রাতে বাবুলকে দেখতে না পেয়ে ডাকতে গেলে, বাবুল ও ওই নারীকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পায়।”

এরপর থেকেই বাবুলের সাথে মিতুর পারিবারিক কলহ বৃদ্ধি পায় বলে জানান মোশাররফ।

তিনি বলেন, “তারপর বাবুল চট্টগ্রামে বদলি হলে তাদের পারিবারিক কলহ আরও বাড়ে। বাবুলের মানসিক ও শারীরিক এবং তার মা-বাবার দেওয়া মানসিক অশান্তির কারণে মিতু বাসায় একবার ফ্যানের সাথে ঝুলে আত্মহত্যার চেষ্টা করে।”

এরপরও একাধিকবার জিইসির মোড়ের বাসা থেকে বেরিয়ে বাবার বাড়ি চলে আসতে চাইলে ছেলে-মেয়ে, গৃহপরিচারিকা ও বাসায় ডিউটিরত কনস্টেবল মিতুকে বারবার ফেরায় বলে জানান মোশাররফ।

পুরনো খবর:

বাবার সাক্ষ্যে মিতু হত্যা মামলার বিচার শুরু
বাবুলের পরকীয়ার জেরে টাকা দিয়ে খুন, প্রথম সাক্ষ্যে অভিযোগ মিতুর বাবার