১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ফেরদৌস স্টিল: সেই জাহাজ গ্যাসমুক্ত করতে উদ্ধারকারী কোম্পানির শরণ

ব্যালাস্ট ট্যাংকের ভেতরে এত বেশি মাত্রায় হাইড্রোজেন সালফাইড কীভাবে তৈরি হল, সে বিষয়টিও তদন্ত করার কথা বলছেন বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার।

ফেরদৌস স্টিল: সেই জাহাজ গ্যাসমুক্ত করতে উদ্ধারকারী কোম্পানির শরণ
সোমবার বিকেলে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের সেই পুরনো জাহাজ পরিদর্শন করে বিশেষজ্ঞ কমিটি।

মিঠুন চৌধুরী মিঠুন চৌধুরী

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 17 Aug 2026, 08:45 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:51 PM

সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের সেই পুরনো জাহাজটি বিষাক্ত গ্যাসমুক্ত করতে এবার বেসরকারি উদ্ধারকারী কোম্পানির সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। 

ঘটনার চারদিন পরও সেই পুরনো জাহাজটি বিষাক্ত গ্যাসমুক্ত হয়নি। পূর্ণ জোয়ারের সময় সেখানে গ্যাসের উপস্থিতি না থাকলেও ভাটার সময় মিলছে বিষাক্ত গ্যাস। 

এছাড়া ওই জাহাজে আরো দুটি ব্যালাস্ট ট্যাংক (জাহাজের জলাধার) আছে। সেগুলোর ভিতর এখনো পানি আছে। ওই দুই ব্যালাস্ট ট্যাংকে কোনো ধরনের গ্যাস জমেছে কিনা তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। 

তাই জাহাজটি গ্যাসমুক্ত করতে এবার দেশীয় উদ্ধারকারী কোম্পানির সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। 

সোমবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অনিক মেরিন ও প্রান্তিক মেরিন নামের ওই দুই কোম্পানি তাদের প্রস্তাব দিয়েছে। মঙ্গলবার তারা পূর্ণাঙ্গ ‘ঝুঁকি প্রশমন পরিকল্পনা’ উপস্থাপন করবে। 

বেসরকারি কোম্পানির সহায়তা কেন জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বেসরকারি হলেও দেশে-বিদেশে রেসকিউ কোম্পানি হিসেবে তাদের সুনাম আছে। তারা আগেও সফলভাবে এরকম পরিস্থিতি সামলেছে।”

সোমবার দুই উদ্ধারকারী কোম্পানি জাহাজের গ্যাস অপসারণে একটি খসড়া পরিকল্পনা দিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “মঙ্গলবার তারা আবার নিজস্ব যন্ত্রপাতি নিয়ে ঘটনাস্থলে যাবে। গ্যাসের উপস্থিতি ও তীব্রতা পরিমাপ শেষে বিস্তারিত মিটিগেশন প্ল্যান আমাদের জানাবে।

সোমবার বিকেলে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের সেই পুরনো জাহাজ পরিদর্শন করে বিশেষজ্ঞ কমিটি। 

সোমবার বিকেলে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের সেই পুরনো জাহাজ পরিদর্শন করে বিশেষজ্ঞ কমিটি।

“এরপর করণীয় নির্ধারণ করা হবে। কোনো ধরনের ঝুঁকি ছাড়া শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আমরা জাহাজটি গ্যাসমুক্ত করতে চাই।” 

এরপর কোম্পানি দুটির কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব পর্যালোচনা করে কারা কাজ করবে তা ঠিক করবে বিশেষজ্ঞ কমিটি।

ঝুঁকি প্রশমন পরিকল্পনায় জাহাজটি বিষাক্ত গ্যাসমুক্ত করা, ব্যালাস্ট ট্যাংকের (জাহাজের জলাধার) পানি অপসারণ ও স্লাজযুক্ত পানি অপসারণ–এই তিনটি বিষয় বিবেচনায় রাখা হচ্ছে বলে জানান শফিউল আলম তালুকদার। 

ব্যালাস্ট ট্যাংকের ভেতরে এত বেশি মাত্রায় হাইড্রোজেন সালফাইড কীভাবে তৈরি হল, সে বিষয়ে তদন্ত করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, “ট্যাংকের ভেতরে কোনো জৈব পদার্থ, পয়ঃবর্জ্য, স্লাজ বা অন্য কোনো দূষিত পদার্থ ঢুকেছিল কিনা, তা পরীক্ষা করা হবে। সেখানে স্লাজ বা পয়ঃবর্জ্য থেকে থাকলে তা কীভাবে এল তাও দেখা হবে।”

আরো দুটি ব্যালাস্ট ট্যাংক

ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের ওই পুরনো জাহাজটির যে ট্যাংক থেকে গ্যাস নিঃসরণ হয়ে শুক্রবার নয় জনের মৃত্যু হয়, সেটি ছিল একটি ব্যালাস্ট ট্যাংক। 

সাগর তীরে ভাঙার জন্য রাখা অবস্থায় ব্যালাস্ট ট্যাংকগুলো পানি ভর্তি অবস্থায় রাখা হয় জাহাজের ভারসাম্য রক্ষার জন্য। 

জাহাজটি প্রায় এক বছর আগে সীতাকুণ্ড উপকূলের ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ভেড়ানো হয়। সেখানে ব্যালাস্ট ট্যাংক আছে মোট চারটি। 

ওই ঘটনায় গঠিত একটি সরকারি তদন্ত কমিটির একজন সদস্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চারটি ব্যালাস্ট ট্যাংকের মধ্যে একটি আগে কাটা হয়। সেখানে কোনো সমস্যা হয়নি। আরেকটি কাটার সময় দুর্ঘটনা ঘটে। 

“বাকি দুটি ট্যাংকে গ্যাস জমেছে কিনা তা নিশ্চিত নয়। সেগুলোতে পানি আছে। তাই ঘটনাস্থলে গ্যাসের উপস্থিতি বর্তমানে আগের তুলনায় কম হলেও খুব কাছাকাছি যাওয়াটা নিরাপদ নয়।”

সোমবার বিকেলে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের সেই পুরনো জাহাজ পরিদর্শন করে বিশেষজ্ঞ কমিটি। 

সোমবার বিকেলে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের সেই পুরনো জাহাজ পরিদর্শন করে বিশেষজ্ঞ কমিটি।

এবার বিশেষজ্ঞ কমিটি

ঘটনার তিনদিন পরও ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের ওই ঘটনাস্থলে সোমবার দুপুর পর্যন্ত যেতে পারেননি বিশেষজ্ঞ দল ও তদন্ত কমিটির সদস্যরা। পরে বিকেলে জোয়ারের সময় তারা ঘটনাস্থলের কাছাকাছি যান। 

আগে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠনের পর এবার ‘গ্যাসের উৎস সন্ধানে’ বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে। 

শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. আরিফুল ইসলাম প্রিন্স স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে রোববার ওই কমিটি গঠন করা হয়। সোমবার বিকেলে কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। 

ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে গ্যাস লিকেজের উৎস ও প্রকৃতি নিরূপণ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরসনে পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়ার জন্য এই কমিটি করা হয়েছে। 

জাহাজে আর কোনো ক্ষতিকর গ্যাস বা পদার্থ আছে কিনা তা নির্ধারণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে গ্যাস নিঃসরণের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষা নিশ্চিতে পরামর্শ দেবে ওই বিশেষজ্ঞ কমিটি। 

জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আজ শিল্প মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি এবং গতকাল গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি সেখানে গিয়েছিলাম। 

ঘটনার চারদিন পরও সেই পুরনো জাহাজটি বিষাক্ত গ্যাসমুক্ত হয়নি। পূর্ণ জোয়ারের সময় সেখানে গ্যাসের উপস্থিতি না থাকলেও ভাটার সময় মিলছে বিষাক্ত গ্যাস। 

ঘটনার চারদিন পরও সেই পুরনো জাহাজটি বিষাক্ত গ্যাসমুক্ত হয়নি। পূর্ণ জোয়ারের সময় সেখানে গ্যাসের উপস্থিতি না থাকলেও ভাটার সময় মিলছে বিষাক্ত গ্যাস।

“জোয়ারের সময় পানিতে ডুবে থাকলে সেখানে গ্যাসের অস্তিত্ব থাকে না। পূর্ণ জোয়ারের সময় আমরা যখন গিয়েছি তখন সেখানে কোনো গ্যাসের অস্তিত্ব মেলেনি। কিন্তু ভাটর সময় সেখানে গ্যাস থাকে।” 

মঙ্গলবার আবার সেখানে যাবেন জানিয়ে তিনি বলেন, “কাল বিশেষজ্ঞ কমিটিসহ গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা হবে।”

সব ধরনের বিষাক্ত পদার্থ অপসারণ করে এলাকাটি পুরোপুরি নিরাপদ না করা পর্যন্ত তদন্ত কমিটি ও বিশেষজ্ঞ দল সেখানে কাজ করবে বলে জানান শফিউল আলম।

শুক্রবার সকালে ভাটিয়ারির ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে পুরনো ওই জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংক কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাস নিঃসরণে নয়জনের মৃত্যু হয়; কমপক্ষে ৭ জন অসুস্থ হয়ে পড়েন।

ওই ঘটনা তদন্তে এখন পর্যন্ত সরকারি তিনটি এবং শিপব্রেকিং ইয়ার্ড মালিকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।