Published : 19 Jul 2025, 08:52 PM
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নাম পরিবর্তন করার অনুরোধ জানিয়েছেন কলামনিস্ট ও চিন্তক ফরহাদ মজহার।
শনিবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, “আইডিএল (ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লিগ) বিলুপ্ত করে জামায়াতে ইসলামী নামে রাজনীতিতে পুনরায় আত্মপ্রকাশ করাটা রাজনৈতিক দূরদর্শিতার ঘাটতি প্রকাশ করে।
ফরহাদ মজহার বলেন, “জামায়াতে ইসলামের নেতাদের আমি অসম্ভব পছন্দ করি, ভালোবাসি। তাদের নেতাদের আমি প্রথম দিন থেকে বলছি, ভাই আপনারা বাহাত্তরের পরে কিন্তু জামায়াতে ইসলামী নামটা রেখে দিয়েছেন; এটা অন্যায় করেছেন।
“কারণ, একাত্তরে আপনাদের যে ভূমিকা, এটা রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে যে বাংলাদেশ গঠিত হয়েছে, তার স্পিরিটের পক্ষে যায় না। তাহলে আপনারা এর আগে তো ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আইডিএল) করেছিলেন। তারপর আবার জামায়াতে ইসলামী নামটা কেন রাখছেন; আমাদেরকে অপমান করার জন্য?”
তিনি বলেন, “সেভেন্টিওয়ানের মুক্তিযুদ্ধকে যদি আপনি অপমান করতে থাকেন, আপনি আবারও কিন্তু শেখ হাসিনাকে আনবেন। আপনি যদি অপমান করেন মানুষের ইতিহাস বোধকে; তার চেতনাকে; আবারও কিন্তু ফেসিস্ট শেখ হাসিনা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে।”
আইডিএল নামে এক মোর্চার মাধ্যমে রাজনীতিতে জামায়াতের আত্মপ্রকাশ ঘটে পচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর।
বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর ওই সময় একটি অধ্যাদেশ জারি করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এএস এম সায়েম, যেখানে সংবিধানের ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।
এরপর ওই বছরের ২৪ অগাস্ট ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দল মিলে গঠন করে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ বা আইডিএল নামের একটি মোর্চা, যেখানে জামায়াতই ছিল প্রধান সংগঠন।
এরপর ১৯৭৯ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে ঢাকার ইডেন হোটেল প্রাঙ্গণে জাতীয় সম্মেলনে জামায়াতের নতুন গঠনতন্ত্র অনুমোদনের পর ২৭ মে ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’ নামে দলের তৎপরতা শুরু হয়।
চট্টগ্রামের মতিবিনিময় সভায় কথা বলতে গিয়ে দলটিকে এখন আবার নাম পরিবর্তনের ‘অনুরোধ’ জানালেন ফরহাদ মজহার।
জামায়াতকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, “আমি বিনয়ের সাথে বলি, এখনো হাতজোড় করে বলি, এটা খুব ভালো সময়, জুলাই গণঅভুত্থ্যানের পরে, আপনারা আপনাদের নামটা পরিবর্তন করেন। বাংলাদেশের জনগণের কাছে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে গড়ে উঠবার ক্ষেত্রে এটা এক নম্বর বাধা।
“দ্বিতীয়ত, ইসলাম সম্পর্কে তরুণদের যে আগ্রহ হওয়া উচিত, সেক্ষেত্রে এটা বাধা হয়ে থাকবে। বারবার এটা আসবে। বারবার বলবে, সেভেন্টিওয়ানে আপনারা কী করেছেন? লোকজন এটার জন্য ইসলামকে দায়ী করবে।”
সভায় চট্টগ্রাম বন্দর, সংবিধান ও ফ্যাসিবাদ নিয়েও কথা বলেন ফরহাদ মজহার।
তিনি বলেন, "চট্টগ্রাম হলো দেশের অর্থনীতির হৃদয়, যেখানে বন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা রয়েছে। এ শহরের ক্ষতি মানে দেশের মারাত্মক ক্ষতি। এ কারণেই চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন।
"চট্টগ্রাম বন্দরের দুর্নীতি দূরীকরণ এবং স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে। বন্দরকে ঘুষ-দুর্নীতির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে কাস্টমসকে বন্দর থেকে আলাদা করতে হবে। দুর্নীতি করার জন্য পণ্য দিনের পর দিন বন্দরে রেখে দেয় কাস্টমস কর্মকর্তারা। খেয়াল রাখতে হবে বন্দর যাতে বিদেশি স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়।"
ফরহাদ মজহার বলেন, "চট্টগ্রাম হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ। হাটহাজারীর মতো অঞ্চলে মসজিদ ও মন্দির পাশাপাশি অবস্থিত, যেখানে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ যুগ যুগ ধরে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ধর্মীয় এবং সামাজিক আচারে অংশ নিচ্ছেন। এই ঐতিহ্য যেন অক্ষুণ্ন থাকে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
"আর কখনো যেন দাড়ি-টুপি বা পাঞ্জাবি পরা কাউকে জঙ্গি কিংবা গেরুয়া বসন পরা কাউকে বিদেশি দালাল হিসেবে আখ্যায়িত করা না হয়।”
সব ধরনের ফ্যাসিবাদ মোকাবেলায সাংবাদিকদের ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে ফরহাদ মজহার বলেন, "অনেক ধরনের ফ্যাসিবাদ আছে, ধর্ম নিরপেক্ষতার ফ্যাসিবাদ, ধর্মান্ধতার ফ্যাসিবাদ- সব ফ্যাসিবাদ মোকাবেলা করতে হবে। একইসাথে ফ্যাসিবাদের আগ্রাসন থেকে গণতন্ত্র রক্ষা করে জনগণের নিজস্ব গঠনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
"বাংলাদেশের জনগণের প্রথম প্রয়োজন একটি গণমুখী গঠনতন্ত্র। জনগণকে বুঝাতে হবে, গঠনতন্ত্র কী এবং কেন তা প্রয়োজন।"
তিনি বলেন, "গঠনতন্ত্র ও সংবিধান এক নয়। সংবিধান একটি আইনি কাঠামো মাত্র, যেখানে গঠনতন্ত্র হচ্ছে রাষ্ট্র ও সংগঠন পরিচালনার মূল দর্শন। ড. কামাল হোসেন সংবিধানকে রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রবিন্দু বানিয়েছেন, যা জাতির জন্য বিভ্রান্তিকর।"
সভায় সভাপতির বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সদস্য সচিব ও দৈনিক আমার দেশের আবাসিক সম্পাদক জাহিদুল করিম কচি।
সভায় অন্যদের মধ্যে রাখেন ওয়ার্ল্ড প্রেস কাউন্সিলের সদস্য মঈনুদ্দিন কাদেরী শওকত, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান শহীদুল হক, অধ্যাপক আর রাজী, সহকারী অধ্যাপক সাইমা আলম, রাষ্ট্রচিন্তক মেজর (অব.) ফেরদৌস, কালের কণ্ঠর চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান মুস্তফা নঈম ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সালেহ নোমান।