১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

বাংলাদেশের ‘সেরা বিশ্বকাপ’ আসলে কতটা সফল

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এবার কাগজে-কলমে সেরা আসর কাটিয়েছে বাংলাদেশ, কিন্তু এই অর্জনে প্রশ্নও কম নেই।

আরিফুল ইসলাম রনি আরিফুল ইসলাম রনি

অ্যাডিলেইড থেকে

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 07 Nov 2022, 10:14 PM

Updated : 07 Nov 2022, 10:14 PM

অ্যাডিলেইড থেকে সোমবার দেশে ফেরার উড়ানে চেপে বসা বাংলাদেশ দলের সঙ্গী সেরা বিশ্বকাপ কাটানোর স্বস্তি। টেকনিক্যাল কনসালটেন্ট শ্রীধরন শ্রীরাম ও অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের কথায় কখনও কখনও শুধু স্বস্তিই নয়, তৃপ্তিও মিশে ছিল বেশ। কিন্তু সেরা পারফরম্যান্স মানেই কি সবসময় সফল? বাংলাদেশের বিশ্বকাপ অভিযান ঘিরেও এবার এই প্রশ্ন তোলা যায়। 

বিশ্বকাপে এবার প্রথম ম্যাচে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে ১৫ বছরের খরা কাটিয়ে মূল পর্বে জয়ের দেখা পায় বাংলাদেশ। তৃতীয় ম্যাচে জয় ধরা দেয় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। বাংলাদেশের সেরা আসর হয়ে যায় তাই প্রথম তিন ম্যাচের মধ্যেই। আগে কখনোই মূল পর্বে একাধিক জয় ধরা দেয়নি। 

বিশ্বকাপ শুরুর আগে যদি বলা হতো বাংলাদেশ দুটি জয় পাবে, এই দেশের ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট সবাই তা লুফে নিত বলেই মনে হয়। বিশেষ করে, বিশ্বকাপের আগে দলের নড়বড়ে অবস্থার কথা বিবেচনায় নিলে। নেদারল্যান্ডস ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দল নিশ্চিতভাবে জিতবে, এমন বিশ্বাস রাখা লোকের সংখ্যা খুব বেশি সম্ভবত ছিল না। 

সেদিক থেকে তাই সফল বিশ্বকাপই বলতে হয়। সেই সন্তুষ্টির ছোঁয়া দলেও আছে প্রবলভাবে। তৃতীয় ম্যাচের পর শ্রীরাম ও সাকিব কয়েক দফায় বেশ জোর দিয়েই বলেছেন তা। টিম ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদ সুজন অতটা জোরাল ভাবে না হলেও অস্ট্রেলিয়া ছাড়ার আগে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তুলে ধরলেন দলের ভেতরের ভাবনা। 

“প্রতিটি ম্যাচেই আমাদের উন্নতি ছিল। প্রত্যাশাও বেড়ে গিয়েছিল, সেমিতে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেটি হয়নি, তবে আমার মনে হয় আমরা মোটেই একেবারে খারাপ করিনি।” 

কিন্তু কাগজ-কলমের হিসাবই কি সবকিছু? জয়-পরাজয়ের খতিয়ানই কি শেষ কথা! 

এমনিতে এই বিশ্বকাপের বাস্তবতায় নেদারল্যান্ডস ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জয়কেও খাটো করে দেখার জো নেই। জিম্বাবুয়ে এবার হারিয়ে দিয়েছে পাকিস্তানকে। সেই জিম্বাবুয়েকে হারিয়েছে নেদারল্যান্ডস, পরে তারা চমকপ্রদ পারফরম্যান্সে হারিয়ে দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকাকে। এই দুই দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ও তাই উল্লেখযোগ্য। কিন্তু আক্ষেপটাও লুকিয়ে সেখানেই। জিম্বাবুয়ে, নেদারল্যান্ডস যখন প্রথাগত বড় দলগুলিকে হারিয়ে সাড়া জাগাল বিশ্বকাপে, বাংলাদেশের তেমন জয় কোথায়? 

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচে স্রেফ উড়ে গেছে বাংলাদেশ। টি-টোয়েন্টিতে কিংবা যে কোনো সংস্করণেই এই ধরনের ম্যাচ আসতে পারে। এই ম্যাচকেও নাহয় বিবেচনার বাইরে রাখা হলো। কিন্তু ভারত ও পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের হার দুটি ‘সফল’ বিশ্বকাপের সুবাসে কাঁটার আঘাত হয়ে আসতেই পারে। 

ভারতকে বাগে পেয়েছিল বাংলাদেশ। স্মরণীয় জয়ের মঞ্চ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু জয়ের হাতছানি যখন স্পষ্ট, তখনই চাপের মধ্যে গুবলেট পাকিয়ে ফেলে দল। পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচেও ব্যাটিংয়ে প্রথম ১০ ওভারে গড়া হয় ভালো ভিত। কিন্তু পরের ১০ ওভারে যখন জয়ের সৌধ গড়ে তোলার পালা, সেই চাপে আবার ধ্বংসস্তুপ। 

দুই ম্যাচেই ছোট ছোট গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোয় খেই হারিয়েছে দল। ম্যাচ হেরে গেছে ওই সময়টুকু জয় করতে না পারাতেই। এই সংস্করণে যা বাংলাদেশের বহু পুরনো সমস্যা! 

গত বিশ্বকাপেও শ্রীলঙ্কা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশ জিততে পারেনি এই কারণেই। ম্যাচের ভেতরে যে ছোট ছোট লড়াই থাকে, যে মুহূর্তগুলোয় ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হয়, সেখানেই পেরে ওঠে না তারা। গত বিশ্বকাপের আগে-পরেও এই সমস্যা বাংলাদেশের সঙ্গী হয়েছে বারবার। এবারের বিশ্বকাপেও সেখানে পরিবর্তন কিংবা উন্নতির ছাপ নেই। 

শ্রীধরন শ্রীরাম টেকনিক্যাল কনসালটেন্ট হয়ে আসার পর ‘ইন্টেন্ট’ ও ‘ইম্প্যাক্ট’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে প্রচুর। কিন্তু মাঠের ক্রিকেটে তা দেখা গেছে কমই। একদমই যে দেখা যায়নি, তা অবশ্যই নয়। তবে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন হয়ে উঠতে যে ধারাবাহিকতা দরকার হয়, সেটির ধারেকাছে কিছু দেখা যায়নি। 

দলের মানসিকতার উন্নতির কথা বলা হয়েছে বারবার। নিজস্ব একটি ঘরানা বা ব্র্যান্ড গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বিশ্বকাপ অভিযান শেষেও বাংলাদেশের ক্রিকেটে কোনো ব্র্যান্ড খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মানসিকতার উন্নতির সুস্পষ্ট ছাপ চোখে পড়ছে না। ঘুরে-ফিরে সেই একই বৃত্তে ঘুরপাক যেন। 

দলের গঠন বা কাঠামোয় যেসব পুরনো সমস্যা ছিল, পারফরম্যান্সে ঘাটতির যে বড় জায়গাগুলো ছিল, সেখানেও মেলেনি সমাধান। উদ্বোধনী জুটিই যেমন দাঁড় করানো যায়নি এখনও! 

অনেক পরীক্ষা-নীরিক্ষা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে ফিরে যাওয়া হয়েছে প্রথাগত ওপেনারদের আশ্রয়ে। সেখানে মেলেনি নতুন কোনো প্রাপ্তি। বরং পুরনো অস্বস্তিই মাথাচাড়া দিয়েছে বারবার। যেখানে নতুন কিছুর চেষ্টা হয়েছে, সেটিই জন্ম দিয়েছে সবচেয়ে বেশি বিতর্কের। তর্কযুক্তভাবে যিনি দলের সেরা ব্যাটসম্যান, তর্কহীনভাবেই যিনি সেরা ওপেনার, সেই লিটন কুমার দাসকেই ওপেনিং থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে! 

লিটনকে ওপেনিং না করানোর প্রশ্নে কোনো যুক্তি খুঁজে পাননি শ্রীরাম, সাকিব এই প্রশ্নে মেজাজ হারিয়েছেন সংবাদ সম্মেলনে। কিন্তু বাস্তবতাকে এড়ানো যায়নি। সেরা ওপেনার শেষ পর্যন্ত ওপেন করতে পেরেছেন বিশ্বকাপে দলের চতুর্থ ম্যাচে। অসাধারণ ব্যাটিং করে তিনি ভারতের বিপক্ষে দলের জয়ের সম্ভাবনা যেমন জাগিয়ে তুলেছেন সেদিন, তেমনি তাতে আগের প্রশ্নগুলোর যৌক্তিকতাও প্রমাণ করেছেন প্রবলভাবে। 

ঘরোয়া ক্রিকেটে পারফর্ম না করার পরও কোনো প্রক্রিয়া ছাড়াই দলে ফেরানো হয়েছে সৌম্য সরকারকে। মূলত এই আশা করে, “যদি কিছু হয়ে যায়!” কিন্তু ক্রিকেট খেলাটা যে স্রেফ আশা দিয়ে হয় না, সৌম্যর ব্যাটিংয়ে তা প্রমাণ হয়েছে। 

লিটনকে তিনে নামানোয় দলের ব্যাটিং অর্ডারের আগের কিছু পরিকল্পনাও ব্যাহত হয় প্রকটভাবে। কিছুদিন আগেও দলের বড় ভরসা মনে করা হয়েছে যাকে, টিম ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদ যাকে নিয়ে জোর দিয়ে বলেছিলেন যে চার নম্বরে খেলানো হবে, সেই আফিফ হোসেনের ব্যাটিং অর্ডার নেমে গেছে পাঁচে। বিশ্বকাপে প্রত্যাশিত পারফরম্যান্সও তার কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। 

ব্যাটিং অর্ডারের পরের দিকেও সেই প্রভাব পড়েছে বাজেভাবে। নুরুল হাসান সোহান, ইয়াসির আলি চৌধুরি, মোসাদ্দেক হোসেনদের নির্দিষ্ট পজিশন বলে কিছু ছিল না। টি-টোয়েন্টিতে যদিও এই জায়গাগুলোয় সুনির্দিষ্ট পজিশন এখন বেশির ভাগ দলেই সেভাবে থাকে না, পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ীই ব্যাটসম্যান নামানো হয়, কিন্তু সেখানেও একটি প্রক্রিয়া থাকে। কিন্তু বাংলাদেশ দলে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণের নমুনা খুব একটা মেলেনি। নিজেদের ভূমিকা নিয়ে তারা নিজেদের কাছেই স্বচ্ছ ছিলেন কিনা, সেই প্রশ্ন এখন তোলাই যায়। 

সব মিলিয়ে ব্যাটিংয়ে সার্বিক উন্নতির তেমন কিছু দেখা যায়নি। টি-টোয়েন্টি ঘরানার ব্যাটিং রপ্ত করার প্রমাণও মেলেনি। গোটা বিশ্বকাপে ফিফটি এসেছে স্রেফ দুজনের ব্যাট থেকে, নাজমুল হোসেন শান্ত ও লিটন কুমার দাস। শান্তর দুটি ফিফটির ধরন নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায় অনেক। 

ফিল্ডিংয়ে গত তিন বছর ধরে টানা যে দুর্বলতা, যে অধারাহিকতা, তা রয়ে গেছে এখনও। ক্যাচ পড়েছে সমানে, গ্রাউন্ড ফিল্ডিংয়ে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ফুটে ওঠেনি। 

বোলিংয়ে যদিও ইতিবাচকতার ছাপ আছে যথেষ্টই। তাসকিন আহমেদ একটি ম্যাচ ছাড়া বাকিগুলোয় দুর্দান্ত বোলিং করেছেন। মুস্তাফিজুর রহমান ছন্দে ফেরার পথে আছেন বলেই মনে হচ্ছে। উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিয়েছেন হাসান মাহমুদ। এই তো। দুটি জয়ের গভীরে গেলে প্রাপ্তি বলতে তো এটুকুই। 

তারপরও দুটি জয়ের অর্জন নিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তোলা হলে বাস্তবতাকেই হয়তো আড়াল করা হবে। পাতলা চাদর দিয়ে কঙ্কাল ঢাকার মতোই যেন। দুটি জয়েই সেরা বিশ্বকাপ হয়ে গেছে আগের আসরগুলোর বিব্রতকর ব্যর্থতার জন্যই। কিন্তু তাতেই কি বিশ্বকাপ অভিযান সফল? 

কোনো বোলার ৫ ম্যাচে উইকেট না পাওয়ার পর ষষ্ঠ ম্যাচে একটি উইকেট পেলেই সেটি তার সেরা বোলিং। কোনো ব্যাটসম্যান টানা ৫ ম্যাচে শূন্য রানে ফেরার পর পরের ম্যাচে ১ রান করলেও সেরা ইনিংস। সেটাকে সফল বলা যায় কিনা, উত্তরটা হয়তো সবারই জানা।