শাদাবের রেকর্ড গড়া সেঞ্চুরিতে পাকিস্তানের অবিশ্বাস্য জয়
ইংল্যান্ডকে হারানোয় অবদান কম নয় হারিস রউফের, শেষ উইকেটে শাদাবের সঙ্গে ৮৯ রানের জুটি গড়েন তিনি।
জয় থেকে তখন ২১ রান দূরে পাকিস্তান, এলবিডব্লিউর আবেদনে শাদাব খানকে আউট দিলেন আম্পায়ার। জয়ের উল্লাসে ফেটে পড়ল ইংল্যান্ড। হতাশ শাদাব ড্রেসিং রুমের পথে হাঁটতে হাঁটতেই নিলেন রিভিউ। রিপ্লেতে দেখা গেল বল সামান্য স্পর্শ করেছে তার ব্যাটে। যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না শাদাব ও হারিস রউফের। জীবন পেয়ে রেকর্ড গড়া সেঞ্চুরি করলেন শাদাব, পাকিস্তানকে এনে দিলেন অবিশ্বাস্য এক জয়।
লাহোরে রোববার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পাকিস্তানের ১ উইকেটের নাটকীয় জয়ে অবদান কম নয় হারিফ রউফের। শেষ উইকেটে শাদাবের সঙ্গে ৮৯ রানের জুটি গড়েন তিনি। ওয়ানডে ইতিহাসে সফল রান তাড়ায় দশম উইকেটে যা সর্বোচ্চ।
ত্রিদেশীয় সিরিজের ম্যাচটির প্রথমভাগে আলো ছড়ান বেন ডাকেট। খাদের কিনার থেকে ইংল্যান্ডকে লড়ার মতো পুঁজি এনে দেন তিনি দারুণ এক সেঞ্চুরিতে। তার ১০৫ রানের ইনিংসে ২৪১ রান করতে পারে সফরকারীরা।
রান তাড়ায় ১০৩ রানে ষষ্ঠ এবং ১৫৪ রানে নবম উইকেট হারানো পাকিস্তানের জয়ের নায়ক শাদাব করেন ১১৩ রান। পাঁচটি ছক্কা ও ১৩টি চারে সাজানো তার ৯৬ বলের ইনিংসে ১৭ বল বাকি থাকতে জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় স্বাগতিকরা।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এটি শাদাবের প্রথম সেঞ্চুরি। আগের সেরা ছিল ওয়ানডেতে ৮৬।
শাদাবের ১১৩ রান এই সংস্করণে আট নম্বরে নেমে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ড। আট বা তার নিচে নেমে ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি আছে কেবল দুইজনের; বাংলাদেশের মেহেদী হাসান মিরাজ (১০০*) ও আয়ারল্যান্ডের সিমি সিংয়ের (১০০*)।
ইংল্যান্ডকে আড়াইশ আগে গুটিয়ে দেওয়া পাকিস্তানের উচ্ছ্বাস উবে যায় ব্যাটিং নেমে। ৩১ রানে টপ অর্ডারের তিনজনকে হারায় তারা; টানা তিন ওভারে বিদায় নেন ফাখার জামান, সাইম আইয়ুব ও বাবর আজম।
ক্রিজে গিয়ে আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে সাতটি চারে ২২ বলে ৩২ রান করে ফেরেন সাদ বেগ। হাসান নাওয়াজকে বেশিক্ষণ টিকতে দেননি লিয়াম ডসন। পরের ওভারেই আরাফাত মিনহাস বিদায় নিলে ক্রিজে যান শাদাব।
পাকিস্তানের জয় তখনও অনেক দূরের পথ। ওই সময় ৪ উইকেট হাতে নিয়ে ১৪০ রান চাই তাদের। পরের ওভারে থিতু সালমান আলি আগা ফিরলে জয়ের পাল্লা আরও নুইয়ে পড়ে ইংল্যান্ডের দিকে।
কে ভেবেছিল, সেখান থেকেই একক বীরত্বে পাকিস্তানকে জয় এনে দেবেন শাদাব! শাহিন শাহ আফ্রিদির পর যখন রাজাউল্লাহও বিদায় নেয়, তখনও ৮৮ রান প্রয়োজন তাদের। কঠিন এই চ্যালেঞ্জে শাদাবকে দারুণ সঙ্গ দেন রউফ।
শেষ জুটিতে প্রায় প্রতি ওভারে বাউন্ডারি হাঁকান শাদাব। ৩৭তম ওভারে অভিষিক্ত হেনরি ক্রকোম্বকে চার ও ছক্কা মেরে ৫২ বলে ফিফটি স্পর্শ করেন তিনি। অন্য প্রান্তে কেবল বল ঠেকিয়ে যান রউফ।
শাদাবের চমৎকার ব্যাটিংয়ে যখন পাকিস্তানের জয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হতে শুরু করে, তখনই আসে এলবিডব্লিউর ওই নাটকীয়তা। ৪৫তম ওভারের প্রথম বলে অ্যাটকিনসনকে ছক্কা মারার পরের বলে লো ফুলটস ব্যাটে লাগাতে পারেননি শাদাব। বল প্যাডে আঘাত করলে ইংলিশদের আবেদনে আঙুল তুলতে দেরি করেননি আম্পায়ার।
তিরে এনে তরী ডুবিয়ে দেওয়ার ক্ষোভে ব্যাট ছুঁড়ে মারেন শাদাব। পরে শেষ মুহূর্তে রিভিউ নিয়ে বেঁচে যান তিনি। ৯৭ রানে জীবন পেয়ে তার সেকি উল্লাস।
৪৭তম ওভারে অ্যাটকিনসনকে চার মেরে কাঙ্ক্ষিত সেঞ্চুরিতে পা রাখেন শাদাব, ৯২ বলে। ওই ওভারে আরেকটি চার ও ছক্কা হাঁকান তিনি। পরের ওভারের প্রথম বলে চার মেরে দলকে কাঙ্ক্ষিত ঠিকানায় পৌঁছে দেন রউফ।
শেষের মতো শুরুটাও ভালো ছিল না ইংল্যান্ডের। টস হেরে ব্যাটিং করতে নেমে ১৯ রানে ৩ উইকেট হারায় তারা। টম ব্যান্টন, জো রুটকে বিদায় করেন শাহিন শাহ আফ্রিদি। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ডাবল সেঞ্চুরি করা হ্যারি ব্রুক কাটা পড়েন রান আউটে।
পাওয়ার প্লের শেষ ওভারে বিদায় নেন জর্ডান কক্সও। ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেন ডাকেট ও স্যাম কারান। তাদের জুটিতে একশ পেরিয়ে যায় ইংলিশদের রান।
৫৪ বলে ফিফটি স্পর্শ করেন ডাকেট। পঞ্চাশের দুয়ার থেকে ফেরেন কারান। ৪২ রানে তাকে বিদায় করে ৯৩ রানের জুটি ভাঙেন আফ্রিদি।
অভিষিক্ত রাজাউল্লাহর বলে উইল জ্যাকস বিদায় নেন। পরের ওভারে সেঞ্চুরিতে পা রাখেন ডাকেট, ১০৫ বলে। ওয়ানডেতে পঞ্চম শতক ছুঁয়ে বেশিদূর যেতে পারেননি ইংলিশ ওপেনার। এক ওভার পরই বাজে তার বিদায় ঘন্টা।
শেষ দিকে তিন ছক্কায় অপরাজিত ৩৬ রান করে ইংল্যান্ডের রান ২৪০ পার করেন অ্যাটকিনসন।
ত্রিদেশীয় সিরিজে ইংল্যান্ডের পরের ম্যাচ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে, আগামী বৃহস্পতিবার। আর মঙ্গলবার লঙ্কানদের মুখোমুখি হবে পাকিস্তান।
সংক্ষিপ্ত স্কোর :
ইংল্যান্ড: ৪৬.৪ ওভারে ২৪১ (ব্যান্টন ৪, ডাকেট ১০৫, রুট ৫, ব্রুক ১, কক্স ৬, কারান ৪২, জ্যাকস ১৩, ডসন ৫, ওভারটন ১০, অ্যাটকিনসন ৩৬*, ক্রকোম্ব ৮; আফ্রিদি ৮.৪-০-৪৬-৪, রাজাউল্লাহ ৮-০-৩৮-২, রউফ ৮-০-৫৫-১, সাইম ২-০-১৮-০, সালমান ৫-০-২৬-০, শাদাব ৭-০-৩১-০, মিনহাস ৮-০-২৬-২)
পাকিস্তান: ৪৭.১ ওভারে ২৪৩/৯ (ফাখার ১০, সাইম ৬, বাবর ১০, সাদ ৩২, সালমান ২৬, নাওয়াজ ১৫, মিনহাস ১, শাদাব ১১৩*, আফ্রিদি ৪, রাজাউল্লাহ ৮, রউফ ৭*; অ্যাটকিনসন ৯-০-৬২-২, ক্রকোম্ব ৬.১-০-৫৭-১, ওভারটন ১০-০-৪৩-৩, কারান ৮-০-৩২-০, ডসন ১০-১-৩০-২, জ্যাকস ৪-০-১৮-১)
ফল: পাকিস্তান ১ উইকেটে জয়ী
ম্যান অব দা ম্যাচ: শাদাব খান।
