২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

‘ক্রিকেটারদের কোনোদিন আমার থেকে আলাদা হতে দেব না’

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল বললেন, ক্রিকেট বোর্ডের কাছে সবচেয়ে গুরুত্ব পাবে ক্রিকেটাররাই, পাশাপাশি তিনি কথা বললেন দায়িত্বের তিন মাসে তার নানা পদক্ষেপ, তাকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা ও আরও অনেক কিছু নিয়ে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 27 Sep 2026, 08:33 PM

Updated : 27 Sep 2026, 09:28 PM

নির্বাচনে জিতে বিসিবি সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর সাড়ে তিন মাসের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন তামিম ইকবাল। ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক বাড়িয়েছেন, অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছেন। তাকে ঘিরে জন্ম হয়েছে কিছু সমালোচনা ও প্রশ্নেরও। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেশের ক্রিকেটের নিয়ন্তা সংস্থার প্রধান কথা বললেন তার বিভিন্ন উদ্যোগ, সামনের পরিকল্পনা, দেশের ক্রিকেটের নানা বাস্তবতা, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ও প্রাসঙ্গিক আরও অনেক কিছু নিয়েই।

আপনার পূর্ণকালীন দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাস হতে চলেছে। খুব বেশি সময় নয়। তবে যা করতে চেয়েছিলেন, কতটুকু করতে পেরেছেন?

তামিম ইকবাল: আমরা শুরু করে দিয়েছি। করার অনেক কিছু আছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের পুরো ইকোসিস্টেম থেকে নিয়ে ডেভেলপমেন্ট, ফ্যাসিলিটিজ থেকে নিয়ে সবকিছু, অনেক কিছু করার আছে। তবে যে লক ছিল আগে, ওই লকটা খুলে আমরা শুরুটা করে দিয়েছি।

শুধু মিরপুরেই যদি চিন্তা করি, মিরপুর স্টেডিয়ামের মধ্যে যত ফ্যাসিলিটিজ তৈরি হচ্ছে আর যত দ্রুত কাজ চলছে… আশা করি, আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে ভিন্ন এক শের-ই-বাংলা স্টেডিয়াম দেখবেন, যেখানে টপ ক্লাস ফ্যাসিলিটিজ থাকবে।

এগুলো আসলে ‘ওভারডিউ’ ছিল। আরও ১০-১৫-২০ বছর আগে হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। তবে আমাদের এই বোর্ডে এই ব্যাপারটা আমি খুব অ্যাপ্রিশিয়েট করি এবং আপনাদের প্রত্যেকটি বোর্ড সদস্যকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, যে ভিশনটা আমি দেখি, প্রতিটি বোর্ড সদস্য একইভাবে বিশ্বাস করেন। এই কারণেই আমরা এত দ্রুত এতগুলো কাজ নিয়ে এগোচ্ছি।

একটি ভালো জিম বা সুইমিং পুল, ভালো অনুশীলন সুবিধা, এসব মৌলিক দিক নিয়ে আপনি খেলোয়াড়ি জীবনেও বেশ উচ্চকিত ছিলেন। নিজের সভাপতি হওয়ার পর কি এজন্যই এসব দিকে আগে নজর দিয়েছেন?

তামিম: হ্যাঁ, আমার কাছে মনে হয়, এসব একদমই অপরিহার্য। ধরুন একটা ছেলে ইনজুরড হবে, তার জন্য একটা রিহ্যাব সেন্টার থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। রিহ্যাবে ধরেন সুইমিং পুল থাকতে পারে, হট এন্ড কোল্ড ওয়াটার থাকবে, রিহ্যাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেক কিছু থাকবে। সেগুলো হয়তো অতটা সম্ভব নয় এখানে (মিরপুরে) বানানো। এক্সিলেন্স সেন্টারের যে অনুমোদন আমরা নিয়েছি, যেভাবে পরিকল্পনা করছি, সেখানে সবকিছুই থাকবে। তবে বেসিক যা দরকার, সেগুলো এখানে থাকবে। কাজ শেষের পথে।

এগুলা করে কি আমি বাংলাদেশ ক্রিকেটের ৩৬০ ডিগ্রি বদলে দিচ্ছি? অবশ্যই না। তবে এগুলো মৌলিক প্রয়োজন, যেগুলো অনেক আগেই থাকা উচিত ছিল। কেন হয়নি, আমি জানি না। তবে আমরা অন্তত কাজ শুরু করেছি।

আমার মনে হয়, তিন মাসে অন্তত ১৪-১৫টি কাজের কথা বলতে পারি, উল্লেখযোগ্য যেগুলো আমি করেছি। তিন মাসের মধ্যে যে এতগুলা কাজ করতে পারছি, এটাই অনেক বড় ব্যাপার। আমি খুবই খুশি। আরও বেশি খুশি হব যখন এগুলা শেষ হয়ে যাবে। যখন সবাই এসব দেখতে পাবে। যে ক্রিকেটারদের জন্য ফ্যাসিলিটিজগুলো তৈরি করা হচ্ছে, ওরা যখন এটা থেকে ব্যবহার করবে, তাদের খেলা বা তাদের ফিটনেস আরও ৫ শতাংশ ভালো হবে, তখন বেশি খুশি ও সন্তুষ্ট হব।

ক্রিকেটারদের জন্য আপনি অনেক কিছুই করছেন। ফ্যাসিলিটিজগুলো তো আছেই, এর মধ্যেই দুই দফায় তাদের পারিশ্রমিক বাড়িয়েছেন। এগুলো কি শুধুই ক্রিকেটীয় কারণে নাকি ক্রিকেটারদের হাতে রাখার কৌশলও?

তামিম: ক্রিকেটারদের সঙ্গে এই ক্রিকেট বোর্ডের ভালো সম্পর্ক থাকবে না কেন? কেন ক্রিকেটাররা আর আমরা একসঙ্গে হব না? স্রেফ টাকা দিয়েই তাদেরকে এক করতে হবে? আমি তো মনে করি না।

টাকার ব্যাপারটা বলি। আজকের দিনে একটা ছেলে কি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ১৮ হাজার, ২০ হাজার টাকা বেতন পাওয়ার জন্য ক্রিকেট খেলছে? এই টাকা দিয়ে সে তার পরিবারকে কিভাবে চালাবে? এখন তার বেতন যদি আমি ৬-৬৫ হাজার করে দেই, এটা কি তাকে হাতে রাখার জন্য? এটা তাদের অধিকার। অনেক আগে থেকেই প্রাপ্য ছিল।

আগের মানসিকতা থেকে সবার বের হয়ে আসা উচিত। যে ছেলে যে জিনিসটা ডিজার্ভ করে, তাকে তা দিতে হবে। আর ক্রিকেটারদেরকে আমাদের বিরুদ্ধে কেন দাঁড়াতে হবে? আমি আগেও বলেছি, এখনও বলছি, ক্রিকেটারদেরকে কোনোদিন আমার থেকে আলাদা হতে দেব না আমি।

আমি ক্রিকেটারদের জন্য আছি, ক্রিকেটাররা আমার জন্য নয়। ক্রিকেটারদের দেখভালের জন্য এসেছি আমি। আমার কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব তাদের। এজন্য আমার যা করা লাগে, তা-ই করব।

বিনিময়ে ক্রিকেটারদের কাছে আপনার চাওয়া কি কি?

তামিম: তারা যেন বাংলাদেশের সমর্থকদের প্রত্যাশাগুলো পূরণ করে। হয়তো রাতারাতি হবে না, তবে ভবিষ্যতে হবে, এটাই আমি আশা করতে পারি।

একজন বোর্ড সভাপতি হয়ে আমি কখনও দাবি করতে পারি না যে, ম্যাচ জিততেই হবে বা হারলে এটা হবে-ওটা হবে। নাহ, আমার কাজ তা নয়। আমার কাজ হলো, ক্রিকেটের ইকোসিস্টেম ঠিক করা, পুরো ফ্যাসিলিটিজ ঠিক করে দেওয়া, যেন বছরের পর বছর ধরে ক্রিকেট বেড়ে উঠতে থাকে। বাংলাদেশে ক্রিকেট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা খেলাগুলোর একটি, হয়তো সবচেয়ে জনপ্রিয় এই জিনিসটা যেন কমে না যায়। ক্রিকেট আরও জনপ্রিয় হবে, ক্রিকেটার উঠে আসতে থাকবে, এসব আমার কাজ। উইকেটে বল ঘুরবে নাকি কেমন হবে, কে কখন ব্যাটিং করবে, এসব আমার কাজ নয়।

কিন্তু ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সেও নিশ্চয়ই উন্নতি দেখতে চাইবেন? ফিটনেসের একটা মানদণ্ড অনুসরণ করা বা নিজের পারফরম্যান্স ৫ শতাংশ, ১০ শতাংশ উন্নতি করা…

তামিম: এই জিনিসগুলার জন্য বিসিবি অনেকজনকে নিয়োগ দিয়েছে। কোচ, ট্রেনার, নির্বাচকদের নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের জবাবদিহিতা তাদের সঙ্গে। কারণ তাদেরকে নেওয়া হয়েছে নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ বলেই। আমি যদি প্রশ্নও করি, উত্তরও দেই, তাহলে তো হবে না। যাদেরকে যে কাজে নিয়োগ দিয়েছি, সেখানে যদি ফল না পাই, তাদের জবাবদিহিতা থাকবে আমার কাছে।

আপনি সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর বলেছিলেন, বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভাবমূর্তি আবার ভালো করতে চান। কতটুকু পারলেন?

তামিম: আপনার কি মনে হচ্ছে না এটা হয়েছে? এখন কি ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না?

আন্তর্জাতিক আঙিনায় হয়েছে?

তামিম: আন্তর্জাতিক আঙিনাতেও কি আমাদের ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না? যে আলোচনাগুলো কয়েক মাস আগে হচ্ছিল, ওগুলা থেকে কি আমরা কিছুটা হলেও বের হয়ে আসতে পারিনি…?

আপনি যখন আইসিসি বা এসিসির সভায় যাচ্ছেন, তখন আপনাকে বা বাংলাদেশের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কেমন দেখছেন?

তামিম: আমি যখন আইসিসি সভায় যাই আর আমি ওখানে বিভিন্ন পূর্ণ সদস্যদের সঙ্গে বসি, আমার ভাবনায় একটাই জিনিস থাকে, আমার জন্য বাংলাদেশই প্রথম। আমার জন্য সবচেয়ে গুরুত্ব ও প্রাধান্য বাংলাদেশের ক্রিকেট। বাকি সব গৌণ। বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য যা যা ভালো করতে পারি, ভালো যা যা নিয়ে আসতে পারি ভবিষ্যতের জন্য, সেটিই সর্বোচ্চ প্রাধান্য।

অবশ্যই অন্য সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে। কারণ, আপনি ওখানে যাবেন, গোঁ ধরে থাকবেন, উল্টাপাল্টা কথা বলবেন, এভাবে বিশ্ব ক্রিকেট চলে না। কিছু ব্যাপার মেনে চলতে হয়। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রেখে, কিছু মিষ্টি কথা বলে অনেক কিছু আদায় করা যায়। কিন্তু গোঁ ধরে বাঁকা কথা বলে অনেক সময় কাজ হয় না। ইউ হ্যাভ টু বি বিট স্মার্ট অ্যান্ড ক্লেভার এন্ড ডিপ্লোম্যাটিক এবং সেভাবেই সবকিছু সামলাতে হবে।

আপনি যখন আইসিসি সভায় প্রথম গেলেন, তখন অনেকে বলাবলি করছিল যে আপনি সভায় ঢুকতে পারছেন না বা দরজার বাইরে থাকতে হচ্ছে…!

তামিম: দেখুন, আইসিসির একটি নরমালাইজেশন কমিটি আছে, যেটির কাজ হলো গভর্ন্যান্স নিয়ে যেসব ঝামেলা হয়, ধরুন সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে বা কোনো কারণে বোর্ড যদি ভেঙে যায়, সেসব খতিয়ে দেখা। অতীতে যেমন নানা সময়ে অনেক বোর্ড নিষিদ্ধও হয়েছে এসব কারণে। তো আমাদেরটাও নরমালাইজেশন কমিটিতে আলোচনা হয়েছে এবং আইসিসি বোর্ড মনে করেছে যে, যে প্রক্রিয়া করে আমরা এসেছি, যেভাবে আমরা নির্বাচন পরিচালনা করেছি, সবকিছু ছিল ফেয়ার এন্ড ফাইন। সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরকে অ্যাপ্রুভ করে দেওয়া হয়েছে।

এরপর একটা ইনফরমাল বোর্ড মিটিং ছিল শুরুতে। আইসিসির তো বিভিন্ন ধরনের কমিটি আছে এবং আইসিসির এজিএমের সময় বিভিন্ন কমিটির সভা হয়। সবাই সব সভায় থাকে না। কোনো কমিটিতে হয়তো অস্ট্রেলিয়া বা ইংল্যান্ডের প্রতিনি নেই, কাজেই তারা ওই কমিটির বৈঠকে থাকে না। পরে সবাই একসঙ্গে বসে বোর্ড মিটিং হয়। প্রথম ইনফরমাল মিটিং থেকেই আমি ছিলাম।

আমাদের এই অঞ্চলের বড় দুটো বোর্ড, ভারতীয় বোর্ড এবং পাকিস্তানি বোর্ডের সঙ্গে বিসিবির সম্পর্ক এখন কেমন?

তামিম: খুবই ভালো। দুই বোর্ডের সঙ্গেই সম্পর্ক খুব ভালো। এটাই আমার কাজ। শুধু এই দুটো নয়, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউ জিল্যান্ড আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা, আরও যারা আছে, সবার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খুব ভালো। তারা খুবই ওয়েলকামিং। আমি যখন গিয়েছি, আমাকে অনেক সম্মান দিয়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট যেভাবে কাজ করে, এমনিতেও আইসিসি বেশ ভালো সম্মান মেলে।

এই অঞ্চলের বড় দুই বোর্ডের কথা জিজ্ঞেস করার কারণ, বিশ্বকাপে না যাওয়াকে ঘিরে কয়েক মাস আগেও ভারতীয় বোর্ডের সঙ্গে টানাপোড়েন আর পাকিস্তানের বোর্ডের সঙ্গে সখ্য ছিল অনেকটাই দৃশ্যমান!

তামিম: আমার কাছে মনে হয়, কোনো পক্ষ নেওয়া উচিত নয়। আপনার পক্ষ হলো বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্বার্থে আপনার ভালো করে মিলেমিশে কীভাবে করে আপনি আপনার জন্য জিনিস আদায় করতে পারেন, সেটাই হওয়া উচিত লক্ষ্য।

আমার একটা বাড়তি সুবিধা আছে, যেহেতু ক্রিকেট খেলেছি, বিভিন্ন দেশের ক্রিকেট বোর্ডে বা আইসিসিতে যারা আছেন, কমবেশি আমাকে সবাই চেনেন। তারা আমাকে খুব সুন্দরভাবে গ্রহণ করেছেন এবং খুবই ভালো সম্পর্ক পুরো আইসিসি বোর্ডের সঙ্গেই। যথেষ্ট পরিমাণ সম্মান আর সহায়তা পাই ওখান থেকে।

সেই সম্পর্ক ও সম্মানের মাধ্যমে কি সামনের এফটিপিতে (ভবিষ্যৎ সফরসূচি) বাংলাদেশ বেশি ম্যাচ পাবে? বড় দেশগুলোতে সফর করতে পারবে? এফটিপির কাজ তো চলছে এখন…

তামিম: আমার কাছে আমার কাছে তো সেরকমই মনে হয়! এটাতে আমলে আমার চেয়ে বেশি অবদান বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের পারফরম্যান্সের। যে ধরনের পারফরম্যান্স তারা করছে, এটা বড় ভূমিকা রাখবে আমার ওদেরকে রাজি করানোর চেয়ে।

হ্যাঁ, অবশ্যই আমার একটা ভূমিকা থাকবে। আমি আমার জায়গা থেকে অবশ্যই সবরকম চেষ্টা করছি যে, আমাদের যেন ২০ বছর অপেক্ষা করতে না হয়, দুই-তিন বছরের মধ্যেই যেন সফরে যেতে পারি বা চার-পাঁচ বছরে যেন বড় বড় দেশের সঙ্গে দুই-তিনটা সিরিজ থাকে। অবশ্যই এই জিনিসগুলো হবে। এফটিপি যখন পুরোপুরি তৈরি হয়ে যাবে, আপনারা যখন দেখতে পাবেন, আমি মোটামুটি নিশ্চিত যে, হতাশ হবেন না।

ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোয় অনেক বড় পরিবর্তন আনছেন আপনারা। এটা কেন জরুরি মনে হলো?

তামিম: ঘরোয়া ক্রিকেটে আপনাদেরই ট্যাগলাইন দেওয়া ‘পিকনিক ক্রিকেট।’ ঘরোয়া ক্রিকেটে কালার ফেরত নিয়ে আসাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আজ থেকে যদি ২০ বছর ২৫ বছর আগের কথা চিন্তা করি, ঢাকা স্টেডিয়ামে যখন আবাহনী মোহামেডানের মতো টিম খেলত, তখন যে কালারফুল জিনিসটা ছিল… এমন নয় যে অনেক দর্শক হতেই হবে, তবে যে ধরনের আগ্রহ ও রঙ ছিল, সেটা ফেরত আনাটা জরুরি।

এখন আমি কিছু বদল এনেই যে সফল হয়ে যাব, তা নয়। তবে চেষ্টা তো করতে হবে। চেষ্টাই যদি না করি, ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা না করি, তাহলে শিখব কি করে? যেভাবে চলছে এভাবেই যদি ছেড়ে দিই, তাহলে তো এটাকে বদলানোর কোনো সুযোগ দিচ্ছি না। এজন্যই চেষ্টা করছি। আমি বিশ্বাস করি যে, এটা দিয়ে বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের ফ্লেভার ও কালার ফেরত আসবে।

এটা অবশ্য নির্ভর করতে তিনটি ব্যাপারের ওপর, খেলা কীভাবে এগোয়, মিডিয়া কতটা পাশে থাকে এবং দর্শক কতটা আগ্রহী ও সম্পৃক্ত হয়। টুর্নামেন্টের লঞ্চিংয়েই বাকিটা বলা হবে।

আপনার বোর্ডের বিরুদ্ধে নানা সময়ে কিছু অভিযোগও উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে অভিযোগ আছে যে, একজন সংবাদকর্মীকে উকিল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। কোনো সংবাদ সত্য মনে না করলে আপনারা রিজয়েন্ডার বা প্রতিবাদপত্র দিতেই পারেন, কিন্তু উকিল নোটিশ পাঠানোটা কিভাবে দেখছেন?

তামিম: এটা কি ক্রিকেট বোর্ড পাঠিয়েছে?

অভিযোগ তো সেরকইম!

তামিম: আমার মনে হয়, ফ্যাক্ট একটু চেক করে নিন। ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের উকিল নোটিশ পাঠানো হয়নি।

বিষয়টা হলো, সংবাদিকদের যেমন অধিকার আছে নিউজ করার এবং কোথাও কোনো ভুল খুঁজে পেলে মানুষকে জানানো, দেশকে জানানোর, তেমনি সাংবাদিকরা যদি কাউকে নিয়ে কোনো ভুল করে থাকে, তাহলে ওই ব্যক্তিরও অধিকার আছে সাংবাদিককে চ্যালেঞ্জ করার।

ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে, বিসিবি সভাপতি হিসেবে আমি শতভাগ নিশ্চয়তা নিতে পারি যে, ক্রিকেট বোর্ড থেকে কোনো উকিল নোটিশ যায়নি। কোনো ব্যক্তি যদি পাঠিয়ে থাকে, সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তার তো সেই অধিকার আছে। যখন আপনারা একটা নিউজ করেন, আপনাদের এটার অধিকার আছে, স্বাধীনতা আছে, ঠিক ওই ব্যক্তিরও অধিকার আছে। আপনি যদি কালকে আমাকে নিয়ে এমন কোনো একটা নিউজ করেন, যেটাতে কোনো সত্যতা নেই, আপনাকে চ্যালেঞ্জ করার অধিকার আমার আছে।

তবে আপনাকে নিশ্চিত করতে পারি যে, বিসিবির তরফ থেকে কিছু হয় নাই। উকিল নোটিশ ওই ব্যক্তি পাঠিয়ে থাকতে পারেন।

আপনার সঙ্গে এটা নিয়ে তার যোগাযোগ হয়নি?

তামিম: আমি এটা নিয়ে তো আলোচনা করি না, আমার সঙ্গে এটা নিয়ে আলোচনা হয়নি।

আরেকটি বড় অভিযোগের জায়গা, সামাজিক মাধ্যমেই যেটা বেশি হয়, ট্রল হয়, প্রচুর আলোচনা-সমালোচনা হয় যে, কোয়াবের সঙ্গে বিসিবি খুবই ঘনিষ্ঠ। এমনিতে ক্রিকেটারদের সংগঠন আর বোর্ড সাধারণত মুখোমুখি অবস্থানে থাকে। আপনাদের ক্ষেত্রে ‘মাখামাখি’ বা ‘দহরমমহরম’ আছে, এরকম ভাষাও ব্যবহৃত হয়।

তামিম: তো সেটা আমার কৃতিত্ব! আমি এটাকে নিজের কৃতিত্ব মনে করি। কারণ, ক্রিকেটারদের অ্যাসোসিয়েশন এবং বোর্ডের মধ্যে অনেক দেশেই অনেক সময় ঝামেলা হয়েছে, বাংলাদেশেও হয়েছে। কিন্তু আমি যদি তাদেরকে ঝামেলা করার সুযোগ না দেই, তাহলে কি সেটা ক্রিকেট বোর্ডের কৃতিত্ব নয়?

এখন কোয়াবের বিষয়ে আসি। অনেককেই বলতে শুনি যে, ‘কোয়াব এই, কোয়াব ওই’, এখানে অনেক কিছুই সত্য নয়। আমি একজন সাবেক ক্রিকেটার, আমিও তো কোয়াবের সদস্য। ফি দিয়ে সদস্যপদ নিয়েছি। দ্বিতীয় যে কথাটি, কোয়াব তো বাংলাদেশে অনেক বছর ধরে আছে। এই কোয়াব (কমিটি) হওয়ার পর কতটুকু অর্জন করেছে, আপনি কি মূল্যায়ন করেছেন?

তাদেরকে আপনারা সমালোচনা করতেই পারেন। কিন্তু ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক তারা বাড়িয়েছে দাবি তুলে। ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি তারা বাড়িয়েছে দাবি তুলে। প্রথম বিভাগ ক্রিকেট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে তারা নতুন টুর্নামেন্ট করেছে। দ্বিতীয় বিভাগের খেলা হয়নি, অনেক দল প্রত্যাহার করেছে। আমরা বোর্ডে আসার পর কোয়াব আমাদের সঙ্গে বসেছে এবং একশর বেশি ক্রিকেটারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করেছে বোর্ড। এটা কাদের কারণে হয়েছে? কোয়াব করেছে।

কোয়াবের কাজ কি? কোয়াবের কাজ হলো ক্রিকেটারদেরকে দেখা। আগের কোন কোয়াব, কার দায়িত্বে কোয়াব কোন সময় এতগুলো কাজ করতে করে দেখাতে পারছে? আপনি কোয়াবের সভাপতিকে সমালোচনা করতে পারেন আমাকে সমালোচনা করতে পারেন, কোনো সমস্যা নেই।

আমি অনেক সময় শুনি যে, (আগেরবার) বিপিএল বন্ধ করিয়ে দিয়েছে কোয়াব। বিপিএল কি কারণে বন্ধ হয়েছিল? ওদের দাবিটা কি ছিল? (ক্রিকেটারদের অপমান করায়) ওই সময়ের একজন বোর্ড পরিচালককে সরি বলতে হবে, এটাই তো দাবি ছিল! এখানে তো টাকাপয়সা বা খেলাধুলা নিয়ে কোনো কিছু ছিল না, ক্রিকেটারদের সম্মানের বিষয় ছিল। তাহলে ওই বোর্ডটা কেন এই কাজটা করে নাই?

ওই ব্যক্তি বা ওই বোর্ড যদি ওই সময় একটা ‘অ্যাপোলজি’ দিয়ে দিত, তারপরেও যদি ক্রিকেটাররা আর কোয়াব যদি খেলা বন্ধ করত তাহলে আপনি কোয়াবকে দোষ দিতে পারেন। ওই ক্রিকেট বোর্ড তো ওয়াদা করেছিল যে, ওই ব্যক্তিকে এই পজিশন থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। ওয়াদা করিয়ে ক্রিকেটারদের (খেলতে) রাজি করাল। এর দুইদিন পর ওই লোককে আবার ওই পজিশনে নিয়ে এলো।

আমি আরেকজনকে বলতে শুনলাম যে, ফারুক ভাইকে (সাবেক সভাপতি ফারুক আহমেদ) যখন অনাস্থা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তখন কোয়াব কেন কথা বলে নাই। আরে তখন তো এই কোয়াব গঠনই (এই কমিটি) হয় নাই! এই কোয়াব তো বুলবুল ভাইয়ের (সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম) সময়ে গঠিত হয়েছে। উনি নিজেও ভোট দিয়েছেন।

আপনি আর বুলবুল ভাই একসঙ্গে ভোট দিতে গিয়েছেন, সেই ছবিও আছে। আবার আপনাদের একসঙ্গে হওয়া সম্ভব?

তামিম: কেন নয়? তারা সবাই সাবেক ক্রিকেটার এবং দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ফারুক ভাই, বুলবুল ভাই যারাই আছেন, সবাই সবসময় আমার পূর্ণ শ্রদ্ধা পাবেন। আমাদের বিভেদ থাকতে পারে, মতের পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু সম্মানের জায়গায় তারা সবসময় আমার সম্মান পাবেন।

কোয়াব সভাপতি মিঠুনকে সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের বাংলাদেশ ‘এ’ দলে নেওয়া হয়েছে ৩৫ বছর বয়সে। এই বয়সে তার জাতীয় দলে ফেরার বাস্তব সম্ভাবনা কতটুকু? ইরফান শুক্কুরকেও ৩৩ বছর বয়সে নেওয়া হয়েছে ‘এ’ দলে, অধিনায়ক করা হয়েছে। তিনি চট্টগ্রামের ছেলে। সব মিলিয়ে আপনার দিকে আঙুল উঠছে যে, আপনি সভাপতি বলেই তারা এমন সুযোগ পাচ্ছেন!

তামিম: একটু দেখে নিয়েন, গত ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ইরফান শুক্কুর কত রান করেছে! (প্রায় ১২৮ স্ট্রাইক রেটে ৪৪৪ রান)। আচ্ছা বাদ দিন। আমি বলি, আই ডোন্ট গেট ইনটু সিলেকশন। তবে নির্বাচকদের প্রতি আমার পরিষ্কার বার্তা, বয়স বিবেচ্য হবে না, বয়স কোনো ইস্যু হওয়া উচিত নয়।

৩৫ বছর বয়সে কারও জাতীয় দলে ফেরা সম্ভব?

তামিম: যদি কেউ ৩৫ বছরে ফিট থাকে, তার যদি দুই বছর জাতীয় দলকে সার্ভ করার সামর্থ্য থাকে, অবশ্যই তাকে সুযোগ দেওয়া উচিত।

দ্বিতীয় অংশে আসি, ওই সময়ে কয়টা দল খেলছিল আমাদের? পাঁচটা দল ওই সময়ে সফরে ছিল। বুঝতে পারছেন, কতজন ক্রিকেটারের কথা বলছি আমরা! তো অনেকের নাম আসবেই। যাদের নাম এসেছে তারা কি এমন এমন কোনো ব্যক্তি বা এমন কোনো ক্রিকেটার, যাদের ঘরোয়া ক্রিকেটে কোনো পারফরম্যান্সই নাই? নির্বাচকরা যোগ্য মনে করলে অবশ্যই নেবেন।

সাব্বিরকেও তো নেওয়া হয়েছে। সাব্বিরকে আপনি আমার সঙ্গে রিলেট করতে পারবেন না দেখে তাকে নিয়ে প্রশ্ন করছেন না। ইরফানকে আমার সঙ্গে রিলেট করতে পারবেন, কারণ সে চট্টগ্রামের।

দেশের কোচিং স্টাফদের আপনি প্রাধান্য দিচ্ছেন। তারা কি আসলেই এতটা যোগ্য?

তামিম: আপনাকে একটা ছোট গল্প বলি, উত্তরটা পেয়ে যাবে। বয়সভিত্তিক দলের একজন বিদেশী কোচ চিন্তা করছিলাম। তবে ইন্টারভিউ তো সবারই নিতে হবে। একজন দেশী কোচ খুবই সুন্দর ইন্টারভিউ দিলেন। ইন্টারভিউয়ের মধ্যে একটা কথা আমাকে বললেন যেটা আমার কাছে খুবই যৌক্তিক লেগেছে আর স্ট্রাইক করেছে। তিনি বলেছেন যে, “যদি অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার বা ব্র্যান্ডন ম্যাককালামের কিংবা এই ধরনের কোচ নেওয়া হয়, তাহলে আমাকে না নেওয়া হোক। কিন্তু আমার মতোই বা আমার চেয়ে নিচের পোর্টফোলিওর কোচ স্রেফ বিদেশি দেখেই কাজ দেওয়া হবে, এটা অন্যায়।’ আমার মনে হয়েছে, হি ওয়াজ অ্যাবসোলুটলি ব্যাং অন। কাজটা তিনিই পেয়েছেন এবং যোগ্য বলেই পেয়েছেন।

জাতীয় দলের বোলিং কোচের বিষয়টায় আসি। শন টেট খুবই চমৎকার কাজ করছিলেন, কিন্তু পারিবারিক কারণে চলে গেছেন। তাৎক্ষণিক কোচ দরকার ছিল এবং এই মুহূর্তে দেশের বোলিং কোচদের মধ্যে তালহা জুবায়ের সেরাদের একজন। তাকে দায়িত্ব দেওয়ার পর মনে হয়েছে তাকে যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া উচিত নিজেকে প্রমাণ করার। কোনো না কোনো সময় তো দেশি কোচদের প্রমোট করতেই হবে। তিনি কি খারাপ করছেন?

২০২৭ বিশ্বকাপ পর্যন্ত কি তালহা থাকছেন?

তামিম: আমার ইচ্ছা, ২০২৭ বিশ্বকাপ পর্যন্ত বড় কোনো পরিবর্তন না আনা। হয়তো দু-একটি পজিশনে পরিবর্তন আসতে পারে বা ভালো দু-একজনকে পেয়ে গেলাম, তাহলে হয়তো চিন্তা করতে পারি। এছাড়া বিশ্বকাপ পর্যন্ত এই ম্যানেজমেন্টকে ডিস্টার্ব করতে চাই না।

ছেলেদের ক্রিকেটে বড় পরিবর্তন আনবেন না বলছেন, কিন্তু মেয়েদের ক্রিকেটে বড় পরিবর্তন তো মনে হয় জরুরি? মেয়েদের দল কেবল পেছনের দিকেই ছুটছে!

তামিম: আমি যদি একদম নির্মম সত্যি কথা বলি, আমার কাছে যেটা মনে হয়, মেয়েদের ক্রিকেট স্রেফ থাকতে হয় বলেই আমাদের আছে। খেলতে হবে বলেই একটা দল আছে। মেয়েদের ক্রিকেটের প্রথমত একটা স্ট্রাকচার তৈরি করতে হবে। সবকিছুই ঠিকঠাক করতে হবে।

আমার কাছে কি মেয়েদের ক্রিকেট গুরুত্বপূর্ণ? অবশ্যই, খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আইসিসি থেকে আমি কি বাতা পাই? মেয়েদের ক্রিকেটে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। আইসিসিতে বিভিন্ন মিটিংয়ে শুনছি যে, তাদের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হবে মেয়েদের ক্রিকেটে।

আমাদের একটা মেয়েদের দল থাকতে হয় বলেই আছে। তার পরও তারা এশিয়া কাপ জিতেছে। তাদেরকে কি আমরা একটা প্রপার স্ট্রাকচারের মধ্যে আনতে পারছি? সব দোষ অবশ্যই তাদের নয়।

আমাদের স্কুল ক্রিকেটে ১২০০-১৩০০ স্কুল খেলে। একটা স্কুল দেখেছেন যে মেয়েদের ক্রিকেট খেলে? স্কুল ক্রিকেটের দায়িত্বে যারা আছেন, তাদেরকে বলেছি পরের বছর নিশ্চিত করতে যেন অন্তত ১০টা স্কুল হলেও মেয়েদের ক্রিকেট খেলে। যদি আমার যেতে হয়, আমার পুরো বোর্ডের যদি যে হয় কোনো স্কুলকে রাজি করাতে, আমি নিজে যাব।

মেয়েদের ক্রিকেটে একদম শুরু থেকে শুরু করতে হবে এবং পরিপূর্ণ স্ট্রাকচার থাকতে হবে।

সেটা আপনারা কবে নাগাদ শুরু করবেন?

তামিম: অলরেডি শুরু করেছি, কাজ চলমান। আমাকে কিছুদিন সময় দিন…হয়তোবা একটু সময় লাগবে, তবে মেয়েদের ক্রিকেটে এমন স্ট্রাকচার দাঁড় করিয়ে দেব যে, সবকিছু একটা কাঠামোর মধ্যে হয়ে যাবে।

আপনাকে একটা জিনিস বলি, আমাদের জাতীয় দল আপনি জানেন যে, সসময় বিজনেস ক্লাসে ট্রাভেল করে। মেয়েদের জাতীয় দল কি তা করে? তারা ইকোনোমি ক্লাসে ট্রাভেল করে। ইকোনোমি ক্লাসে ট্রাভেল করার কষ্ট বেশি কার, একটা মেয়ে না ছেলের? অবশ্যই মেয়ের! আমি এটা শুনে বলেছি যে, যেগুলোর টিকেট করা আছে, সেগুলো তো আছেই, এর পরের সফর থেকে মেয়েরাও বিজনেস ক্লাসে যাবে।

একটা মজার গল্প বলি। সরকারের একজন মন্ত্রী আমাকে ফোন করে বললেন, ‘তামিম, আমাদের মেয়েরা এশিয়ান গেমস খেলতে যায়নি?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, গিয়েছে তো, এখন ফেরত আসছে।’ নাই? তিনি বললেন, “মেয়েরা বিজনেস ক্লাসে যায় নাকি ইকোনোমিতে?” তিনি আসলে আমাদের মেয়েদের সঙ্গে একই বিমানে আসছিলেন। ভিডিও কল করে দেখালেন। তার সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক, ব্যাপারটা অনুভব করেছেন। আমি বললাম, “ভাইয়া, এটা আপনি বলার আগেই আমরা করে দিয়েছি।”

আগের প্রশ্নটিই আবার করতে হচ্ছে। ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক, সুযোগ-সুবিধা সব বাড়ছে নারী ক্রিকেটেও। অনুশীলনের ফ্যাসিলিটিজ বাড়ছে। তাদের কাছ থেকে চাওয়াটা কি থাকবে?

তামিম: এসব যখন বাড়ছে, ক্রিকেটারদের দায়িত্বও বাড়ছে। আমরা তিনটা জিনিস চাই- ডিসিপ্লিন, প্রফেশনালিজম, ফিটনেস। এই তিনটা জায়গায় ‘নো ননসেন্স পলিসি।’ মেয়েদের ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রেও সেটা সত্যি।

আমি ব্যক্তিগতভাবে নারী ক্রিকেটারদের সঙ্গে কথা বলেছি যে, “তোমরা কোনো কিছু চাওয়ার আগেই সব দিচ্ছি। কিন্তু এখন থেকে ফিটনেস হবে চূড়ান্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।”

আমাদের যে রিহ্যাব ম্যানেজার এসেছেন (শ্রীলঙ্কার মারিও ভিল্লাভারায়ন), তাকে বলেছি যে, মেয়েদেরও একটা ফিটনেস রুটিন বানানো হোক যে কোন লেভেলের ফিটনেস তাদের মেইনটেইন করতে হবে। যত বড় ক্রিকেটারই হোক, একটা ফিটনেস ফিটনেস ফ্রেমওয়ার্কের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

আমার কথা হলো আমরা সব ধরনের ফ্যাসিলিটজ তাদেরকে প্রোভাইড করব, কিন্তু ক্রিকেটারদেরও একটা জবাবদিহিতা থাকতে হবে আর ওসব ব্যাপারের সঙ্গে আমি কখনও আপস করব না।

আপনার স্বপ্নের প্রকল্প এক্সিলেন্স সেন্টার হয়ে গেলে নিশ্চিতভাবেই ফ্যাসিলিটিজ বাড়বে। আপনি সম্প্রতি ভারতে গিয়ে তাদের এক্সিলেন্স সেন্টার দেখে এসেছেন, যেটা অসাধারণ। ওখানে কি কি দেখলেন যেটা বাংলাদেশে আছে আর কি কি নেই?

তামিম: আমি যখন ওখানে যাই, তখন আইসিসি প্রধান নির্বাহীর (সাঞ্জোগ গুপ্তা) সঙ্গে কথা বলে যাই। তিনি আমাকে একটা খুব সুন্দর একটা কথা বলেছিলেন, “তুমি ওখানে যাচ্ছো, দ্যাটস গ্রেট.. তবে ম রেখো, তাদের অঢেল অর্থ আছে। তুমি ওখানে গিয়ে দেখবে যে তোমার দেশে কি কি দরকার আর কি কি দরকার নেই।” আমি সেই মানসিকতা নিয়েই গিয়েছিলাম।

ওখানে এমনও অনেক মেশিন আছে, যেটার মূল্য অনেক। কিন্তু আমার হয়তো এখনই তা জরুরি নয়। আমি ওটাই দেখেছি, যেটা আমার দরকার।

বিসিবি সভাপতি হিসেবে আপনি নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ক্রিকেটে কোন ব্যাপারটি করতে চান? আর দীর্ঘমেয়াদে, যখন দায়িত্ব থেকে চলে যাবেন, তখন দেশের ক্রিকেটকে কোন অবস্থানে দেখতে চান?

তামিম: ইমিডিয়েটলি বললেন, ঘরোয়া ক্রিকেটকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দেখতে চাই। ক্রিকেটাররা যেন ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলতে রোমাঞ্চ নিয়ে অপেক্ষায় থাকে। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ সবসময়ই রোমাঞ্চকর। চার দিনের ম্যাচ ও অন্যান্য জায়গাতেও তা দেখতে চাই। কিছুটা এর মধ্যেই শুরু হয়েছে ম্যাচ ফি বাড়ার কারণে। তবে ম্যাচ ফি বাড়ালাম, কিন্তু মাঠের ক্রিকেট ভালো হলো না, তা হতে পারে না। ওই পেশাদারিত্ব যাতে ক্রিকেটারদের মধ্যে আসে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

আর ভবিষ্যতের কথা ভাবলে, প্রচুর ফ্যাসিলিটি গড়ে তুলতে চাই। অনেকে বলতে পারেন যে, আমি এখন কেন শুধু ঢাকায় মনোযোগ দিচ্ছি। কিন্তু আমার কথা হলো, ঢাকা দিয়েই শুরু হোক। মূল স্টোর থেকে শুরু করি। ঢাকায় একটা লেভেল পর্যন্ত করতে পারলে তার পর আস্তে আস্তে সিলেট, চট্টগ্রাম, খুলনা হতে পারে। ক্রিকেট বোর্ড আর্থিকভাবে শক্তিশালী, তবে এটারও তো সীমা আছে। চাইলেও সবকিছু একসঙ্গে করা সম্ভভ নয়।

শেষ প্রশ্ন। নাজমুল হাসান পাপনের বিদায়ের পর দুই বছরে তিনজন বোর্ড সভাপতি দেখা গেল। সাবেক ক্রিকেটার বা প্রশাসকদের অনেকেই একটা কথা বলেন, সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা হয় যে, বিসিবি সভাপতি পদে কি মধু আছে যে সবাই এখানে আসতে চায়? আপনি নিজে কেন মরিয়া ছিলেন?

তামিম: ভালো প্রশ্ন। এখানে ‘ডেসপারেট’ হওয়া বা মধু, যেটাই বলেন, এটা নির্ভর করে আপনি কোন উদ্দেশ্য নিয়ে বোর্ড সভাপতি হচ্ছেন। আপনি যদি ডেভেলপমেন্টের জন্য চিন্তা করে ক্রিকেটের বোর্ডের সভাপতি হতে চান, তাহলে ইউ আর গোয়িং টু লুজ আ লট অফ থিংস। কারণ এখানে অনেক সময় দিতে হয়, যা আপনার ব্যক্তিগত ব্যবসা ও জীবনে ক্ষতি করতে পারে। আবার, আপনার নিয়ত যদি খুব বেশি একটা ভালো না থাকে, তাহলে আপনি আরেকরকম। এখন কে কী বলেছে বা কী চায়, আমার জন্য বলাটা একটু মুশকিল।

আপনি কেন হতে চেয়েছেন?

তামিম: আল্লাহর রহমত আর মানুষের দোয়ায় ও ভালোবাসায় আমার একটা জিনিসের অভাব নেই, সেটা হলো ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস।’ আমি বিসিবি সভাপতি হই বা না হই, আমার আইডেন্টিটি দরকার নাই। এটা একটা কারণ হতে পারে। আমি কাজ করতে এসেছি।

যদিও এখনই মন্তব্য করাটা অনেক দ্রুত হয়ে যায়, তার পরও বলছি, আমি আগে যে জায়গাগুলো নিয়ে অভিযোগ করেছি, সেগুলো নিয়ে কাজ না করে যদি স্রেফ খ্যাতিটা উপভোগ করতাম, তাহলে আপনি অবশ্যই প্রশ্ন করতে পারেন। তবে আমি এখানে আসার পর তিন মাসের মধ্যে ওই কাজগুলো করেছি নাকি করিনি? যদি করে থাকি, তাহলে এই প্রশ্নটি করা উচিত নয়।