বেয়ারস্টোর আউট নিয়ে বিতর্ক চলছেই
ক্রিকেটীয় চেতনার প্রশ্ন তুলছেন ইংল্যান্ডের কোচ ও অধিনায়ক, অন্যায় কিছু দেখছেন না অস্ট্রেলিয়ান কোচ ও অধিনায়ক।
টেস্ট শেষ, কিন্তু রয়ে গেছে রেশ। শেষ দিনের উত্তেজনা, বেন স্টোকসের অসাধারণ ইনিংস আর ম্যাচের মাঝপথে ন্যাথান লায়নকে হারিয়েও অস্ট্রেলিয়ার দুর্দান্ত জয় নিয়ে আলোচনা তো চলছেই। তবে সব ছাপিয়ে যাচ্ছে জনি বেয়ারস্টোর আউট নিয়ে বিতর্ক। দুই দলের কোচ-অধিনায়কের মন্তব্য ও পাল্টা মন্তব্য চলছে। ক্রিকেটীয় চেতনার সেই চিরন্তন প্রসঙ্গও উসকে উঠছে বারবার।
লর্ডস টেস্টের শেষ দিনের প্রথম সেশনের ঘটনা সেটি। ক্যামেরন গ্রিনের ওভারের শেষ বল সেটি। শর্ট ডেলিভারিটি মাথা নিচু করে ছেড়ে দেন জনি বেয়ারস্টো। অস্ট্রেলিয়ান কিপার অ্যালেক্স কেয়ারি বল গ্লাভসে নিয়ে আস্তে করে ছুড়ে দেন স্টাম্পের দিকে। বল ছেড়ে দেওয়ার পর বেয়ারস্টো ততক্ষণে ক্রিজ ছেড়ে সামনে এগিয়ে গেছেন। বল ছোবল দেয় স্টাম্পে। অস্ট্রেলিয়ানরা আবেদন করেন। হতভম্ব হয়ে পড়েন বেয়ারস্টো। তৃতীয় আম্পায়ার রিপ্লে দেখে ঘোষণা করেন, ‘আউট।’
বেয়ারস্টো মাঠ ছাড়েন হতাশায়। লর্ডসের গ্যালারি থেকে তখন ‘দুয়ো’ ভেসে আসছে প্রবলভাবে। খেলার পরের সময়টাতেও দর্শকেরা দুয়ো দিয়ে যান অস্ট্রেলিয়ানদের। সেসময় ধারাভাষ্যে থাকা সাবেক দুই ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইক আথারটন ও ওয়েন মর্গ্যান অবশ্য অসাবধানতার জন্য দায় দেন বেয়ারস্টোকেই।
আম্পায়ার মনে করেছেন, বল তখনও ডেড হয়নি এবং ক্রিকেটের আইন অনুযায়ী, বেয়ারস্টো আউট। এতে আপত্তি নেই বেন স্টোকসেরও। তবে ক্রিকেটীয় চেতনার কথা টেনেই বিবিসি টেস্ট ম্যাচ স্পেশালে ইংল্যান্ড অধিনায়ক বললেন, এভাবে জিততে চান না তারা।
“আম্পায়ার ওভার ডেকে ফেলেছেন, এটা কখন থেকে গণ্য হবে? অন-ফিল্ড আম্পায়াররা যখন নড়াচড়া শুরু করবেন, সেটিই কি ওভার হিসেবে ধরে নেওয়া হবে? নিশ্চিত নই আমি। জনি (বেয়ারস্টো) ক্রিজে ছিল, আবার বাইরে গেছে… এটা আউট কি না, এই তর্ক করছি না, কারণ এটা আউট।”
“যদি আমি ঘটনার অন্য পাশে থাকতাম, তাহলে আম্পায়াদের ওপর আরও চাপ প্রয়োগ করতাম এবং জিজ্ঞেস করতাম, তারা ‘ওভার’ ডেকেছেন কি না এবং খেলাটির স্পিরিট নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতাম এবং ভাবতাম যে, এরকম কিছু আমি করতে চাই কি না। অস্ট্রেলিয়ার জন্য এটি ছিল ম্যাচ জয়ের মুহূর্ত। কিন্তু আমি কি এভাবে ম্যাচ জিততে চাইব? আমার কাছে উত্তরটি হলো, ‘না'।”
প্যাট কামিন্সের জায়গায় তিনি থাকলে আউটের আবেদন প্রত্যাহার করতেন কি না, এই প্রশ্নে স্টোকর উত্তর, “হ্যাঁ।”
তবে অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক কামিন্স স্কাই স্পোর্টসকে বলেন, এখানে ক্রিকেটীয় চেতনার বিরোধী কিছু দেখেন না তিনি।
“কেয়ারি বেশ কয়েকবারই দেখেছে যে সে (বেয়ারস্টো) বাইরে যাচ্ছে। তিন-চার বল আগেও দেখেছে। (আউটের সময়) সে একটুও থমকে থাকেনি, বল ধরেই সরাসরি স্টাম্পে থ্রো করেছে।”
“আমার মতে, এটা পুরোপুরিই ফেয়ার প্লে। নিয়মই তো এমন। অনেকে হয়তো একমত হবেন না। তবে আমি এটাকে এভাবেই দেখি।”
জনি বেয়ারস্টো নিজেই যে কিপিং করার সময় বারবার এরকম থ্রো করে থাকেন, সেটি উল্লেখ করতেও ভুল করেননি অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক।
“জনিকে (বেয়ারস্টো) তো এটা সবসময়ই করতে দেখা যায়। এই টেস্টেও প্রথম দিনে ডেভিড ওয়ার্নারকে করেছে, ২০১৯ সালে স্মিথকে করেছে। কোনো ব্যাটার যদি বারবার ক্রিজ ছেড়ে যায়, সেক্ষেত্রে কিপারদের জন্য এভাবে থ্রো করা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।”
“পুরো কৃতিত্ব কেয়ারির। সে সুযোগ দেখেছে এবং কাজে লাগিয়েছে। জনি কয়েক বল আগেও এটা করেছে। এবারও জনি ক্রিজ ছেড়েছে। ব্যস, বাকিটা আম্পায়ারদের ওপর।”
ইংল্যান্ড কোচ ও সাবেক নিউ জিল্যান্ড অধিনায়ক ব্রেন্ডন ম্যাককালাম অবশ্য ক্রিকেটীয় চেতনা ভঙ্গের অভিযোগ সরাসরিই তুললেন। বিবিসি টেস্ট ম্যাচ স্পেশালে তিনি জানালেন আউটটি নিয়ে জনি বেয়ারস্টোর ভাবনাও।
“প্রথমত আমার মনে হয়, এটা খেলাটির স্পিরিটের ব্যাপার, যেটা গড়ে ওঠে কিছুটা পরিণত হওয়ার সঙ্গে এবং লম্বা সময় খেলাটা খেললে। তখন মনে হয়, খেলাটিকে সুরক্ষা দেওয়ার একটি দায়িত্ব আমাদের আছে এবং সেটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ, খেলার চেতনাকে ধরে রাখা। এই সিদ্ধান্তগুলি মুহূর্তের মধ্যে নিতে হয়। এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয় এবং অনেক সময় এসব শুধু খেলার ওপরই বড় প্রভাব ফেলে না, লোকের আচরণেও প্রভাব ফেলে।”
“এটা কঠিন সিদ্ধান্ত। আইনের চোখে, এটা আউট। আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে, জনি মনে করে, সে অবশ্যই রান নেওয়ার চেষ্টা করছিল না এবং তার মনে হয়েছে, আম্পায়াররা ওভার ডেকেই ফেলেছেন একরকম, এজন্য বল ডেড হয়ে গিয়েছিল। সত্য বলতে, এটা হজম করা কঠিন। খেলা শেষে ছোট ব্যবধানটার দিকে তাকালে যখন মনে হয়, জনির মতো একজন, সে কতগুলো রান তাড়ায় দারুণভাবে দাঁড়িয়ে গেছে… এটা তাই হতাশাজনক। তবে দিনশেষে এটা নিয়ে অনেকের অনেক মতামত থাকবেই।”
এই আউট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ানদের সঙ্গে সম্পর্কও শীতল হবে বলে ইঙ্গিত দিলেন ইংল্যান্ড কোচ।
“কল্পনাও করতে পারছি না, খুব দ্রুতই একসঙ্গে বসে আমরা বিয়ার পান করব, যদি সেটি জিজ্ঞেস করতে চান। আমাদের দিক থেকে, তিনটি টেস্ট ম্যাচ আছে আমাদের, চেষ্টা করব আঘাত করার এবং অ্যাশেজ জেতার। সেদিকেই এখন আমাদের মনোযোগ।”
ইংল্যান্ড কোচের এই মন্তব্য জেনে হতাশ অস্ট্রেলিয়ান কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ড।
“তার (ম্যাককালাম) সঙ্গে আমার কথা হয়নি। তার এই মন্তব্যও আমি প্রথমবার শুনলাম এবং এটিই যদি বলে থাকেন, তাহলে তা কিছুটা হতাশাজনক।”
অস্ট্রেলিয়ান কোচের মতে, অন্য অনেক আউটের মতো এক্ষেত্রেও স্রেফ সুযোগ কাজে লাগিয়েছে তার দল।
“এটা নিয়ে কোনো সংশয়ই নেই যে, কোনো ক্রিকেটার যখন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ক্রিজ ছেড়ে যায়, সেই সুযোগটা সবাই নিতে চায়। সবার ক্ষেত্রেই এটি সত্যি। কোনো ব্যাটার যখন ন্যাথান লায়নকে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে মারতে চায়, তখন কি সুযোগটি নিতে বোলার লেগ সাইডে জোরের ওপর বল করবে না? পয়েন্ট থেকে রান আউট করার সুযোগ পেলে বোলারের প্রান্তে থ্রো করা হয় না?”
“এসব আউটের ক্ষেত্রে মতামতের ভিন্নতা থাকবেই। চতুর্থ দিনে মিচেল স্টার্কের নেওয়ার ক্যাচের ক্ষেত্রেও এটি দেখেছি আমরা। কেউ বলেছে সেটি আউট, কেউ মনে করেছেন নট আউট। সবাই সবকিছুতে একমত হয় না।”
ইংল্যান্ডের কোচ অস্ট্রেলিয়ানদের সঙ্গে সম্পর্কের শীতলতার কথা বললেও অবশ্য অধিনায়কের কণ্ঠে অতটা লড়াইয়ের সুর নেই। কোনো ক্ষোভ বা অভিযোগ পুষে রাখতে চান না স্টোকস।
“সত্যি বলতে, এখন সবার মধ্যেই অনেক আবেগ খেলা করছে। ঘটনার পর এখনও খুব বেশি সময় যায়নি। তবে আমি এমন নই যে ক্ষোভ খুব একটা ধরে রাখব। এসবকে পেছনে ফেলার মতো যথেষ্ট কিছুর স্বাক্ষী আমি হয়েছি। তবে এটা ঠিক, একটি ধারাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা, সেটিও এমন লম্বা ও বড় সিরিজে, এই ঘটনার পর কিছু লোকের ভাবনা অবশ্যই পাল্টাবে সিরিজের সামনের সময়টায়।”
