রান আউট বিতর্কের ম্যাচে শ্রীলঙ্কাকে গুঁড়িয়ে সিরিজ ইংল্যান্ডের
টম ব্যান্টনের সেঞ্চুরির পর বোলারদের দাপটে বিশাল জয় পেল ইংলিশরা।
স্কয়ার লেগ আম্পায়ার প্রথমে দিলেন আউট। রিপ্লে দেখে সেই সিদ্ধান্ত পাল্টে দিলেন তৃতীয় আম্পায়ার। একটু পর বদলে গেল তার আগের সিদ্ধান্তও! নিরুত্তাপ ম্যাচে হঠাৎ উত্তেজনা ছড়াল পাভান রাত্নায়েকের রান আউটের এই ঘটনা। শ্রীলঙ্কা যদিও লড়াই জমাতেই পারল না। বিশাল জয়ে ওয়ানডে সিরিজ নিজেদের করে নিল ইংল্যান্ড।
তৃতীয় ওয়ানডেতে ২২৩ রানের জয়ে তিন ম্যাচের সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জিতল হ্যারি ব্রুকের দল।
এই সংস্করণে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে রানের হিসাবে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় জয় এটিই। সেই ১৯৯৯ সালে পার্থের ওয়াকায় ১২৮ রানের জয় ছিল তাদের আগের রেকর্ড।
ওভালে রোববার স্বাগতিকদের জয়ের ভিত গড়ে দেয় দারুণ তিনটি ইনিংস। প্রথম আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরিতে ১০৫ বলে ১২৬ রান করেন ওপেনার টম ব্যান্টন। চার নম্বরে অধিনায়ক ব্রুক করেন ৬৬ বলে ৭৭। পাঁচ নম্বরে জর্ডান কক্সের ব্যাট থেকে আসে ৫২ বলে ৭৬ রানের ঝড়ো ইনিংস।
৫০ ওভারে ইংল্যান্ড তোলে ৩৫৫ রান। জবাবে শুরু থেকে ধুঁকতে থাকা শ্রীলঙ্কা ৩০ ওভারের মধ্যে গুটিয়ে যায় স্রেফ ১৩২ রানে।
আলোচিত ঘটনাটি শ্রীলঙ্কার ইনিংসের ১৫তম ওভারে। স্পিনার লিয়াম ডসনের বল শর্ট থার্ড ম্যান অঞ্চলের দিকে ঠেলে ঝুঁকিপূর্ণ একটি রান নিতে যান চারিথ আসালাঙ্কা। ফিল্ডার জফ্রা আর্চারের সরাসরি থ্রোয়ে বল উইকেটরক্ষকের প্রান্তের স্টাম্পে আঘাত করার মুহূর্তে এবং স্টাম্প ও বেলসের এলইডি লাইট জ্বলে ওঠার সময় রাত্নায়েকে ক্রিজ থেকে বেশ খানিকটা দূরেই ছিলেন।
স্কয়ার লেগ আম্পায়ার রব হোয়াইট শুরুতে তৃতীয় আম্পায়ার অ্যাড্রিয়ান হোল্ডস্টকের সহায়তা না নিয়েই আউট ঘোষণা করেন। তবে পরে মূল আম্পায়ার ওয়েইন নাইটসের সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্তটি পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়। রিপ্লেতে দেখা যায়, বল স্টাম্পে আঘাত করার ঠিক আগমুহূর্তে কিপার জর্ডান কক্সের গ্লাভসের স্পর্শে বেলস পড়ে যায়।
প্রায় দুই মিনিট পর্যালোচনার পর হোল্ডস্টক প্রাথমিক সিদ্ধান্তটি বদলে ফেলার ইঙ্গিত দেন এবং স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় ‘নট আউট’ লেখা ভেসে ওঠে; তবে পানি পানের বিরতির সময়ও তিনি সিদ্ধান্তটি পুনরায় বিবেচনা করতে থাকেন। আরও ৯০ সেকেন্ড পর্যালোচনার পর আউট ঘোষণা করেন তিনি। বিভ্রান্ত হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাঠ ছাড়েন রাত্নায়েকে।
টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে ইংল্যান্ডের শুরুটা ভালো ছিল না। বেন ডাকেট বিদায় নেন শূন্য রানে। তিনে নেমে থিতু হয়ে ইনিংস বড় করতে পারেননি জো রুট (৩৭ বলে ১৮)। ৬৮ রানের মধ্যে ২ উইকেট হারায় তারা।
তবে তৃতীয় উইকেটে ১১৭ বলে ১৫০ রানের দারুণ জুটিতে দলকে বড় সংগ্রহের ভিত গড়ে দেন ব্যান্টন ও ব্রুক।
দুজনই শুরুতে কিছুটা সময় নেন, প্রথম ২৫ ওভারে ইংল্যান্ডের রান ছিল ২ উইকেটে ১০৮। এরপর ২৫ থেকে ৩৪ ওভারের মধ্যে তারা বিধ্বংসী হয়ে ওঠেন। এই ৯ ওভারে আসে ১০৬ রান।
ব্রুককে ফিরিয়ে বড় জুটি ভাঙেন আসিথা ফার্নান্দো। ৯ চার ও দুই ছক্কায় গড়া ইংল্যান্ড অধিনায়কের ৬৬ বলে ৭৭ রানের ইনিংস।
ব্রুকের বিদায়ের আগেই ব্যান্টন সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ৯৫ বলে। এই সিরিজ দিয়ে প্রথমবার ওপেনিংয়ে সুযোগ পেয়ে প্রথম ম্যাচে তিনি আউট হন ১০ রানে। পরের ম্যাচে করেন ৬২ বলে ৭৭। সেটি ছাড়িয়ে এবার করলেন প্রথম সেঞ্চুরি।
মাইলফলক ছোঁয়ার পর দিলশান মাদুশাঙ্কার টানা তিন বলে দুটি ছক্কা ও একটি চার মারেন ব্যান্টন। সাচিন্দু কলম্বাগেকে পরপর দুটি চার মেরে পরের বলে আউট হয়ে যান তিনি।
১৬ চার ও পাঁচ ছক্কায় গড়া তার ১২৬ রানের ইনিংসটি।
ব্যান্টনের বিদায়ের সময় ৩৮ ওভারে ইংল্যান্ডের সংগ্রহ ছিল ৪ উইকেটে ২৪২ রান। সেখান থেকে দলের রান সাড়ে তিনশ পার করার কৃতিত্ব কিপার-ব্যাটসম্যান কক্সের।
আগের ম্যাচে জস বাটলার চোটে না পড়লে হয়তো এই ম্যাচে খেলারই সুযোগ হতো না কক্সের। হঠাৎ পাওয়া সুযোগটা দারুণভাবে কাজে লাগান তিনি। প্রায় দুই বছর পর ওয়ানডে খেলতে নেমে প্রথম ফিফটি করেন ৪২ বলে।
শেষ ওভারে থামে তার ছয় চার ও দুই ছক্কায় গড়া ৫২ বলে ৭৬ রানের ইনিংসটি। দুটি ক্যামিও ইনিংস খেলেন উইল জ্যাকস (২১ বলে ২৫) ও জেমি ওভারটন (১৪ বলে ২১*)।
শ্রীলঙ্কার হয়ে সর্বোচ্চ তিনটি উইকেট নেন আসিথা।
বড় লক্ষ্য তাড়ায় এই সফরে আরও একবার শ্রীলঙ্কা তাদের সেই পরিচিত ও হতাশাজনক ব্যাটিং ধসের শিকার হয়। শুরু থেকেই তাদের ব্যাটিং লাইনআপ হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে।
৩ উইকেটে ৫৩ থেকে একপর্যায়ে তাদের স্কোর হয়ে যায় ৬ উইকেটে ৮২। সেখান থেকে কোনোমতে পার করতে পারে একশ। ২০ রানের গণ্ডি পার হতে পারেন কেবল একজন। সেই কুসাল মেন্ডিস করেন ৩৫ রান।
বাঁহাতি স্পিনে আট ওভারে ২৬ রানে ৩ উইকেট নিয়ে ইংল্যান্ডের সফলতম বোলার ডসন। পাঁচ ওভারে ২৬ রানে দুটি উইকেট নেন পেসার গাস অ্যাটকিনসন।
এই সফরে ছয় ম্যাচের একটি ছাড়া বাকি সবকটিতেই হেরেছে শ্রীলঙ্কা। এর আগে টি-টোয়েন্টি সিরিজে তাদের ৩-০ ব্যবধানে বিধ্বস্ত করে ইংল্যান্ড।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
ইংল্যান্ড: ৫০ ওভারে ৩৫৫ (ব্যান্টন ১২৬, ডাকেট ০, রুট ১৮, ব্রুক ৭৭, কক্স ৭৬, জ্যাকস ২৫, ওভারটন ২১*, ডসন ০; আসিথা ৯-০-৬৪-৩, মাদুশাঙ্কা ৭-০-৪৯-১, মালিঙ্গা ৯-০-৬৫-০, ওয়েলালাগে ৯-১-৬২-০, লিয়ানাগে ৬-০-৩৭-১, কলম্বাগে ১০-০-৭১-২)
শ্রীলঙ্কা: ২৯.১ ওভারে ১৩২ (নিসাঙ্কা ১, কামিন্দু মেন্ডিস ১২, কুসাল মেন্ডিস ৩৫, রাত্নায়েকে ১৮, আসালাঙ্কা ৭, লিয়ানাগে ১৯, ওয়েলালাগে ৫, কলম্বাগে ৪, মালিঙ্গা ১৪, আসিথা ৬, মাদুশাঙ্কা ২*; অ্যাটকিনসন ৫-০-২৬-২, বেকার ৪-০-২৭-১, আর্চার ৩-০-১৫-০, জ্যাকস ৩.১-০-৮-১, ডসন ৮-০-২৬-৩, রুট ৩-০-১৫-১, ওভারটন ৩-০-১০-১)
ফল: ইংল্যান্ড ২২৩ রানে জয়ী
সিরিজ: ৩ ম্যাচের সিরিজ ইংল্যান্ড ২-১ ব্যবধানে জয়ী
ম্যান অব দা ম্যাচ: টম ব্যান্টন
ম্যান অব দা সিরিজ: উইল জ্যাকস
