Published : 11 Aug 2025, 12:26 PM
ওল্ড ট্র্যাফোর্ড আর শেন ওয়ার্ন- ব্যস, আর কিছু বলার প্রয়োজন নেই। এটুকু বললেই সবার চোখে ভেসে উঠবে ১৯৯৩ অ্যাশেজের জাদুকরী সেই ডেলিভারি। বোল্ড হওয়ার পর মাইক গ্যাটিংয়ের হতভম্ব হয়ে যাওয়া চেহারা এখনও সেই ডেলিভারির বিস্ময়ের প্রতীক। টেস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় ডেলিভারিগুলোর ছোট্ট তালিকাতেই থাকবে সেটি। তবে ওয়ার্ন ও ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের সম্পর্কের শেষ নয় সেখানেই!
অনেক ইতিহাসের স্বাক্ষী ইংল্যান্ডের এই মাঠেই ১২ বছর পর আরেকটি স্মরণীয় মুহূর্তের জন্ম দেন অস্ট্রেলিয়ার স্পিন জাদুকর। টেস্ট ইতিহাসের প্রথম বোলার হিসেবে স্পর্শ করেন ৬০০ উইকেটের মাইলফলক।
ওয়ার্নের হাত ধরে টেস্ট ক্রিকেটের নতুন উচ্চতায় ওঠার ২০ বছর পূর্ণ হলো। ২০০৫ অ্যাশেজে মার্কাস ট্রেসকোথিককে আউট করে লেগ স্পিনের শিল্পী এই অনির্বচনীয় স্বাদ পেয়েছিলেন আজকের দিনটিতেই।
ওই অ্যাশেজকে বিবেচনা করা হয় সবসময়ের সেরা টেস্ট সিরিজগুলোর একটি। সিরিজের তৃতীয় টেস্ট ছিল ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে। লর্ডসে প্রথম টেস্টে অস্ট্রেলিয়া জিতেছিল বড় ব্যবধানে। এজবাস্টনে মঞ্চায়িত হয়েছিল ইতিহাসের রোমাঞ্চকর টেস্টগুলোর একটি। নিশ্চিত পরাজয়ের মুখ থেকে চতুর্থ ইনিংসে টেল-এন্ডারে ওয়ার্ন, ব্রেট লিগ ও মাইকেল ক্যাসপ্রোভিচের বীরোচিত ব্যাটিংয়ে জয়ের দুয়ারে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ২ রানে হেরেছিল অস্ট্রেলিয়া।
ওই টেস্টে ১০ উইকেট নিয়েছিলেন ওয়ার্ন। প্রথম দুই টেস্টে ১৬ উইকেট নেওয়ার পর ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ছয়শর মাইলফলক থেকে স্রেফ একটি উইকেট দূরে ছিলেন তিনি।
ব্যাটিং সহায়ক উইকেটে টস জিতে ব্যাটিং নেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইকেল ভন। অ্যান্ড্রু স্ট্রাউসকে দ্রুত হারালেও দ্বিতীয় উইকেটে শতরানের জুটি গড়ে ফেলেন ট্রেসকোথিক ও ভন।
উইকেট থেকে তেমন কোনো সহায়তা পাচ্ছিলেন না পেসাররা। প্রথম দিনের উইকেটে তবু তিন পেসার গ্লেন ম্যাকগ্রা, ব্রেট লি ও জেসন গিলেস্পিকে দিয়েই প্রথম সেশন বোলিং করান অধিনায়ক রিকি পন্টিং। লাঞ্চের পর আধ ঘণ্টা চলে পেস-প্রচেষ্টাই। অবশেষে ওয়ার্ন বল হাতে পান ৩৪তম ওভারে।
প্রথম চার ওভারে বেশ কয়েকবার ট্রেসকোথিক ও ভনকে পরীক্ষায় ফেলেন ওয়ার্ন। তার পঞ্চম ওভারে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত।
বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের জন্য অফ স্টাম্পে পড়া ডেলিভারি স্পিন করে ভেতরে ঢুকছিল। সুইপ করার চেষ্টায় ব্যর্থ হন ট্রেসকোথিক। তার গ্লাভস ছুঁয়ে যাওয়া বল কিপার অ্যাডাম গিলক্রিস্টের ঊরুতে লেগে খানিকটা ওপরে উঠে যায়, এরপর গ্লাভসে জমান তিনি।
জোরাল আবেদনে আম্পায়ার বিলি বাউডেন আঙুল তুলে দিতেই দুই হাত ওপরে তুলে চেনা উদযাপনে মেতে ওঠেন ওয়ার্ন। এগিয়ে এসে সতীর্থরা জড়িয়ে ধরেন তাকে। তিনি তখন সবার মধ্যমণি। ধারাভাষ্যকক্ষে মার্ক নিকোলাসের উচ্চারণ, “সিক্স হান্ড্রেড টেস্ট ম্যাচ উইকেটস ফর শেন ওয়ার্ন, হোয়াট আ মোমেন্ট…।”
গোটা গ্যালারি দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে অভিবাদন জানায় ওয়ার্নকে। করতালির জোয়ার বইতে থাকে লম্বা সময়। ওভার শেষে টুপি খুলে তাদের অভিবাদনের জবাব দেন ওয়ার্ন।
ওই সময় বিবিসিকে ওয়ার্ন বলেছিলেন, “৬০০ উইকেট পাওয়া, এর আগে কেউ কখনও এমন কিছু করতে পারেনি। এই অর্জনের জন্য বেশ গর্বিত অনুভব করছি। এই মাঠে এটি করতে পারাটাও দারুণ স্পেশাল, তার ওপর আমার বাবা-মাও এখানে আছেন।”
ম্যাচের প্রথম দিন আর কোনো উইকেট ওয়ার্ন পাননি। দ্বিতীয় দিন তিনটি শিকার ধরে ইনিংস শেষ করেন তিনি চার উইকেট নিয়ে।
দ্বিতীয় ইনিংসে আর কোনো উইকেট না পেলেও ব্যাট হাতে দুই ইনিংসেই দারুণ পারফর্ম করেন ওয়ার্ন। প্রথম ইনিংসে সাত নম্বরে নেমে দলের সর্বোচ্চ ৯০ রান করেন তিনি ১২২ বল খেলে। দলের আর কেউ চল্লিশও ছুঁতে পারেননি। প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ডের ৪৪৪ রানের জবাবে ৩০২ রান করে অস্ট্রেলিয়া।
এরপর ৪২৩ রানের লক্ষ্য তাড়ায় শেষ দিনের প্রায় ৩১ ওভার বাকি থাকতে যখন ২৬৪ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে হারের শঙ্কায় পড়ে যায় অস্ট্রেলিয়া, তখন অষ্টম উইকেটে পন্টিংয়ের সঙ্গে প্রায় ২২ ওভার কাটিয়ে দেন ওয়ার্ন। ৯ নম্বরে ৯৯ মিনিট উইকেটে থেকে ৬৯ বলে ৩৪ রানের ইনিংস খেলেন তিনি।
পন্টিং ১৫৬ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে বিদায় নেওয়ার পরও দিনের বাকি ছিল ২৪ বল। শেষ জুটিতে সময়টুকু কাটিয়ে দিয়ে ম্যাচ বাঁচিয়ে ফেরেন ব্রেট লি ও গ্লেন ম্যাকগ্রা।
পন্টিং পরে অনেকবারই বলেছেন, অধিনায়ক হিসেবে তাকে পোক্ত করেছিল ওই ইনিংস। ক্যারিয়ারের সবচেয়ে লড়িয়ে ও সেরা ইনিংস তিনি মনে করেন এটিকেই।
ক্রিকেটবিশ্বকে রোমাঞ্চ ও উত্তেজনার জোয়ারে ভাসানো সিরিজে অস্ট্রেলিয়া শেষ পর্যন্ত হেরে যায় ২-১ ব্যবধানে। শেষ হয় অ্যাশেজে তাদের দেড় যুগের আধিপত্য। তবে অসাধারণ ওয়ার্নের সেটি ছিল ক্যারিয়ারের সেরা সিরিজ।
সেবার ৫ টেস্টে ১৯.৯২ গড়ে ৪০ উইকেট নিয়ে সিরিজ শেষ করেন তিনি। সিরিজে আর কেউ ২৪টির বেশি উইকেট পাননি। তিনি নিজেও ক্যারিয়ারে ছয় ম্যাচের সিরিজ খেলেও কখনও ৩৫ উইকেটও পাননি আর।
পরের অ্যাশেজে টেস্ট ইতিহাসে ৭০০ উইকেট শিকারি প্রথম বোলারও হয়ে যান ওয়ার্ন। ২০০৬ সালে বক্সিং ডে টেস্টে মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে প্রায় ৯০ হাজার দর্শকের সামনে ম্যাচের প্রথম দিনের ৪৭তম ওভারে অ্যান্ড্রু স্ট্রাউসকে বোল্ড করে মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি।
ওই সিরিজ দিয়ে ২০০৭ সালে তিনি টেস্ট ক্যারিয়ারের ইতি টানেন ৭০৮ উইকেট নিয়ে। ক্যারিয়ারের শেষ সিরিজেও তার প্রাপ্তি ছিল ২৩ উইকেট।
২০২২ সালের মার্চে ক্রিকেট বিশ্বকে স্তম্ভিত করে ৫২ বছর বয়সেই পরপারে পাড়ি জমান এই স্পিন কিংবদন্তি।
প্রায় দেড়শ বছরের টেস্ট ইতিহাসে ওয়ার্নের চেয়ে বেশি উইকেট আছে শুধু শ্রীলঙ্কান স্পিন গ্রেট মুত্তাইয়া মুরালিধারানের (৮০০)।
ওয়ার্নের মাইলফলক শিকার যারা
|
উইকেট নম্বর |
ব্যাটসম্যান |
ভেন্যু ও সাল |
|
১ |
রাভি শাস্ত্রি (ভারত) |
সিডনি, ১৯৯২ |
|
১০০ |
ব্রায়ান ম্যাকমিলান (দ.আফ্রিকা) |
অ্যাডিলেইড, ১৯৯৪ |
|
২০০ |
হাশান তিলাকারাত্নে (শ্রীলঙ্কা) |
পার্থ, ১৯৯৫ |
|
৩০০ |
জ্যাক ক্যালিস (দ.আফ্রিকা) |
সিডনি, ১৯৯৮ |
|
৪০০ |
অ্যালেক স্টুয়ার্ট (ইংল্যান্ড) |
ওভাল, ২০০১ |
|
৫০০ |
হাশান তিলাকারাত্নে (শ্রীলঙ্কা) |
গল, ২০০৪ |
|
৬০০ |
মার্কাস ট্রেসকোথিক (ইংল্যান্ড) |
ওল্ড ট্র্যাফোর্ড, ২০০৫ |
|
৭০০ |
অ্যান্ড্রু স্ট্রাউস (ইংল্যান্ড) |
মেলবোর্ন, ২০০৬ |