পেসারদের দাপটে প্রথম দিনে ১৪ উইকেট
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালের প্রথম দিনে কাগিসো রাবাদা, মার্কো ইয়ানসেনের আগুন ঝরা বোলিংয়ের পর দুর্দান্ত জবাব দিলেন মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্সও।
মেঘাচ্ছন্ন আকাশে টস জিতে টেম্বা বাভুমা বললেন, 'উইকেট ভালো হলেও কন্ডিশনের জন্য আমরা বোলিং করব।' অধিনায়কের সিদ্ধান্তের যথার্থতা প্রমাণ করে আগুন ঝরালেন কাগিসো রাবাদা ও মার্কো ইয়ানসেন। দুই পেসারের তোপে দুই সেশন পেরিয়েই গুটিয়ে গেল অস্ট্রেলিয়া।
তবে সেটি শুধুই দিনের অর্ধেক দৃশ্য। পরে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটসম্যানদের কঠিন পরীক্ষা নিলেন অস্ট্রেলিয়ার তিন পেসার মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স, জশ হেইজেলউড। দুই দলের পেসারদের তাণ্ডবে আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালের প্রথম দিনেই পড়ল ১৪ উইকেট।
লর্ডসে প্রায় ১১৩ বছর পর টেস্টে মুখোমুখি অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা। প্রথম দিনে সমানে সমান লড়াই করে দুই দল। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা ধরে রাখার অভিযানে বুধবার ২১২ রানে গুটিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। শেষ সেশনে ব্যাটিংয়ে নেমে মাত্র ৪৩ রানে ৪ উইকেট হারায় প্রোটিয়ারা।
১৬৯ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় দিনের খেলা শুরু করবে দীর্ঘদিন ধরে আইসিসি ট্রফি জেতার অপেক্ষায় থাকা দক্ষিণ আফ্রিকা।
প্রথম দিনের ১৪ উইকেটের ১২টিই নেন পেসাররা। বোলিং সহায়ক কন্ডিশনের সুবিধা কাজে লাগিয়ে ৫১ রানে ৫ উইকেট নেন রাবাদা। দীর্ঘদেহী বাঁহাতি পেসার ইয়ানসেনের শিকার ৩টি। আর নিজেদের মধ্যে ৪ উইকেট ভাগাভাগি করেন অস্ট্রেলিয়ার তিন পেসার।
ঐতিহাসিক লর্ডসে রাবাদার এটি দ্বিতীয় পাঁচ উইকেট। সব মিলিয়ে ক্যারিয়ারে ৩৩২ উইকেট নিয়ে অ্যালান ডোনাল্ডকে (৩৩০) ছাড়িয়ে যান ৩০ বছর বয়সী পেসার। দক্ষিণ আফ্রিকার বোলারদের মধ্যে তার সামনে আছেন আর তিন জন।
পেসারদের কঠিন চ্যালেঞ্জ সামলে চমৎকার ব্যাটিংয়ে পঞ্চাশছোঁয়া ইনিংস খেলেন স্টিভেন স্মিথ ও বাউ ওয়েবস্টার। তবে দুজনের কেউই সম্ভাবনাময় ইনিংসকে তিন অঙ্কে নিতে পারেননি।
দিনের শুরু থেকেই দারুণ লাইন-লেংথে উসমান খাওয়াজা ও মার্নাস লাবুশেনের রানের পথ বন্ধ করে দেন রাবাদা ও ইয়ানসেন। কোনোভাবেই রানের খাতা খুলতে পারেননি খাওয়াজা। সপ্তম ওভারে রাবাদার বলে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে থামে বাঁহাতি ওপেনারের অস্বস্তিময় ইনিংস।
২০ বল খেলেও কোনো রান করতে পারেননি খাওয়াজা। অস্ট্রেলিয়ার ওপেনারদের মধ্যে এর চেয়ে বেশি বল খেলে শূন্য রানে আউট হওয়ার বিব্রতকর নজির আছে আর মাত্র দুজনের- ডেভিড ওয়ার্নার (২২) ও শন মার্শ (২০)।
২৯ ম্যাচের টেস্ট ক্যারিয়ারে প্রথমবার তিন নম্বরে নেমে সুবিধা করতে পারেননি ক্যামেরন গ্রিন। মাত্র ৪ রান করে আউট হন তিনি।
এরপর প্রতিরোধের চেষ্টা করেন স্মিথ ও লাবুশেন। তৃতীয় উইকেট জুটিতে আসে ৩০ রান।
৫৮ টেস্টে প্রথমবার ওপেনিংয়ে নেমে শুরু থেকেই অতি সাবধানী ব্যাটিং করতে থাকেন লাবুশেন। সুফল তিনি খুব একটা পাননি। ইয়ানসেনের অফ স্টাম্পের বাইরের বলে তিনি কট বিহাইন্ড হন ৫৬ বলে ১৭ রান করে।
খানিক পর তাদের বিপদ আরও বাড়তে পারত। স্মিথের বিপক্ষে এলবিডব্লিউর জোরাল আবেদনে সাড়া না পেয়ে রিভিউ নেন বাভুমা। অল্পের জন্য 'আম্পায়ার্স কলে বেঁচে যান অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান।
তবে মধ্যাহ্ন বিরতির ঠিক আগের ওভারে বিপদ ঠিকই বাড়ান ট্রাভিস হেড। ইয়ানসেনের লেগ স্টাম্পের বাইরের বল খেলার চেষ্টায় কট বিহাইন্ড হন গত আসরের ফাইনালে দুর্দান্ত সেঞ্চুরি আগ্রাসী বাঁহাতি ব্যাটসম্যান।
প্রথম সেশনে ৪ উইকেট হারিয়ে দিশেহারা অস্ট্রেলিয়ার হাল ধরেন স্মিথ ও ওয়েবস্টার। মধ্যাহ্ন বিরতির পর পাল্টা আক্রমণের পথে হাঁটেন দুজন। দ্বিতীয় সেশনে ওভারপ্রতি সাড়ে ৪ রানের বেশি করে রান নেন তারা।
শুরুতে অবশ্য বেশ কয়েকবার সুযোগ দিয়েও বেঁচে যান ওয়েবস্টার। রাবাদার বলে রিভিউ না নিয়ে তার কাজ সহজ করে দেয় দক্ষিণ আফ্রিকাও। তখন মাত্র ৮ রানে ছিলেন ওয়েবস্টার। এর আগে রিভিউ নিলেও 'আম্পায়ার্স কলের' কারণে সাফল্য পায়নি প্রোটিয়ারা।
কঠিন ওই সময়টুকু কাটিয়ে দারুণ জুটি গড়েন দুই ব্যাটসম্যান। অফ স্টাম্পের বাইরে জায়গা পেলেই বাউন্ডারি আদায় করে নিতে ভুল করেননি স্মিথ। চমৎকার ব্যাটিংয়ে ৯ চারে ৭৬ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান।
লর্ডসে এটি তার ১৮তম পঞ্চাশ। ঐতিহাসিক মাঠে সফরকারী কোনো ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ ফিফটির রেকর্ড এটি। স্বদেশি কিংবদন্তি ডন ব্র্যাডম্যান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভিভ রিচার্ডসকে টপকে যান তিনি।
কিছুক্ষণ পর লর্ডসের মাঠে সফরকারী ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডও নিজের করে নেন স্মিথ। ৫৭৫ রান নিয়ে এত দিন সবার ওপরে ছিলেন তারই স্বদেশি ওয়ারেন বার্ডসলি। ছয় টেস্টে ১০ ইনিংসে ৫৯.১০ গড়ে ৫৯১ রান নিয়ে এখন চূড়ায় স্মিথ।
কীর্তিময় ইনিংসটি বেশি দূর টেনে নিতে পারেননি ৩৬ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান। জুটি ভাঙার আশায় ৪২তম ওভারে এইডেন মার্করামকে বোলিংয়ে আনেন বাভুমা। শেষ বলে ড্রাইভ খেলতে গিয়ে স্লিপে ক্যাচ দেন স্মিথ। তিনবারের চেষ্টায় বল তালুবন্দী করেন ইয়ানসেন।
১১২ বলে ৬৬ রানের ইনিংসে ১০টি চার মারেন স্মিথ। তার বিদায়ে ৭৯ রানের পঞ্চম উইকেট জুটি।
স্মিথ ফেরার কিছুক্ষণ পর ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ফিফটি করেন ওয়েবস্টার। চা বিরতির আগে আর উইকেট হারায়নি অস্ট্রেলিয়া।
তবে শেষ সেশনে ফিরে একদমই লড়াই করতে পারেনি তারা। মাত্র ৫.৪ ওভারের মধ্যে ২২ রানে বাকি ৫ উইকেট তুলে নেন রাবাদা, ইয়ানসেনরা। শুরুটা অবশ্য করেন কেশাভ মহারাজ। রিভার্স সুইপ খেলার চেষ্টায় বোল্ড হন অ্যালেক্স কেয়ারি।
এরপর দুই পেসারকে আর জবাব দিতে পারেননি লেজের সারির ব্যাটসম্যানরা। রাবাদার ব্যাক অব লেংথে করা ডেলিভারিতে স্লিপে ধরা পড়েন ইনিংসের সর্বোচ্চ ৭২ রান করা ওয়েবস্টার। ৯২ বলে ১১টি চার মারেন তিনি।
পরে মিচেল স্টার্ককে বোল্ড করে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস গুটিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি নিজের ৫ উইকেট পূর্ণ করেন রাবাদা।
অস্ট্রেলিয়াকে দুইশর আশপাশে অলআউট করার আনন্দ অবশ্য বেশিক্ষণ টেকেনি দক্ষিণ আফ্রিকার। প্রথম ওভারেই মার্করামকে বোল্ড করেন স্টার্ক। রানের খাতা খুলতে পারেননি অভিজ্ঞ ওপেনার।
নবম ওভারে স্টার্কের বলে স্লিপে ক্যাচ দেন রায়ান রিকেলটন। ৩ চারে ১৬ রান করেন বাঁহাতি ওপেনার। প্রথম দিনে আর কোনো প্রোটিয়া ব্যাটসম্যান দুই অঙ্ক ছুঁতে পারেননি।
ক্যারিয়ারে প্রথমবার তিন নম্বরে নেমে কিছুক্ষণ উইকেট আঁকড়ে রাখেন ভিয়ান মুল্ডার। পরে চমৎকার ডেলিভারিতে তাকে বোল্ড করেন কামিন্স। ৬ রান করতে প্রোটিয়া অলরাউন্ডার খেলেন ৪৪ বল।
বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি ট্রিস্টান স্টাবস। হেইজেলউডের ভেতরে ঢোকা লেংথ ডেলিভারির জবাব দিতে ব্যর্থ হন তিনি।
বাকি সময়ে আর উইকেট পড়তে দেননি বাভুমা ও ডেভিড বেডিংহ্যাম।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
অস্ট্রেলিয়া ১ম ইনিংস: ৫৬.৪ ওভারে ২১২ (খাওয়াজা ০, লাবুশেন ১৭, গ্রিন ৪, স্মিথ ৬৬, গেড ১১, ওয়েবস্টার ৭২, কেয়ারি ২৩, কামিন্স ১, স্টার্ক ১, লায়ন ০, হেইজেলউড ০*; রাবাদা ১৫.৪-৫-৫১-৫, ইয়ানসেন ১৪-৫-৪৯-৩, এনগিডি ৮-০-৪৫-০, মুল্ডার ১১-৩-৩৬-০, মহারাজ ৬-০-১৯-১, মার্করাম ২-০-৫-১)
দক্ষিণ আফ্রিকা ১ম ইনিংস: ২২ ওভারে ৪৩/৪ (মার্করাম ০, রিকেলটন ১৬, মুল্ডার ৬, বাভুমা ৩, স্টাবস ২, বেডিংহ্যাম ৮; স্টার্ক ৭-৩-১০-২, হেইজেলউড ৭-৩-১০-১, কামিন্স ৭-৩-১৪-১, লায়ন ১-০-১-০)
