ইয়র্কার না করেও শেষ ওভারের জাদুর গল্প শোনালেন হেনরি
ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টের শিরোপা জয়ের জন্য শেষ ওভারে ৬ উইকেট নিয়ে স্রেফ ৭ রান লাগত দক্ষিণ আফ্রিকার, কিন্তু অসাধারণ বোলিংয়ে নিউ জিল্যান্ডকে জেতান ম্যাট হেনরি।
শেষের দিকের কঠিন সমীকরণে বরাবরই পেসারদের ভরসার অস্ত্র ইয়র্কার। ঠিকঠাক ইয়র্কার করতে পারলে আর চিন্তা থাকে না খুব একটা। বিশেষ করে, বাঁচানোর মতো রান যখন খুবই কম, ইয়র্কার হয়ে ওঠে অনেকটাই একমাত্র উপায়। অথচ সেই চেষ্টা না করেই নিউ জিল্যান্ডকে স্মরণীয় এক জয় এনে দিয়েছেন ম্যাট হেনরি। ত্রিদেশীয় সিরিজে শেষ ওভারের জাদুকরী পারফরম্যান্সে শিরোপা জয়ের কিউই নায়ক ম্যাচের পর শোনালেন সেই গল্প।
শেষ ওভারটি করার জন্য যখন হেনরির মুঠোয় ছিল বল, ম্যাচ তখন এরকম দক্ষিণ আফ্রিকার মুঠোয়। নিউ জিল্যান্ডের প্রয়োজন ছিল অভাবনীয় কিছু। হেনরি করে দেখান সেটিই। শিরোপার সুবাস পাওয়া প্রোটিয়াদের হতাশ করেন তিনি দারুণ বোলিংয়ে। কিন্তু নাটকীয় সেই শেষ ওভারে অভিজ্ঞ পেসার ইয়র্কার করেননি একটিও।
হারারেতে শনিবার জয়ের জন্য শেষ ওভারে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রয়োজন ছিল কেবল ৭ রান। উইকেট ছিল ৬টি। ১৪ বলে ৩১ রান করে তখন ভয়ঙ্কর চেহারায় ডেওয়াল্ড ব্রেভিস। অন্য প্রান্তে জর্জ লিন্ডার হাতেও আছে শট।
শেষ ওভারের প্রথম বলটি ম্যাট হেনরি করেন হার্ড লেংথে। ব্রেভিস র্যাম্পের মতো খেলার চেষ্টায় ব্যাটে-বলে করতে পারেননি। পরের বলটি আবার লেংথ ডেলিভারি, চেনা ঢঙয়ে উড়িয়ে মারেন ব্রেভিস। শুরুতে মনে হচ্ছিল, ছক্কা হয়েই যাবে। তবে টাইমিং অতটা নিখুঁত ছিল না। মিড উইকেট সীমানায় ঠাণ্ডা মাথায় কঠিন ক্যাচ সহজ বানিয়ে দুবারের চেষ্টায় মুঠোয় জমান মাইকেল ব্রেসওয়েল।
পরের বল আবার ছিল লেংথ ডেলিভারি। নতুন ব্যাটসম্যান কর্বিন বশ উড়িয়ে মারেন সেই একই জায়গা দিয়ে। এবার ব্রেসওয়েল সামনে ঝাঁপিয়েও কঠিন ক্যাচটি নিতে পারেননি। প্রোটিয়ারা পায় দুই রান।
চতুর্থ বলটিই ছিল কেবল একটু ফুল লেংথ ধরনের। স্কয়ার লেগে পাঠিয়ে দুই রান নিতে পারতেন বশ। কিন্তু লিন্ডা পিছলে পড়ায় এক রানেই থামতে হয়।
পঞ্চম বলটি আবারও লেংথ বল অপ স্টাম্পের বাইরে। লিন্ডা এবার মিড উইকেটে না খেলে উড়িয়ে মারেন সোজা। এবার মনে হচ্ছিল, চার হয়ে যাবে। কিন্তু চোখের পলকে অনেকটা ছুটে এসে ডান দিকে ডাইভ দিয়ে অসাধারণ এক ক্যাচে পরিণত করেন ড্যারিল মিচেল।
শেষ বলে লাগত চার রান। এবারও ইয়র্কারের পথ বেছে নেননি হেনরি। বরং করেন স্লোয়ার লেংথ বল। বাঁহাতি সেনুরান মুথুসামি ব্যাটে-বলেই করতে পারেননি। ৩ রানের রুদ্বশ্বাস জয়ে শিরোপার উল্লাসে ভাসে কিউইরা।
ম্যাচ-সেরা হেনরি পরে সংবাদ সম্মেলনে বললেন, রান কম ছিল বলেই ইয়র্কার না করে আরও বড় ঝুঁকির পথ বেছে নিয়েছেন তিনি।
“ভাবনাটা ছিল ব্যাটসম্যানদের কাজ কঠিন করে তোলা নিশ্চিত করা। শুরুতেই ইয়র্কারের চেষ্টা করে যদি দুটো রান হয়ে যেত, তাহলে ছয় বল পার করা কঠিন হতো। আমরা চেষ্টা করেছি ইতিবাচক থাকতে এবং শেষ দিকে একটা পর্যায়ের ঝুঁকি নিতে। যেটা সবসময় কাজে আসে না, তবে এ দিন ভালো গেছে।”
“খুব বেশি রান ছিল না আমাদের বাঁচানোর। এতে একটা ব্যাপার ভালো হয়েছে যে, পরিষ্কার হয়ে গেছে ঝুঁকি নিতেই হতো আমাদের। হয় ডট বল অথবা উইকেট, এটা ছাড়া উপায় ছিল না। এরপর ব্যাপারটি ছিল, স্বচ্ছ ভাবনা নিয়ে খোলা মনে বোলিং মার্কের মাথায় দাঁড়ানো এবং যা করতে চাই, তা বাস্তবায়ন করা। সৌভাগ্যবশত আজকে তা পেরেছি ভালোভাবে এবং ক্যাচগুলোও আটকে গেছে, যা ছিল দারুণ।”
শেষ ওভারের সাফল্যে নিউ জিল্যান্ডের ফিল্ডিংয়ের কৃতিত্বও যে অনেক, সেটা বললেন হেনরিও। ব্রেসওয়েলের ওপর ভরসা ছিল তার। অভিভূত তিনি মিচেলের ক্যাচে।
“স্রেফ আশা করছিলাম, সে (ব্রেসওয়েল) যেন ক্যাচটা নিতে পারে। সত্যিই খুব ভালো ক্যাচ ছিল। সীমানায় যখন ব্রেসওয়েল থাকে, সেরা ফিল্ডারদের একজন সে, কাজেই বিশ্বাস ছিলই তার ওপর। স্রেফ ভাবছিলাম, নিজের কাজটা সে করতে পারলেই হয়।”
“এই ছেলেরা, যত ক্যাচ ছাড়ে, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্যাচ নেয়। কাজেই আমার দুর্ভাবনা হয়নি (পরের ক্যাচটি পড়া নিয়ে)। আমার মনোযোগ ছিল নিজের কাজে। পরেরটিও খুব কঠিন ক্যাচ ছিল এবং খুব বেশি লোকে সেটাকে সুযোগ পরিণত করতে পারত না। সে (মিচেল) অবিশ্বাস্য এক ফিল্ডার।”
১০ উইকেট নিয়ে ম্যান অব দা টুর্নামেন্টও হয়েছেন হেনরি। গ্রুপ পর্বের চার ম্যাচ জয়ের পর ফাইনাল জিতে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে নিউ জিল্যান্ড। নতুন কোচ রব ওয়াল্টার সাফল্যের স্বাদ পেয়েছেন প্রথম আসরেই, কদিন আগেও যিনি ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার কোচ।
