Published : 19 Jun 2026, 07:29 PM
“ব্যাট হাতে আপনি দারুণ ইনিংস খেলেছেন। কিন্তু বেশি চমকপ্রদ ব্যাপার হলো আপনার বোলিং। রহস্যটা কি এই বোলিংয়ের…?” সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নটি শেষ হওয়ার আগে ম্যাট রেনশর মুখে ফুটে উঠল চওড়া হাসি। বলার অপেক্ষা রাখে না, তিনি নিজেও বেশ মজা পাচ্ছেন!
তাকে বল হাতে দেখলে অনেকের মনে প্রশ্নটি জাগার কথা, ‘রেনশ বোলিংও করেন!’ এই বাংলাদেশ সফরের আগ পর্যন্ত তার পরিচয় ছিল কেবলই ব্যাটসম্যান। অথচ এখানে এসে তিনি হয়ে গেছেন পুরোদস্তুর অলরাউন্ডার। তার নীরিহ-দর্শন অফ স্পিনে বারবার খাবি খাচ্ছে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। তিনি নিজেও ব্যাপারটি দারুণ উপভোগ করছেন। হাসতে হাসতেই বললেন, বোলিংটা করেন তিনি কেবল ভালোবাসার জায়গা থেকে।
তার সেই ভালোবাসা বাংলাদেশের জন্য হয়ে উঠেছে পথের কাঁটা। এই সফরে এখনও পর্যন্ত তিনি নিয়েছেন ৮ উইকেট!
বোলিং যে তিনি আগে একদমই করতেন না, তা অবশ্য হয়। তবে ‘অনিয়মিত বোলার’ ক্যাটেগরিতেও তাকে ঠিক রাখা যায় না। হাত ঘোরাতেন যে কালেভদ্রে!
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ২০টি উইকেট তার আছে। তবে ম্যাচ খেলেছেন ১৩৩টি। এটিই বলে দিচ্ছে, বোলার হিসেবে তিনি কোন শ্রেণির। ১৪টি টেস্ট খেলেছেন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে, বোলিং করেছেন মোটে চার ওভার। সাদা বলের ক্রিকেটে দেশের এক মাস আগে পর্যন্তও বোলিং করেন এক ওভারও।
এই বাংলাদেশ সফরের আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে তাকে দেখা গেছে হাত ঘোরাতে। শেষ ম্যাচে তিন ওভার বোলিং করে একটি উইকেটও নিয়েছেন। তখনও তাকে ‘পার্ট টাইমার’ বলা যেত। কিন্তু বাংলাদেশে এসে তিনি হয়ে উঠেছেন পুরোদস্তুর অলরাউন্ডার!
শুধু উইকেটই যে নিচ্ছেন, তা-ই নয়। গুরুত্বপূর্ণ ব্রেক থ্রু দিচ্ছেন, বোলিংয়ে আসার পরপরই উইকেট এনে দিচ্ছেন দলকে।
প্রথম ওয়ানডেতে নিজের দ্বিতীয় ওভারেই দারুণ এক ফিরতি ক্যাচে বিদায় করেন লিটন কুমার দাসকে। পরে আউট করেন ৬৭ রান করা নাজমুল হোসেন শান্তকে।
পরের ম্যাচেও তিনি উইকেট পেয়ে যান দ্বিতীয় ওভারে। সৌম্য সরকারকে আউট করে ভেঙে দেন ৮৬ রানের জুটি।
শেষ ওয়ানডেতে তো উইকেটের দেখা পেয়ে যান প্রথম ওভারেই। বিদায় করেন তানজিদ হাসানকে। একটু পর তার শিকার হন শান্ত।
এরপর সংস্করণ বদলে গেল, ভেন্যু ঢাকা থেকে চলে এলো চট্টগ্রামে। কিন্তু ব্যাটসম্যান রেনশর বোলিং যাত্রা ছুটতেই থাকল। প্রথম টি-টোয়েন্টিতে দলকে উইকেট এনে দিলেন নিজের প্রথম ওভারেই। এবার তার শিকার সাইফ হাসান। পরে দারুণ ডেলিভারিতে আউট করলেন শামীম হোসেনকেও।
আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে আগে কখনও বোলিং না করা ক্রিকেটার প্রথমবার বল হাতে নিয়েই ২ উইকেট!
সেই ধারা ধরে রাখলেন শুক্রবার দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতেও। তানজিদ ও সাইফের ব্যাাটে যখন উড়ন্ত সূচনা করেছে বাংলাদেশ, রেনশ এসেই প্রথম ওভারে দলকে এনে দিলেন স্বস্তির উইকেট। বড় রান তাড়ার ম্যাচে ২ ওভারে রান দিলেন মাত্র ১৩।

ব্যাট হাতে ৫২ বলে ৮৯ রানের ক্যারিয়ার সেরা ইনিংসের পর বোলিংয়ে ওই পারফরম্যান্সে অস্ট্রেলিয়ার সিরিজ জয়ের ম্যাচে তিনিই ম্যান অব দা ম্যাচ।
ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে প্রথমেই প্রশ্ন হলো তার বোলিং নিয়ে। নিজেকেও কি চমকে দিয়েছেন এমন বোলিংয়ে? বাংলাদেশকে একটু খোঁচা দিয়ে তিনি শোনালেন তার বোলিং দর্শনের কথা।
“আমার বোলিং এমনিতে খুব একটা ভালো নয়। বাংলাদেশের একজন খেলোয়াড়ের কাছ থেকে এ ব্যাপারে খানিকটা তথ্য পেয়েছিলাম! আমি নিজের বোলিংকে এমন কাজ হিসেবে দেখি, যা করতে আমি ভালোবাসি। বল হাতে চেষ্টা করি ব্যাটিংয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে। প্রত্যেকটা বলে ব্যাটসম্যান কী করার চেষ্টা করছে, তা বোঝার চেষ্টা করি।”
“জানি যে, হয়তো প্রত্যেকটা বল আমার ইচ্ছামতো জায়গায় রাখতে পারব না, তাই ফিল্ডিং সাজিয়ে যেখানে পারি মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি এবং দলের জন্য যা কিছু করা সম্ভব, তা করি। সৌভাগ্যবশত এই সফরে আমি কিছু উইকেট পেয়েছি। বেশ ভালো লাগছে।”
বাংলাদেশের কোনো ক্রিকেটার তার বোলিং নিয়ে মাঠে কিছু বলেছেন কি না, বলা কঠিন। তবে প্রথম টি-টোয়েন্টির পর সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের বোলিং কোচ তালহা জোবায়ের বেশ আক্ষেপ করেছিলেন রেনশকে এত উইকেট দেওয়ায়।
বোলার হিসেবে এখন যেমন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন তিনি, তার আন্তজার্তিক ক্যারিয়ারও এখন আছে নতুন মোড়ে। ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি ছিলেন ধীরস্থির ও ঠাণ্ডা মাথার একজন টেস্ট ওপেনার। ২০১৬ সালে এই ভূমিকাতেই তার টেস্ট অভিষেক। দ্বিতীয় টেস্টে খেলেন ৭১ রানের ইনিংস, পরের টেস্টে ১৮৪। কিন্তু সেই ধারা ধরে রাখতে না পেরে জায়গা হারান দলে।
পরে আরও বার-দুয়েক টেস্ট দলে আসা যাওয়া করেছেন। তবে গত কয়েক বছরে ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজেকে বলে ফেলেছে তিনি। বদলে গেছে তার ব্যাটিং ও ভূমিকা। সেই পথ ধরেই সীমিত ওভারের দুই সংস্করণে জাতীয় দলে ফিরেছে মিডল অর্ডার হিসেবে। এখন তো অলরাউন্ডারই হয়ে উঠছেন।
৩০ বছর বয়সী ক্রিকেটার নিজেও দারুণ উপভোগ করছেন তার ক্যারিয়ারের এই অধ্যায়।
“বিভিন্ন সংস্করণে আমার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার স্পষ্টতই কিছুটা অদ্ভুত। কিন্তু আমি মনে করি, নিজের ভেতর স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারাটাই আসল। টুকটাক বোলিং আমি সবসময়ই করেছি। যখন ব্যাটিং করছি না, তখন কিছুটা বোলিং তো করতেই হয়। কিন্তু ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে, আজকের ইনিংসটা আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বিশেষ করে টানা কয়েকটি কম স্কোরের পর।”
“২০ রানও করতে পারতাম, কিন্তু আজকে শুরুটা যেভাবে হয়েছে, তা আমার ক্যারিয়ারের সেরা শুরুগুলোর মধ্যে থাকবে। এটা নিয়ে আমি সত্যিই খুব রোমাঞ্চিত ছিলাম, এবং এরপর আমি যে স্কোরটা করেছি এবং দলকে একটা ভালো জয়ের জন্য প্রস্তুত করে দিয়েছি, তা এই সংস্করণে সত্যিই দারুণ ছিল। কারণ দলে আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকলে নিজের মধ্যে একটা সংশয় তৈরি হয়। তাই এটা উপলব্ধি করতে পেরে ভালো লাগছে, আমি এই সংস্করণে যথেষ্ট ভালো।”