১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

অভিষেকের ২১ বছর পর টেইলরের নতুন অভিষেকের রোমাঞ্চ

ড্রাগ ও অ্যালকোহলের আসক্তি কাটিয়ে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পেয়ে চার বছর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার অবিশ্বাস্য গল্প লিখে রোমাঞ্চিত ব্রেন্ডান টেইলর।

স্পোর্টস ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 08 Aug 2025, 10:17 AM

Updated : 26 Aug 2026, 01:32 PM

নিউ জিল্যান্ডের একাদশে অভিষিক্ত ক্রিকেটার তিনজন, জিম্বাবুয়ের নেই কেউ। তবে একজন আছেন, যার কাছে ম্যাচটি অভিষেকের মতোই। ১৮ বছর বয়সে যে রোমাঞ্চে বুঁদ হয়ে মাথায় পরেছিলেন টেস্ট ক্যাপ, একই ভালো লাগাকে সঙ্গী করে সেই ক্যাপের শিহরণ আবার অনুভব করলেন তিনি এই ৩৯ বছর বয়সে। জীবনের কালো অধ্যায় পেরিয়ে আলোয় অবগাহনের আনন্দকে সঙ্গী করে টেস্ট ক্রিকেটে ফিরলেন ব্রেন্ডান টেইলর।

ড্রাগ ও অ্যালকোহলের আসক্তি থেকে মুক্তি পেয়ে, আইসিসির সাড়ে তিন বছরের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখলেন টেইলর। নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে বুলাওয়ায়ো টেস্ট দিয়ে বৃহস্পতিবার ফিরলেন তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে।

ফিরেই একটি অর্জন তার সঙ্গী হলো। বর্তমানে সক্রিয় ক্রিকেটারদের মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার এখন তিনিই। সেই ২০০৪ সালের এপ্রিলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে দিয়ে তার অভিষেক। টেস্ট ক্রিকেটে পা রাখেন পরের মাসেই।

এরপর জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটের অনেক উত্থান-পতনের সঙ্গী তিনি। দ্রুতই দলের ব্যাটিং স্তম্ভ হয়ে উঠেছেন, এক সময় দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অনেক সাফল্য এসেছে তার হাত ধরে, ব্যর্থতাও কম ছিল না। ক্রমে হয়ে ওঠেন দেশের ইতিহাসের সফলতম ব্যাটসম্যানদের একজন। অ্যান্ডি ও গ্রান্ট ফ্লাওয়ার ছাড়া জিম্বাবুয়ের আর কোনো ব্যাটসম্যানের রান তার চেয়ে বেশি নয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে।

কিন্তু এক জীবনের সব অর্জন কালিমায় ঢেকে গিয়েছিল তার মাঠের বাইরের কাণ্ডে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে অনেকটা হুট করেই অবসরের ঘোষণা দেন তিনি। কয়েক দিন পর জানান, তিনি ডুবে গেছেন ড্রাগ ও অ্যালকোহলের আসক্তিতে। জুয়াড়িদের ফাঁদে পা দিয়ে প্রস্তাব পেয়েছিলেন ফিক্সিংয়ের। সময়মতো সেটি আইসিসিকে না জানিয়ে নিষিদ্ধ হন সাড়ে তিন বছরের জন্য।

সেই সময়টায় ক্রিকেটের অস্তিত্বই ছিল না তার জীবনে। বেঁচে থাকাই ছিল নিয়ত এক যুদ্ধ। জীবনের আনন্দই হারিয়ে ফেলেছিলেন। কঠিন এক লড়াইয়ের পর আবার ফিরেছেন তিনি স্বাভাবিক জীবনে। 

নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষে ফিরলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও। বুলাওয়ায়ো টেস্ট শুরুর আগে টিভি সাক্ষাৎকারে তার কণ্ঠে ফুটে উঠল ফেরার রোমাঞ্চ। 

“আমার জন্য এটি ছিল সব পাওয়ার মুহূর্ত। এভাবে দুহাত বাড়িয়ে আমাকে আলিঙ্গন করে নেওয়া আমার জন্য নিখাদ কৃতজ্ঞতা ও সত্যিকারের আবেগের ব্যাপার। এতটা প্রত্যাশা আমার ছিল না। অবশ্যই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও অনুভবের মুহূর্ত এটি।”

ফেরার দিনটিতে সেই পুরোনো ঝলক কিছুটা দেখিয়ে ৬ চারে ৪৪ রানের ইনিংস তিনি খেলেছেন, ব্যাটিং বিপর্যয়ের দিনে সেটিই ছিল দলের সর্বোচ্চ রান। তবে জীবনের নতুন অধ্যায়ে পারফর্ম করতে না পারলেও তার আক্ষেপ কিছু নেই, স্রেফ ফিরতে পারাতেই জীবনের জয়গান তার কণ্ঠে। 

“জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট যে পরিমাণ ক্রিকেটের ব্যবস্থা রেখেছে, সেসব ফলপ্রসূ হতে দেখাটাও দারুণ। এই পর্যায়ে আসতে আমি জীবনের যে কোনো সময়ের চেয়ে কঠিন ট্রেনিং করেছি। পারফরম্যান্স হলে তো দুর্দান্ত। কিন্তু যদি পারফর্ম করতে নাও পারি, আমার জন্য স্রেফ খেলতে পারাতেই বৃহত্তর ছবিটা মিশে আছে। আবার খেলতে পারা বড় সম্মানে, অভিষেকের মতো অনুভূতি হচ্ছে।”

২০২১ সালে আইসিসির নিষেধাজ্ঞার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার আগেই একটি পুনবার্সন কেন্দ্রে ভর্তি হন তিনি। সেখানে ১২ ধাপের পুনবার্সন প্রক্রিয়া শেষে ড্রাগ আর অ্যালকোহল আসক্তি কাটিয়ে ওঠেন। এরপর ফিরে আসেন পরিবারের সংস্পর্শে। ক্রিকেটে ফেরার পথও খুঁজতে থাকেন। 

নিষেধাজ্ঞার কারণে জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটের কোনো সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করার নিয়ম তার ছিল না। গত দেড় বছরে ঘাম ঝরান তিনি হারারের একটি স্কুলে। ২০ কেজির বেশি ওজন কমিয়ে ব্যাটিং-কিপিং ঝালিয়ে নিজেকে আবার তৈরি করেন জাতীয় দলে ফেরার জন্য। 

যে অবস্থা থেকে তিনি ফিরে এসেছেন, পেছনে তাকিয়ে শিউরে ওঠেন নিজেও।

“তিন বছর আগে আমার বিছানা থেকে নামার অবস্থা ছিল না, আর এখন আমি জিম্বাবুয়ের প্রতিনিধিত্ব করছি, যেটা করতে সবচেয়ে ভালোবাসি। শাস্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, নিজের ভেতরে এলোমেলো অবস্থা সামলানো… স্রেফ কোনো একটি দিনের ব্যাপার নয়, অনেক দিনের ট্রমা সেসব।”

“গভীর অন্ধকারের অতলে ডুবে ছিলাম এবং চেষ্টা করছিলাম জীবনের মনোবল পুরোপুরি হারিয়ে ফেলার ধারণাতীত অবস্থা কাটিয়ে ওঠার। অসহ্যরকমের কঠিন ছিল তা।”

টেইলর যখন তার ড্রাগ ও অ্যালকোহল আসক্তির কথা খোলাসা করেন গোটা দুনিয়ার সামনে, তার স্ত্রী কেলির জন্য সেটি আসে বড় বিস্ময় ও ধাক্কা হয়ে। তার কাছে সবকিছুই লুকিয়ে রেখেছিলেন টেইলর। কিছুদিন আগে একটি সাক্ষাৎকারে এই ক্রিকেটার বলেছেন, অনেকটা দ্বৈত জীবন কাটাতেন তিনি। তার স্ত্রীর তাই ধারণার বাইরে ছিল এসব। এমনকি যখন তিনি পুনর্বাসন কেন্দ্রে যান, তখনও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না স্ত্রী কেলি। 

তবে সেই দুঃসহ সময়ে স্ত্রীসহ পরিবারের সবাইকে পাশে পেয়েছিলেন টেইলর। তাদের প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার শেষ নেই তার।  

“পরিবারকে হতাশ করার লজ্জা ও অপরাধবোধ তো সবসময়ই সঙ্গী। এটার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ভয়ঙ্কর কঠিন। তবে আমার পরিবার যেভাবে আগলে রেখেছে ও পাশে থেকেছে, তাতে আমি অভিভূত। অনেকটা আক্ষেপই হয়, কেন তাদের ওপর আরও আগে ভরসা রাখিনি।”

“আমার মনে হয়েছিল, আমিই নিজেকে এই অবস্থায় ফেলেছি এবং আমাকেই তা ঠিক করতে হবে। মনে হয়েছিল, যাবতীয় নাটকীয়তা শেষ এবং আমি তখন স্থিতধী ছিলাম। এরপর সেরে ওঠার আনন্দ ও প্রতিজ্ঞা ফিরে পাই, যা আমার হৃদয়ের খুব কাছে। জীবনটাকে পথে ফেরাতে পেরেছি বলেই আজকে এখানে আসতে পেরেছি। জীবন বদলে দেওয়ার সেই সিদ্ধান্তটি না নিলে এসব কিছুই সম্ভব হতো না।”

পুনবার্সন কেন্দ্র থেকে ফেরার পর ক্রিকেট খেলার ভাবনা টেইলরের ছিলই না। তিনি চেয়েছিলেন কোচিং শুরু করতে। জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের কর্তারা চাইছিলেন সেই ক্রিকেটার টেইলরকেই ফিরে পেতে। ২০২৭ সালে দেশের মাঠে বিশ্বকাপে চোখ রেখে তাকে আবার ক্রিকেটার হিসেবে তৈরি হতেই প্রেরণা জোগান বোর্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গিভমোর মাকোনি। 

বোর্ডকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার কথাও বললেন টেইলর। 

“খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু মানুষকে পেয়েছি, যারা আমাকে জীবনের নতুন পথ দেখিয়েছে এবং তাদের প্রতি আমি আজীবনের জন্য কৃতজ্ঞ। জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের কিছু মানুষকেও ধন্যবাদ দিতে হবে, বিশেষ করে চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে, যারা আমার ফেরার পথে পাশে থেকে দারুণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছন।”