২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

চাপে খেই হারানো রোগের দাওয়াই কী

পরিস্থিতি প্রতিকূল বা চ্যালেঞ্জিং হলেই বারবার মুখ থুবড়ে পড়ে বাংলাদেশ দল।

ক্রীড়া প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 22 Oct 2025, 10:25 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:31 PM

জাতীয় ক্রিকেট লিগের আগে বিসিবির আম্পায়ার বিভাগের একটি কো-অর্ডিনেশন ওয়ার্কশপ চলছিল মিরপুরে। বুধবার সেই ওয়ার্কশপের ফাঁকে বিসিবির এলিট প্যানেল আম্পায়ার মাহফুজুর রহমান লিটু সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন আগের রাতে বাংলাদেশ দলের সুপার ওভার নিয়ে। তাদের আলোচনায় তখন উঠে আসে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মানসিক দৃঢ়তার ঘাটতি এবং টিম ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ।  

ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ও ফলাফল নিয়ে হতাশার স্রোত তো বয়েই চলেছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে সুপার ওভারে হেরে যাওয়া ম্যাচের পর বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মানসিক দৃঢ়তা, মাঠে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মাঠের বাইরে টিম ম্যানেজমেন্টের কৌশল নির্ধারণের পুরোনো প্রসঙ্গ উচ্চকিত হয়েছে আবার প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে, ১৪ বলে ৩৯ রানের ইনিংস খেলা রিশাদ হোসেনকে সুপার ওভারে না পাঠানোর সিদ্ধান্তে দেশের গোটা ক্রিকেট আঙিনাকে যেন কাঁপিয়ে দিয়েছে ভূমিকম্পের মতো। 

আলোচনা-সমালোচনা আরও উসকে দিয়েছেন বাংলাদেশ দলের সাবেক পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট মহসিন শেখ। অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী পাকিস্তানি বংশোদ্ভুত এই অ্যানালিস্ট সামাজিক মাধ্যমে কৌতুকপূর্ণ ভাষায় লিখেন, “যখন আপনি ড্রেসিং রুমে থাকেন না, তখন স্থানীয় খেলোয়াড়দের ‘কমন সেন্স’ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অন্যদিকে যখন আপনি দায়িত্বে থাকেন, তখন সেই ‘কমন সেন্স’ কোথায় যায়?” 

মহসিনের স্পষ্ট ইঙ্গিত বাংলাদেশ দলের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের দিকে। জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার আগে বিপিএলে কোচ থাকার সময় তিনি দেশের ক্রিকেটারদের ‘কমন সেন্স’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। বিপিএল বা ঘরোয়া অন্যান্য লিগে কোচের দায়িত্ব পালনের সময় তিনি নানা সময়েই দেশের ক্রিকেটারদের বোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু এবার রিশাদকে সুপার ওভারে না নামানোয় সালাউদ্দিনসহ টিম ম্যানেজমেন্টের বোধ নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। এমনকি ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনার আকিল হোসেন ম্যাচের শেষ বলেছেন, বাংলাদশ দলের এই সিদ্ধান্ত তাদেরকে অবাক করেছে।

দিনশেষে মূল দায় ক্রিকেটারদেরই। মাঠে তো খেলতে হয় তাদেরই। কেন তারা বারবার চাপের মধ্যে খেই হারান, কেন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মুখ থুবড়ে পড়েন বারবার, কিছুটা উত্তর পাওয়া গেল নাজমূল আবেদীনের কাছ থেকে, যিনি জাতীয় দলের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ক্রিকেটার পরিচালনা বিভাগের প্রধান। 

“ক্রিকেটে একটা সংস্কৃতি থাকে, যেখান থেকে মানসিক দৃঢ়তা বা দুর্বলতা তৈরি হয়। আমাদের দীর্ঘদিনের ক্রিকেট সংস্কৃতি মানসিকভাবে শক্ত ক্রিকেটার তৈরি করতে পারেনি। শুধু এটা ক্রিকেটারই নয়, প্রত্যেক পেশায়, প্রত্যেকটা জায়গায়। আমরা সহজেই সফলতা চাই, সাফল্য প্রত্যাশা করি।”

“আমাদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে পারফর্ম করতে হয়, সেই লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তো যায়নি আমাদের ছেলেমেয়েরা। যেভাবে ওরা বেড়ে উঠেছে… আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এসে ওরা এগুলো শিখছে। কিন্তু ওরা এসবের মধ্য দিয়ে যায়নি। এটাই হলো সবচেয়ে বড় বাধা।”

আগের নানা প্রজন্মের ক্রিকেটারদের সঙ্গে এই সময়ের ক্রিকেটারদের তাড়না ও আকাঙ্ক্ষার পার্থক্যও দেখেন নাজমূল।

“আমি যদি ৩০-৩৫ বছর আগের কথা বলি, আমি নিজেও সে সময়কার মানুষ… তখনকার একজন খেলোয়াড়ের মধ্যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল ভালো খেলার জন্য, হয়তো করতে পারেনি নানা কারণে, সেই সময় সুযোগ সুবিধা এতটা ছিল না। তাদের সেই পরিবেশ ছিল না। এখনকার ক্রিকেটারদের মধ্যে সেই ধরনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা কম। খুব সহজেই সবাই অর্জন করে, ফলে স্থানীয়ভাবে এটাই চায় বেশি। সেটার সঙ্গে তখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মধ্যে বড় রকমের পার্থক্য কিন্তু থেকেই যায়।”

“বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা যে সকল ক্রিকেট স্কুল (মাধ্যম) থেকে জাতীয় দলে এসেছে, তার মানটাও নাকি ভালো না।”

নাজমূল যে সময়ের কথা বললেন, সেই সময়ের ক্রিকেটারদের একজন হাবিবুল বাশার। তিনি অধিনায়ক থাকার সময় বাংলাদেশ দল লড়াই করার শুরুটা করেছে, নিয়মিত কিছু ম্যাচ জিততে শুরু করেছেন। সাবেক এই অধিনায়ক এখন বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগে হেড অফ অপারেশন্স। সুপার ওভার দেখে তারও পর্যবেক্ষণ, মানসিক ঘাটতির কারণেই পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশের এখনকার দল। 

‘‘চাপের মধ্যে খেলতে খেলতেই একজন ক্রিকেটার শেখে কীভাবে পরিস্থিতি সামলাতে হয়। কোচ কাউকে গাইড করতে পারে, কিন্তু এই মানসিক টাফনেস আলাদা করে শেখানো যায় না। এটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। ক্রিকেটে অনেক সময় এমন মুহূর্ত আসে, যেখানে নিজের ভেতরের শক্তিটাই বড় ভূমিকা রাখে। আমি মনে করি, এই জায়গাটায় এখনকার খেলোয়াড়দের দুর্বলতা আছে।”

“আগে আমাদের দলে কয়েকজন সিনিয়র ছিল সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, মুশফিকুর রহিম। ওদের মেন্টাল টাফনেস অসাধারণ ছিল। সাকিব তো একদম আলাদা ধরণের চরিত্র, ওর মেন্টাল টাফনেস নিয়ে প্রশ্নই আসে না। তামিমও অনেক সময় দলকে টেনে তুলেছে। তারা সবাই কঠিন ম্যাচে চাপ সামলে পারফর্ম করেছে। আবার কিছু ম্যাচে ব্যর্থও হয়েছে, কিন্তু লড়াইটা করেছে শেষ পর্যন্ত। চাপের মধ্যে টিকে থাকার মানসিকতা তাদের ছিল।”

সুপার ওভারে ব্যাট করা সৌম্য সরকার, নাজমুল হোসেন শান্ত, অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজসহ এখনকার দলের অনেকেই অনেক বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছেন। তবে হাবিবুলের মতে, স্রেফ অনেক বছর খেলার অভিজ্ঞতা থেকেই মানসিক শক্তি আসে না। 

‘‘এখন যারা দলে আছে, তাদের কেউ দশ বছর ধরে খেলছে, কেউ বারো বছর। কিন্তু ক্রিকেটে এটা সময়ের হিসাব নয়, চরিত্রের হিসাব। এই চরিত্রটা নিজের ভেতর থেকে আসে। সাহসটা থাকতে হয়। আত্মবিশ্বাসটা থাকতে হয়। আমার মনে হয়, এই সাহসের জায়গায় তাদের দুর্বলতা আছে, ঘাটতিও আছে।”

“মানসিকভাবে শক্ত থাকার ব্যাপারটি কোনো সেশনে বসে তৈরি হয় না। এসব তৈরি হয় মাঠে, চাপের মধ্যে, ভুল থেকে। কেউ যদি মনে করে কোচ শেখাবে কীভাবে মানসিকভাবে শক্ত হতে হয়, সেটা ভুল ধারণা। খেলোয়াড়কে নিজেই সেই শেখাটা নিতে হয়। ক্রিকেটারদের সামর্থ্য নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই। তারা ভালো খেলোয়াড়, কিন্তু মানসিকভাবে শক্ত হতে হবে। ম্যাচ যখন চাপের মধ্যে যায়, তখন শুধু স্কিল না—চরিত্রটাই পরীক্ষা দেয়। আমাদের এই জায়গাটায় কাজ করতে হবে, কারণ এখানেই এখন সবচেয়ে বড় ঘাটতি।’’