৯ বছর পর ভারতীয় ক্রিকেটারের আবেগময় বাড়ি ফেরা

ভারতীয় স্পিনার কুমার কার্তিকেয়ার জীবনের অবিশ্বাস্য গল্প।

স্পোর্টস ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 4 August 2022, 06:04 AM
Updated : 4 August 2022, 06:04 AM

বাড়ির সঙ্গে আড়ি চলছিল বছরের পর বছর ধরে। এমন নয় যে বাড়িতে যাওয়ার ফুরসত মেলেনি। কিন্তু বাবা যে বলে দিয়েছেন, একটা কিছু অর্জন করে তবেই বাড়ি ফিরতে! সেই অর্জন কী আর সহজে ধরা দেয়! ত্যাগ, শ্রম, যন্ত্রণা আর প্রতীক্ষার অনেক প্রহর পেরিয়ে অবশেষে সেই দিনটি এলো। কুমার কার্তিকেয়া সিং বাড়ি ফিরলেন, মায়ের আদরের স্পর্শ পেলেন ৯ বছর ৩ মাস পর!

ক্রীড়াবিদদের জীবনে ত্যাগ-তিতিক্ষা, নাটকীয়তার অনেক বিস্ময়কর গল্প থাকে। কিন্তু ভারতের এই স্পিনারের জীবনের গল্পের মতো চমকপ্রদ কিছু বুঝি কমই আছে।

বাড়ি ছেড়েছিলেন তিনি বড় ক্রিকেটার হওয়ার আশায়, ভারতীয় ক্রিকেটে ছাপ রাখার তাড়নায়। ক্রিকেটের কঠিন এই ভূবনে নিজের পায়ের নিচে জমিন খুঁজে পেতে তাকে পেরোতে হলো লড়াই-সংগ্রামের অনেক পথ। অবশেষে এবার মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে আইপিএল খেলে নজর কাড়লেন। এরপর রঞ্জি ট্রফিতে মধ্যপ্রদেশের ঐতিহাসিক শিরোপা জয়ে রাখলেন বড় অবদান। এরপর তার মনে হলো, অবশেষে মিশন সফল!

টুইটারে বুধবার মায়ের সঙ্গে ছবি দিয়ে ২৪ বছর বয়সী স্পিনার লিখেছেন, “আমার পরিবার ও মায়ের সঙ্গে দেখা হলো ৯ বছর ৩ মাস পর। অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।”

কেন এই প্রায় এক দশকের বিচ্ছেদ, সেই গল্প কার্তিকেয়া শোনালেন ভারতের একটি ক্রিকেট ওয়েবসাইটকে।

“বাড়িতে যাওয়ার সময়-সুযোগ হয়েছে বটে। তবে যখনই বাবার সঙ্গে কথা হতো, তিনি বলতেন ‘ঘর যখন ছেড়েছো, কিছু একটা অর্জন করে তবেই ফিরে আসো।’ আমি স্রেফ একটি কথাই বলেছি, ‘আচ্ছা।’ এবং যেহেতু এটা বলেছি, আমি বাড়ি যাইনি। ঠিক করেছিলাম, কোনো কিছু অর্জন করতে পারলেই বাড়ি ফিরব।”

একটা সময় ভিডিও কলে মায়ের সঙ্গে কথা বলতেন কার্তিকেয়া। পরে আবেগের স্রোতে বাধ দিয়ে সেটাও বন্ধ করে দেন।

“ভিডিও কলে কথা বলা বন্ধ করে দেই, কারণ কল করলেও মা শুধু কান্না করতেন। আবেগপ্রবণ হয়ে যেতেন। এজন্য ফোনে শুধু কথা বলতে শুরু করি, ভিডিও নয়। এবার রঞ্জি জয়ের পর অবশ্য ভিডিও কলে কথা বলেছি। এর আগে আইপিএলে ডাক পাওয়ার পর ভিডিও কল করেছিলাম, আর ২০১৮ সালে রঞ্জিতে প্রথমবার সুযোগ পাওয়ার পর করেছিলাম ভিডিও কল।”

মা কিংবা বাড়ির সঙ্গে দূরত্ব, স্রেফ এইটুকু বললে কার্তিকেয়ার ত্যাগের গল্পের সামান্যই বলা হয়। তার জীবনের গল্পটি প্রায় অবিশ্বাস্য।

সংগ্রামমুখর জীবন

২০১৩ সালের এপ্রিলে ১৫ বছর বয়সে কানপুরের বাড়ি ছাড়েন তিনি। ভর্তি হন দ্রোনাচার্য অ্যাওয়ার্ড জয়ী কোচ সঞ্জয় ভরদ্বাজের বিখ্যাত এলবি শাস্ত্রী ক্রিকেট ক্লাবে। সেখানে তার ক্রিকেট শিক্ষার গল্পটাও অবিশ্বাস্য। দিল্লির এই একাডেমিতে ট্রেনিং করতেন তিনি প্রতিদিন ট্রেনে ৮০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে!

দিল্লিতে কার্তিকেয়া থাকতে শুরু করেন তার বন্ধু রাধেশ্যামের সঙ্গে, যিনি জায়গায় জায়গায লিগ ক্রিকেট খেলতেন। বন্ধুর হাত ধরে দিল্লির বিভিন্ন একাডেমিতে ঢু মারেন, কিন্তু সেসব একাডেমির বেতনের পরিমাণ দেখে আর ভর্তি হতে পারেননি। শেষে ভরদ্বাজের একাডেমিতে যান। কোচকে গিয়ে বলেন, একাডেমির ফি দেওয়ার সামর্থ্য তার নেই।

কোচ তখন তাকে নেটে পরখ করে দেখবেন বলে জানান। নেটে স্রেফ প্রথম বল দেখেই ভরদ্বাজ বুঝে যান, কার্তিকেয়ার ভেতর কিছু একটা আছে। প্রথম নেট সেশনের পর একাডেমিতে জায়গা হয়ে যায় তার।

এরপর কার্তিকেয়ার চ্যালেঞ্জ, নিজের জীবন চালানোর খরচ জোগাড় করা। কনস্টেবল বাবার পক্ষে ছেলেকে টাকা পাঠানো সম্ভব হয়নি। অনেক খুঁজে গাজিয়াবাদের পাশে মাসুরি গ্রামে একটি টায়ার কোম্পানিতে মেকানিকের কাজ মেলে তার। ক্রিকেট একাডেমি থেকে ওই গ্রামের দূরত্ব ৮০ কিলোমিটার!

চাকরি নিয়ে কোম্পানির পাশেই একটি জায়গায় থাকতে শুরু করেন কার্তিকেয়া। রাতভর কোম্পানিতে কাজ করে সকাল থেকে শুরু হতো ক্রিকেট শিক্ষার যুদ্ধ। প্রতিদিন ট্রেনে ৮০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে যেতেন দিল্লির একাডেমিতে!

১০ রুপি বাঁচিয়ে এক প্যাকেট বিস্কুট কেনার জন্য কখনও হাঁটতেন তিনি মাইলের পর মাইল।

একদিন কথা প্রসঙ্গে কার্তিকেয়ার এই গল্প শুনে স্তম্ভিত হয়ে যান কোচ ভরদ্বাজ। সেদিনই কার্তিকেয়াকে বিনা পারিশ্রমিকে কোচিং করানোর কথা দেওয়াসহ পুরো দায়িত্ব নিয়ে নেন কোচ। একাডেমির রাঁধুনির সঙ্গে কোনোরকমে সেখানেই কার্তিকেয়ার থাকার ব্যস্থা করে দেন তিনি।

“তিনি বলেন, আমার যত খরচ লাগবে, জুতা, কাপড়, ক্রিকেটে যা কিছু লাগে, সব তিনি দেবেন। শুনে আমি কাঁদতে শুরু করলাম। দিল্লিতে এমন কিছু কে করেন! তিনি বলেছিলেন, তাকে যেন বাবার মতো দেখি।”

একাডেমির রাধুঁনি যখন তাকে দুপুরের খাবার খেতে দেন, প্লেট হাতে নিয়ে কাঁদতে শুরু করেন কার্তিকেয়া। এক বছর ধরে যে তিনি দুপুরের খাবার খাননি!

কার্তিকেয়াকে একটি স্কুলেও ভর্তি করিয়ে দেন ভরদ্বাজ। যে স্কুলের হয়ে বিভিন্ন লিগে খেলতে শুরু করেন তিনি।

ভরদ্বাজ অবশ্য এমন কিছু অনেক ক্রিকেটারের জন্যই করেন। গৌতম গম্ভির, অমিত মিশ্র, যোগিন্দর শর্মাদের কোচ ছিলেন তিনি। তার হাতে গড়া আরও ১০-১২ জন খেলেছেন আইপিএলে, ৩০-৩৫ জন খেলেছেন রঞ্জিতে। তার কোচিংয়ে নিজেকে শানিত করতে থাকে কার্তিকেয়া।

কার্তিকেয়া তখন বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিনার। ২০১৮ সালে যখন মধ্য প্রদেশের হয়ে লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেট ও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক, তখনও তিনি প্রথাগত বাঁহাতি স্পিনারই। তবে সময়ের পরিক্রমায় নিজেকে এতটাই সমৃদ্ধ করেছেন যে এখন বাঁহাতি রিস্ট স্পিন, ক্যারম বল, ফ্লিপার, গুগলি, সব করতে পারেন।

লেফট আর্ম অর্থোডক্স স্পিনার থেকে তার পরিচয় এখন ‘লেফট আর্ম এভরিথিং।’

তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, শুধু অর্থোডক্স স্পিনার হয়ে টি-টোয়েন্টিতে সফল হওয়া কঠিন। তাই ইউটিউবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে তিনি শিখে নেন বৈচিত্র। মুজিব উর রহমানকে দেখে শেখেন ক্যারম বল, আকিলা দনাঞ্জয়া ও রশিদ খানের বোলিং থেকে শেখেন গুগলি। যুজবেন্দ্র চেহেল, অ্যাডাম জ্যাম্পাদের দেখেও শেখেন অনেক কিছু। সাবেক ভারতীয় লেগ স্পিনার নরেন্দ্র হিরওয়ানির কাছ থেকে শিখে নেন ফ্লিপার।

ইউটিউবে দেখলাম আর শিখে নিলাম, অবশ্যই ব্যাপারটি এমন ছিল না। ওই বোলারদের গ্রিপ দেখে তা নিজের অ্যাকশনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে ম্যারাথন বোলিং সেশন চালিয়ে যেতে থাকেন। একা একাই বোলিং অনুশীলন করতেন দিনে তিন-চার ঘণ্টা। ছয় বলে ছয় রকম বৈচিত্রের বোলিং অনুশীলন করে যেতে থাকেন মাসের পর মাস ধরে। কোচদের পরামর্শ তো সঙ্গী ছিলই।

মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের মতো আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজির নজর কাড়েন তিনি এই বৈচিত্র দিয়েই। গত এপ্রিলের শেষ দিকে চোট পাওয়া আরশাদ খানের জায়গায় কার্তিকেয়াকে দলে নেয় আইপিএলের সফলতম দলটি।

দলে নেওয়ার দুই দিন পরই মাঠে নামিয়ে দেওয়া হয় তাকে। আইপিএলে অভিষেকে নিজের স্রেফ দ্বিতীয় বলেই তিনি আউট করেন রাজস্থান রয়্যালসের অধিনায়ক সাঞ্জু স্যামসনকে!

সেদিন ৪ ওভারে স্রেফ ১৯ রান দেন তিনি। দ্বিতীয় ম্যাচে উইকেটের দেখা পানি। তবে পরের দুই ম্যাচে উইকেট নেন দুটি করে। এবারের আইপিএলের শেষ সময়টায় বার্তা দিয়ে রাখেন সামনের আইপিএল রাঙানোর।

রঞ্জি ট্রফিতে তিনি নিজেকে মেলে ধরতে শুরু করেন আইপিএলের আগে থেকেই। আইপিএলের পরও চলতে থাকে সেই ধারাবাহিকতা। ফাইনালে মুম্বাইয়ের বিপক্ষে জয়ের ম্যাচে তিনি নেন ৫ উইকেট। বিশেষ করে, দ্বিতীয় ইনিংসে তার ৪ উইকেটই দলের জয়ের পথ গড়ে দেয়।

রঞ্জি ট্রফিতে এবার ৬ ম্যাচ খেলে ৩২ উইকেট তার, টুর্নামেন্টের যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। আইপিএলের পর রঞ্জিতে ৩ ম্যাচেই তার শিকার ২০ উইকেট!

অবশেষে তার মনে এলো, এবার বাড়ি ফেরার সময় হলো। অনেক শ্রম, ঘাম আর চোখের জলের পর এখন কার্তিকেয়ার জীবনে আনন্দের প্রহর।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক