Published : 31 Jul 2025, 04:32 PM
রেকর্ড গড়াই হয় ভাঙার জন্য- ক্রিকেটে কিংবা খেলাধুলায় খুব প্রচলিত একটি কথা। তারপরও কিছু রেকর্ড অক্ষত রয়ে যায় যুগের পর যুগ। যেগুলো কখনোই হয়তো ভাঙবে না। তেমনই একটি রেকর্ড গড়ে ক্রিকেট ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন জিম লেকার। এক টেস্টে ১৯ উইকেট, অবিশ্বাস্য একটি পারফরম্যান্স হয়ে আছে একটি ক্যারিয়ারের প্রতীক।
লেকারের সেই বিরল কীর্তির ৭০ বছর হলো প্রায়। ১৯৫৬ সালের অ্যাশেজ সিরিজে অমন জাদুকরি বোলিং উপহার দিয়েছিলেন ইংলিশ অফ স্পিনার। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ২৬ জুলাই শুরু ম্যাচে টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে বড় স্কোর গড়েছিল ইংল্যান্ড। অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে ১০টিসহ ম্যাচে ১৯ উইকেট নিয়ে লেকার ইংলিশদের ইনিংস ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেছিলেন আজকের দিনটিতে।
টেস্ট ক্রিকেটের দেড়শ বছরের ইতিহাসে এক ম্যাচে ১৭ উইকেটের বেশি নেওয়ার নজির আর নেই। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের আড়াইশ বছরের বেশি সময়ের ইতিহাসেও লেকার এখনও অনন্য।
টেস্টের এক ইনিংসে ১০ উইকেটের কীর্তি গড়া প্রথম বোলার তিনিই। এটিও ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল চার দশকের বেশি সময়। প্রায় ৪৩ বছর পর ১৯৯৯ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে দিল্লি টেস্টে সেটির পুনরাবৃত্তি করেন ভারতের লেগ স্পিনার অনিল কুম্বলে। তার ২২ বছর পর ২০২১ সালে ভারতের বিপক্ষে মুম্বাই টেস্টে ‘পারফেক্ট টেন’ ক্লাবের তৃতীয় সদস্য হন নিউ জিল্যান্ডের বাঁহাতি স্পিনার এজাজ প্যাটেল।
তবে টেস্টের দুই ইনিংস মিলিয়ে উইকেট-সংখ্যায় লেকারের ধারেকাছেও যেতে পারেননি কুম্বলে বা এজাজের কেউ, ম্যাচে এই দুজনেরই উইকেট ছিল ১৪টি করে।
লেকার অমন অতিমানব হয়ে উঠেছিলেন ওই সিরিজের চতুর্থ টেস্টে। প্রথম তিন টেস্ট শেষে সিরিজে ১-১ সমতা নিয়ে ম্যানচেস্টারে মুখোমুখি হয় দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দল।
‘পারফেক্ট টেন’ এর মহড়া অবশ্য আড়াই মাস আগেই দিয়ে রেখেছিলেন লেকার। ওভালে প্রস্তুতি ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে ৮৮ রানে ১০ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি কাউন্টি দল সারের হয়ে।
ওল্ড ট্র্যাফোর্ড টেস্টের উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ানরা পরে সমালোচনা করেছে বরাবরই। ইংল্যান্ডের স্পিনারদের জন্যই উইকেট প্রস্তুত করা হয়েছিল, অভিযোগ ছিল সফরকারীদের। কয়েক বছর পর তাদের সেই দাবি সত্যি হয়, যখন ম্যানচেস্টারের কিউরেটর বার্ট ফ্ল্যাক বলেন, ম্যাচ শুরুর আগের দিন তাকে উইকেটের ঘাস ছেঁটে দিতে বলেছিলেন ইংল্যান্ডের নির্বাচকদের চেয়ারম্যান গাবি অ্যালেন।
নির্দেশনা শুনে ফ্ল্যাক বলেছিলেন, “এটা বোকামি হবে… ম্যাচ তিন দিনও টিকবে না, এই উইকেট ততটা জমাট নয়।” কয়েক মিনিট দোলাচলের পর অবশ্য তিনি সেটাই করেন, তাকে যা করতে বলা হয় এবং দ্রুতই উইকেট ঢেকে দেন, যাতে সংবাদমাধ্যমের কারও নজরে না পড়ে।
ম্যাচের আগে সংবাদমাধ্যমে লেখা হয়েছিল, পেসারদের জন্য সহায়ক হতে পারে উইকেট। তবে সবচেয়ে অনুমিত ফল ছিল ড্র। কারণ, আগের ৫১ বছরে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে কোনো অ্যাশেজ টেস্ট জয়-পরাজয় দেখেনি।
আগের টেস্টে হেডিংলিতে স্পিনারদের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানদের ভোগান্তি দেখে পেসার ফ্রেড ট্রুম্যানকে ওল্ড ট্যাফোর্ডে বাদ দেন ইংল্যান্ডের নির্বাচকরা। হেডিংলিতে অস্ট্রেলিয়াকে ১৪৩ ও ১৪০ রানে গুটিয়ে দলের ইনিংস ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে লেকার ও তার সারে সতীর্থ বাঁহাতি স্পিনার টনি লক মিলে নেন ১৮ উইকেট।
ওল্ড ট্যাফোর্ডে প্রথম দিন ইংল্যান্ড করে ৩ উইকেটে ৩০৭ রান। কলিন কাউড্রের সঙ্গে ইনিংস শুরু করতে নেমে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির দেখা পান পিটার রিচার্ডসন। ব্যাটিংয়ে নামার পর উইকেট দেখে রিচার্ডসনও অবাক হয়ে যান। অনেক দিন পরে একসময় তিনি বলেছিলেন, “(উইকেট) আগের দিনের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন মনে হচ্ছিল। আমরা যখন আসি, তখন ঘন সবুজ দেখাচ্ছিল, পেসারদের জন্য উপযুক্ত। পরের দিন সকালে একেবারে ছেঁটে ফেলা হয়েছিল…একদমই শুষ্ক মনে হচ্ছিল। জানি না ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছিল কি-না, তবে এটা অবশ্যই আমাদের জয়ের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছিল। আমরা পুরোনো বুড়োরা এখনও আলোচনা করি এটা নিয়ে, কিন্তু কেউ জানি না আসলে কী হয়েছিল।”
রিচার্ডসনের পাশাপাশি ডেভিড শেপার্ডের সেঞ্চুরিতে দ্বিতীয় দিন ইংল্যান্ড অলআউট হয় ৪৫৯ রানে। জবাবে শুরুটা ভালোই করে অস্ট্রেলিয়া। একপর্যায়ে তাদের সংগ্রহ ছিল বিনা উইকেটে ৪৮, এরপরই ধস নামে ব্যাটিংয়ে। ৩৬ রানের মধ্যে ১০ উইকেট হারিয়ে স্রেফ ৮৪ রানে গুটিয়ে যায় সফরকারীরা।
৩৭ রানে ৯ উইকেট শিকার করেন লেকার। অন্য উইকেটটি নেন লক, যেটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার তৃতীয় উইকেট।
লেকারের শেষ ৯ ওভারে ৯ উইকেট ধরা দেয় স্রেফ ১৬ রানে। ৭ উইকেট নেন চা-বিরতির পর, যেখানে প্রতি তিন বলে পান একটি করে উইকেট। ৩৫ মিনিট আর ২২ রানে শেষ ৮ উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া।
সেই ম্যাচের অস্ট্রেলিয়া দলেও ছিলেন দুই স্পিনার- অধিনায়ক ইয়ান জনসন ও রিচি বেনো। তবে ইংল্যান্ডের স্পিন যুগলের মতো অতটা টার্ন তারা উইকেট থেকে পাননি। উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ান শিবিরের অসন্তোষের নীরব গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে সংবাদমাধ্যমে। দ্বিতীয় দিন বিকেল থেকেই যেভাবে টার্ন মিলছিল ও উইকেট যতটা শুষ্ক ছিল, তা মেনে নিতে পারছিল না তারা। অস্ট্রেলিয়ার লেগ স্পিন কিংবদন্তি বিল ও’রাইলি ক্ষোভ প্রকাশ করে উইকেটকে ‘লজ্জাজনক’ বলে উল্লেখ করেন সংবাদমাধ্যমে। অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান ইয়ান ক্রেইগ তো প্রথম ইনিংস শেষেই বলেছিলেন তারা ম্যাচ থেকে ছিটকে গেছেন, “আমরা সবাই ক্ষুব্ধ ছিলাম, মনে হচ্ছিল আমাদেরকে ধোঁকা দেওয়া হয়েছে।”
অস্ট্রেলিয়া ফলো-অনে পড়ে ব্যাটিংয়ে নামার পর দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষের আগে একটি উইকেট নেন লেকার। নিল হার্ভের সেই উইকেটটি নিয়ে লেকার পরে বলেছিলেন, “মৌসুমে আমার সবচেয়ে বাজে ডেলিভারি ছিল এটি।” বলটি ছিল লেগ স্টাম্পের ওপরে একটি নিরীহ ফুল টস। হার্ভে আলতো করে মিড-অনে বল তুলে দেন কাউড্রের হাতে।
সেদিন দুই ঘণ্টার মধ্যে চার বলে ‘পেয়ার’ (জোড়া শূন্য) পাওয়ার তেতো অভিজ্ঞতা হয় হার্ভের। আউট হয়ে হতাশায় তার ব্যাট শূন্যে ছুড়ে দেওয়া আর লেকারের শরীরী ভাষায় সহানুভূতির একটি ছবি পরে বিখ্যাত হয়ে যায়।
বৃষ্টিবিঘ্নিত তৃতীয় দিনে খেলা হতে পারে কেবল ৪৫ মিনিট। এ দিন জিম বার্কের উইকেট নেন লেকার। আগের দিন হাঁটুতে আঘাত পেয়ে মাঠ ছেড়ে যাওয়া ওপেনার কলিন ম্যাকডোনাল্ড ব্যাটিংয়ে নামেন আবার। ওদিকে উইকেট নিয়ে সমালোচনাও বাড়তে থাকে।
পরের দিন ছিল ‘রেস্ট ডে।’ সপ্তাহজুড়েই আবহাওয়া ভালো ছিল না। বৃষ্টির সঙ্গে ছিল ঝড়ো হওয়া। ম্যাচের চতুর্থ দিন মাত্র এক ঘন্টা খেলা সম্ভব হয়েছিল। এ দিন আর কোনো উইকেট নিতে পারেনি ইংল্যান্ড।
পঞ্চম দিন বৃষ্টি থামে ভোরের দিকে। দিনের খেলা শুরু হয় যথাসময়ে। সে যুগে ঝড়-বৃষ্টি যাই হোক না কেন, উইকেট ঢেকে রাখা হতো না। শেষ দিনে উইকেট এতটাই স্যাঁতস্যাঁতে ছিল যে, স্পিনাররা সহায়তা পাচ্ছিলেন না। প্রয়োজন ছিল একটু রোদ পড়ে তা শুষ্ক হয়ে ওঠার। ম্যাকডোনাল্ড ও ইয়ান ক্রেইগ প্রথম সেশন পার করে দেন নির্বিঘ্নে। চোয়ালবদ্ধ লড়াইয়ে উইকেটে পড়ে থেকে দারুণ ব্যাটিং করছিলেন দুজন, বিশেষ করে ম্যাকডোনাল্ড।
লাঞ্চের সময় রোদ উঠে যায় ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে। সঙ্গে বইছিল বাতাস। কাঠের বেলস উড়ে যাওয়ায় প্রয়োজন হয় টাইটানিয়াম বেলসের।
দ্বিতীয় সেশনে শেষ হয় ক্রেইগের চার ঘণ্টার বেশি সময়ের লড়াই। তার বিদায়ে ৫৯ রানের জুটি ভাঙার পর ছোট্ট একটা ধস নামে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে। ২৬ বলের মধ্যে ৪ উইকেট তুলে নেন লেকার।
একপ্রান্ত আগলে রাখা ম্যাকডোনাল্ড এরপর প্রতিরোধ গড়েন বেনোকে সঙ্গে নিয়ে। সময় নষ্ট করার অদ্ভুত কৌশল নিয়েছিলেন বেনো। টাইমস-এ লেখা হয়েছিল, “তিনি প্রতি ওভারেই গার্ড নিচ্ছিলেন এবং প্রতিটি বলের পর খুব ধীরে ও ইচ্ছাকৃতভাবে পিচ নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছিলেন।” বেনো পরে স্বীকার করেছিলেন যে, উইকেট নিয়ে তার প্রতিবাদ ছিল এটি।
সেই প্রতিরোধ ভাঙে চা-বিরতির পর। চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায় ম্যাকডোনাল্ডের ৩৩৭ মিনিটের লড়াই শেষ হয় তৃতীয় সেশনের দ্বিতীয় বলে। ৮৯ রান করে ব্যাকওয়ার্ড শর্ট লেগে ধরা পড়েন এই ওপেনার।
ম্যাকডোনাল্ডের ইনিংসটি নিয়ে রিচার্ডসন পরে বলেছিলেন, “ওই উইকেটে সেভাবেই সে খেলেছে, যে কোনো উঁচুমানের খেলোয়াড় যেভাবে খেলত। এর চেয়ে বেশি প্রশংসা তার করতে পারি না। সেই ইনিংসটি নিয়ে এখনও মানুষের কাছে গল্প করি এবং তারা জানে না, আমি কী নিয়ে কথা বলছি। কন্ডিশন বিবেচনায় টেস্ট ক্রিকেটে খেলা সেরা ইনিংসগুলোর একটি ছিল এটি। সে কখনও কৃতিত্বটুকু পায়নি।”
ম্যাকডোনাল্ডের বিদায়ের পর আর বেশিদূর এগোতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। বেনোর ১০৫ মিনিটের লড়াই শেষ হয় বোল্ড হয়ে। কিপার-ব্যাটসম্যান লেন ম্যাডকসকে এলবিডব্লিউ করে ইনিংসে ১০ উইকেট পূর্ণ করেন লেকার। অস্ট্রেলিয়াকে ২০৫ রানে থামিয়ে ইনিংস ও ১৭০ রানের জয়ে সিরিজে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড।
টেস্ট ইতিহাসে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে এক ইনিংসের সবকটি উইকেট নিয়েও তেমন কোনো উচ্ছ্বাস ছিল না লেকারের। ম্যাডকস এলবিডব্লিউ হতেই দৌড়ে মাঠে ঢুকে পড়তে শুরু করেন দর্শকরা। আম্পায়ার, প্রতিপক্ষের সঙ্গে করমর্দনের পর সোয়েটার কাঁধে ঝুলিয়ে সতীর্থদের সঙ্গে ড্রেসিং রুমের পথে হাঁটা ধরেন লেকার। যেন এটা নিত্যদিনের ঘটনা!
ম্যাচে লেকার ১৯ উইকেট নেন ৯০ রান দিয়ে। তার চেয়ে এক ওভার বেশি বোলিং করে ১০৬ রানে ১ উইকেট পান বাঁহাতি স্পিনার লক। এটিও কম আশ্চর্যজনক ছিল না। পরে সবাই একমত হয়েছিল যে, ওই উইকেটে একটু বেশিই জোরে বল করেছিলেন লক। যথেষ্ট ধৈর্য ধরতে পারেননি তিনি।
ওই সময়ের স্মৃতি স্মরণ করে লককে নিয়ে কাউড্রে বলেছিলেন, “তার চেয়ে বেশি বিব্রত সম্ভবত আর কেউ হয়নি। মে (অধিনায়ক পিটার মে) জানত, লকের অনুভূতি কেমন ছিল। সে বলেছিল, ‘স্কোরকার্ড ভুলে যাও, টনি, তুমিও তোমার ভূমিকা পালন করেছো।”
লকের বিব্রত হওয়ার আরেকটি কারণ ছিল লেকারের সঙ্গে তার শীতল সম্পর্ক।
লেকারের চেয়ে সাত বছরের ছোট লককে নিয়ে রিচার্ডসনের ভাষ্য ছিল, “লেকার ও লকের মধ্যে খুব একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল না। জিম যত বেশি উইকেট নিচ্ছিল, লকি তত বেশি বিরক্ত হচ্ছিল, আর সে যত বেশি বিরক্ত হচ্ছিল, তত জোরে বল করছিল। এক পর্যায়ে সে প্রায় ব্রায়ান স্ট্যাথামের (পেসার) মতোই দ্রুতগতির ছিল। লকির এত তেতে ওঠা লেকারকে সহায়তাই করেছিল।”
বিরল কীর্তি গড়ে লেকার যখন সংবাদের শিরোনামে, তখনও কিছু মানুষ, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ানরা উইকেট নিয়ে অবিরত ক্ষোভ প্রকাশ করছিল। তবে উইকেট যেমনই হোক, এক টেস্টে ১৯ উইকেট নেওয়া তো আর চাট্টিখানি কথা না! অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক জনসন যেমন বলেছিলেন, “এই ম্যাচের বিতর্ক ও বাইরের বিষয়গুলো সবাই ভুলে যাবে… লেকারের দুর্দান্ত বোলিং টিকে থাকবে।”
ম্যাচ শেষের পর সংবাদমাধ্যম ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা লেকারকে এমনভাবে ঘিরে রেখেছিল যে, রাত ৮টার আগে তিনি ওল্ড ট্র্যাফোর্ড ছাড়তে পারেননি।
বাড়ি ফেরার পথে রাতের খাবার খেতে লিচফিল্ডের কাছে একটি জনাকীর্ণ পাব-এ থামেন লেকার। সেখানে টিভিতে তার কীর্তি দেখানো হচ্ছিল। উপস্থিত লোকেরা তার প্রশংসা করছিল, কিন্তু তারা টেরই পায়নি যে, স্বয়ং লেকার সেখানে উপস্থিত!
লেকার যখন বাড়ি ফেরেন, ততক্ষণে অভিনন্দন বার্তায় ভরে যায় বাড়ি। তার অস্ট্রিয়ান স্ত্রী লিলি (ক্রিকেট তেমন বুঝতেন না) এতটাই অবাক হয়ে যান যে, তিনি স্বামীকে জিজ্ঞেস করেন, “জিম, তুমি কি আজ ভালো কিছু করেছো?”
তখনকার ক্রিকেট বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। পরের দিন সকালে লেকার, মে ও লক লন্ডনের ওভালে সারের হয়ে খেলতে চলে যান অস্ট্রেলিয়ানদের বিপক্ষে। সফরকারীদের সেই দলে ছিলেন টেস্ট ম্যাচের ছয় জন খেলোয়াড়ও।
এক টেস্টে ১৯ উইকেট নিয়ে লেকার ভেঙেছিলেন ইংল্যান্ডেরই সিডনি বার্নসের রেকর্ড। ১৯১৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জোহানেসবার্গে দ্বিতীয় ইনিংসে ৯টিসহ ম্যাচে ১৭ উইকেট নিয়েছিলেন সর্বকালের সেরা পেসারদের একজন বলে বিবেচিত বার্নস।
এই দুজন ছাড়া এক টেস্টে ১৭ উইকেট নেই আর কারও। এখন পর্যন্ত তাদের সবচেয়ে কাছাকাছি যেতে পেরেছেন তিন জন। ১৯৭২ সালে লর্ডসে অস্ট্রেলিয়ার বব ম্যাসি, ১৯৮৮ সালে চেন্নাইয়ে ভারতের নারেন্দ্র হিরওয়ানি ও ১৯৯৮ সালে দা ওভালে শ্রীলঙ্কার মুত্তাইয়া মুরালিদারান নিয়েছিলেন ১৬টি করে উইকেট। এর মধ্যে ম্যাসি ও হিরওয়ানি এই স্বাদ পেয়েছিলেন তাদের টেস্ট অভিষেকেই।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এক ম্যাচে ১৮ উইকেট নেওয়ার নজির আছে দুজনের। তবে উইলিয়াম লিলিহোয়াইট এই স্বাদ পেয়েছিলেন ১৬ জনের দলের বিপক্ষে খেলে, ১২ জনের দলের বিপক্ষে হেনরি আর্করাইট।
১১ জনের দলের বিপক্ষে খেলে ১৭ উইকেট আছে অনেকের।
সেবার সিরিজে ৫ ম্যাচে স্রেফ ৯.৬০ গড়ে লেকার উইকেট নিয়েছিলেন মোট ৪৬টি। টেস্ট ইতিহাসে এক সিরিজে যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ১৯১৩-১৪ মৌসুমে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে ৪ টেস্টে ৪৯ উইকেট নিয়ে এখানে চূড়ায় আছেন বার্নস।
কোনো অ্যাশেজ সিরিজে লেকার ছাড়া আর কেউ ৪২টির বেশি উইকেট নিতে পারেননি।
তার ক্যারিয়ার রেকর্ডও এমনিতে বেশ ভালো। ৪৬ টেস্টে ১৯৩ উইকেট নিয়েছেন মাত্র ২১.২৪ গড়ে। গ্রায়েম সোয়ান ও মইন আলির আবির্ভাবের আগে ইংল্যান্ডের ইতিহাসের সফলতম অফ স্পিনার ছিলেন তিনিই।
কিন্তু এসব আর কজন মনে রাখে! জেমস চার্লস লেকার মানেই তাই এক টেস্টে ১৯ উইকেট। যে রেকর্ড হয়তো অক্ষত থাকবে ততদিন, যতদিন টিকে থাকবে টেস্ট ক্রিকেট।