Published : 09 Jan 2026, 05:54 PM
এসএম মেহেরবের ফুল টসে যখন সোজা ব্যাটে চার মারলেন হাসান নাওয়াজ, জয়ের জন্য চট্টগ্রামের তখন প্রয়োজন তিন বলে দুই রান। কিন্তু মেহেরবের চমকপ্রদ বোলিংয়ে পরের দুই বলে এলো না কোনো রান। বারবার নাটকীয় পালাবদলের ম্যাচ উত্তেজনার চূড়ায় পৌঁছে গেল শেষ বলে। এক বলে প্রয়োজন দুই রান।
ব্যাটসম্যান নাওয়াজ বল পাঠালেন লং অফে। নন-স্ট্রাইক প্রান্তের ব্যাটসম্যান শরিফুল ইসলাম হয়ে উঠলেন যেন উসাইন বোল্ট। গুলির বেগে দৌড়ে দুই রান পূর্ণ করেই বাতাসে উড়িয়ে মারলেন ব্যাট। বাঁধনহারা দৌড়ে মেতে উঠলেন খ্যাপাটে উদযাপনে। চট্টগ্রামের ডাগআউটেও তখন উল্লাসের জোয়ার। উল্টো চিত্র রাজশাহী দলের। ছোট পুঁজি নিয়েও তুমুল লড়াই করে শেষ পর্যন্ত পেরে উঠল না তারা।
বিপিএলের রোমাঞ্চকর ম্যাচে শেষ বলের ফয়সালায় রাজশাহী ওয়ারিয়র্সকে ২ উইকেটে হারাল চট্টগ্রাম রয়্যালস।
সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে শুক্রবার রাজশাহী ২০ ওভারে তুলতে পারে ১২৮ রান। রান তাড়ায় পাওয়ার প্লেতে চার রানের মধ্যে চার উইকেট হারায় চট্টগ্রাম। পরে চড়াই-উৎরাইয়ের নানা পথ পেরিয়ে এগিয়ে যায় তারা। চতুর্থ ওভার থেকে শেষ পর্যন্ত দলের হাল ধরে রাখেন হাসান নাওয়াজ।
এমনিতে আগ্রাসী ব্যাটসম্যান হলেও এ দিন ঠাণ্ডা মাথায় দারুণ পরিণত ব্যাটিংয়ে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন তিনি ৩৬ বলে ৩৫ রানে অপরাজিত থেকে। এটিই তাকে এনে দেয় ম্যাচ-সেরার পুরস্কার।

টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামে রাজশাহী। আগের দিনের নায়ক মুহাম্মাদ ওয়াসিম ম্যাচের দ্বিতীয় ওভারেই টানা দুটি ছক্কা মারেন আবু হায়দারকে। তিন ওভারে দলের রান আসে ২১।
তখন কে জানত, সেই ২১ রানই রাজশাহীর সেরা জুটি হয়ে রইবে!
চতুর্থ ওভারে স্পিন আক্রমণে আনে চট্টগ্রাম। তানভির ইসলামের দ্বিতীয় বলেই সুইপের চেষ্টায় বোল্ড হয়ে যান ওয়াসিম (১৪ বলে ১৯)।
নাজমুল হোসেন শান্ত চার দিয়ে শুরু করলেও পরে ডানা মেলতে পারেননি। হাসান নাওয়াজের বলে ছক্কার চেষ্টায় রাজশাহী অধিনায়ক ধরা পড়েন সীমানায়। লং অফে দারুণ ক্যাচ নেন আমির জামাল।
এবারের বিপিএলের আগে বোলার হিসেবে কোনো পরিচিতি ছিল না নাওয়াজের। টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে আগে সব মিলিয়ে তিন ওভার বোলিং করে ৪২ রান দিয়ে উইকেটশূন্য ছিলেন। অথচ বিপিএলে পরপর দুই ম্যাচে আউট করলেন মইন আলি ও শান্তকে।
আরেকপ্রান্তে তানজিদ হাসানের ব্যাট ছিল আশ্চর্যরকম নিশ্চুপ। পাওয়ার প্লেতে ৯ বল খেলে রান করেন তিনি মাত্র ৩!
পাওয়ার প্লে শেষে প্রথম ওভারেই জামালের শিকার হয়ে বিদায় নেন ১২ বলে ৫ রান করে।
বাংলাদেশ বিশ্বকাপ দলের ওপেনার বিপিএলে এই নিয়ে ছয় ম্যাচ খেলে একটিতেও ৩০ ছুঁতে পারলেন না।
নাওয়াজের বলে প্রিয় স্লগ সুইপে ছক্কায় শুরুর পর মুশফিকুর রহিমও এগোতে পারেননি বেশি দূর। তাকেও থামান জামাল।
এরপর এস এম মেহেরব (১৯ বলে ১৯) ও রায়ান বার্ল (১০ বলে ১১) পারেননি দলকে টেনে নিতে। মৌসুমে প্রথমবার সুযোগ পাওয়া আকবর আলি কিছুক্ষণ টিকে থাকলেও জামালের শিকার হয়ে ফেরেন ১৬ বলে ১৭ করে।।

আটে নেমে ১৪ বলে ১৪ রানে অপরাজিত থাকেন তানজিম হাসান। লোয়ার অর্ডারে কেউ পারেননি জমে উঠতে।
চট্টগ্রামের রান তাড়া অনেকটা এগোয় রাজশাহীর পথ ধরেই। প্রথম তিন ওভারে ওঠে ২০ রান। চতুর্থ ওভারে স্পিন আসতেই বদলে যায় চিত্র।
অফ স্পিনার এসএম মেহেরবের এক ওভারেই উইকেট ধরা দেয় দুটি। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা অ্যাডাম রসিংটন এবার কাটা পড়েন ১৫ বলে ১৭ রান করে। আগের ম্যাচের ম্যান অব দা ম্যাচ মাহমুদুল হাসান জয় আলতো শটে ফিরতে ক্যাচ দেন তৃতীয় বলেই।
সেই দুই ধাক্কার রেশ থাকতেই আবার জোড়া ধাক্কা। বিনুরা ফার্নান্দোর পরের ওভারে প্রথম বলেই বিদায় নেন মোহাম্মদ নাঈম শেখ (৭ বলে ৭)। আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত তার পছন্দ হয়নি। মাঠ ছাড়ার সময় আম্পায়ারকে কিছু বলতেও দেখা যায় তাকে।
পরের বলে বিদায় নেন সাদমান ইসলামও। আগের চার ম্যাচের স্রেফ একটিতে ব্যাট করতে নামা ব্যাটসম্যান এবার ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেয়েও ব্যর্থ। বিনুরার প্রথম বলই টেনে আনেন স্টাম্পে।
বিনা উইকেটে ২৪ রান থেকে চট্টগ্রামের রান হয়ে যায় ৪ উইকেটে ২৮।
সেই বিপর্যয়ে প্রতিরোধ গড়ে শেখ মেহেদি ও হাসান নাওয়াজ। রান রেটের চাপ বেশি ছিল না, ধীরস্থির ব্যাটিংয়ে সতর্কতার পথ বেছে নেন দুজন।
তবে বিপর্যয় সামাল দেওয়ার পর যখন রানের গতি একটু বাড়ানোর কথা, তখনই জুটি থামে ৪০ রানে। একাদশে ফেরা সান্দিপ লামিছানের দারুণ ডেলিভারিতে শেখ মেহেদি বোল্ড হন ২৫ বলে ২৮ রান করে।
পরের জুটির ছবিটাও অনেকটা একই। নাওয়াজ ও আসিফ আলি এগোতে থাকেন ধীরস্থির ব্যাটিংয়ে। তাতে প্রয়োজনীয় রান রেট বেড়ে যায় একটু। শেষ চার ওভারে প্রয়োজন পড়ে ৩২ রানে।
বিনুরা ফার্নান্দোর বলে আসিফ আলির ছক্কায় তখন কিছুটা সহজ হয় সমীকরণ। এক বল পরই আরেকটি ছক্কার চেষ্টায় শান্তর দারুণ ক্যাচের শিকার হন আসিফ (২৫ বলে ২৭)। পরের ওভারে রিপন মন্ডলকে ছক্কা মারার পর বিদায় নেন আমির জামালও।
তবু চট্টগ্রামের মুঠোয় ছিল ম্যাচ। শেষ ১২ বলে দরকার ছিল কেবল ১৩ রানের।
১৯তম ওভারে তানজিম হাসান দারুণ বোলিংয়ে রান দেন মাত্র ৩। পাশাপাশি বিদায় করেন আবু হায়দারকে।
শেষ ওভারে দরকার পড়ে ১০ রানের। রাজশাহীর পেসারদের বোলিংয়ের কোটা তখন শেষ। মাঠেই ছোটখাটো একটা মিটিং করে বল তুলে দেওয়া হয় অফ স্পিনার মেহেরবের হাতে। তার প্রথম দুই বলে আসে দুটি করে রান, তৃতীয় বলে ফুল টসে চার মারেন নাওয়াজ।
এরপর নাটক জমিয়ে শেষ বলে নাওয়াজের দুই রানেই জিতে যায় চট্টগ্রাম।
সাত ম্যাচে ১০ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে বিসিবির ব্যবস্থাপনায় থাকা দলটি। এ দিন রানের ম্যাচটি জিতলে শীর্ষে উঠে যাবে রংপুর।
ছয় ম্যাচে রাজশাহীর পয়েন্ট আট। আরও তিন দলের সঙ্গে পয়েন্ট সমান হলেও রান রেটে তারা আছে চারে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
রাজশাহী রয়্যালস: ২০ ওভারে ১২৮/৯ (তানজিদ ৫, ওয়াসিম ১৯, শান্ত ৭, মুশফিক ১২, মেহেরব ১৯, বার্ল ১১, আকবর ১৭, তানজিম ১৪*, রিপন ১, লামিছানে ৫, বিনুরা ৩*; শরিফুল ৪-০-২০-২, আবু হায়দার ২-০-২০-০, তানভির ৪-০-২৬-২, শেখ মেহেদি ৪-০-২১-১, নাওয়াজ ২-০-১৩-১, জামাল ৪-০-২৩-৩)।
চট্টগ্রাম রয়্যালস: ২০ ওভারে ১২৯/৮ (নাঈম ৭, রসিংটন ১৭, জয় ৪, নাওয়াজ ৩৫*, সাদমান ০, শেখ মেহেদি ২৮, আসিফ ২৭, জামাল ৮, আবু হায়দার ১, শরিফুল ১*; বিনুরা ৪-১-১৮-৩, রিপন ৪-০-৩৩-১, মেহেরব ৩-০-২৫-২, তানজিম ৪-০-২৫-১, লামিছানে ৪-০-২১-১, বার্ল ১-০-৬-০)।
ফল: চট্টগ্রাম রয়্যালস ২ উইকেটে জয়ী।
ম্যান অব দা ম্যাচ: হাসান নাওয়াজ।