Published : 25 Mar 2026, 01:51 PM
“মনে হচ্ছে যেন, কোনো ফাঁদে আটকা পড়েছি”, ক্রিকেট থেকে বিরতির ঘোষণা দিয়ে বিষন্ন মনে বলেছিলেন আরিয়ামান বিরলা। শরীরের একের পর এক চোট গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল তার হৃদয়ে। মানসিক অবসাদে আক্রান্ত হয়ে হাঁসফাঁস করছিলেন। নিজের সঙ্গে যুদ্ধের এক পর্যায়ে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ক্রিকেট থেকে ‘সাময়িক ছুটি’ নেন তিনি। সেই ছুটি আর শেষ হয়নি। ২২ বছর বয়সেই শেষ হয়ে যার ক্রিকেট ক্যারিয়ার। সেই আরিয়ামান ২৮ বছর বয়সে এখন আইপিএল দলের কর্ণধার।
নামের শেষাংশ দেখেই অবশ্য তার পরিচয় সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার কথা। ভারতের বিখ্যাত শিল্প প্রতিষ্ঠান আদিত্য বিরলা গ্রুপেরই উত্তরাধিকার তিনি। ১৬ হাজার ৬৬০ কোটি ভারতীয় রুপিতে যে চারটি প্রতিষ্ঠান কিনে নিয়েছে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু ফ্র্যাঞ্চাইজি, সেখানে বড় অংশ আদিত্য বিরলা গ্রুপের। নতুন মালিকানায় ফ্র্যাঞ্চাইজির চেয়ারম্যান হচ্ছেন আরিয়ামান।
আদিত্য বিরলা গ্রুপ সম্পর্কে নতুন করে বলার আছে সামান্যই। সেই ১৮৫৭ সালে শিব নারায়ন বিরলার হাত ধরে যে প্রতিষ্ঠানের সূচনা, তার নাতি ঘনশ্যাম দাস বিরলার দূরদর্শিতায় প্রতিষ্ঠানে প্রসার, তার নাতি আদিত্য ভিক্রাম বিরলা যে প্রতিষ্ঠানকে ছড়িয়ে দিয়েছেন ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে, তারই নাতি এই আরিয়ামান বিরলা।
১৯৯৫ সালে আদিত্যর মৃত্যুর পর থেকে আদিত্য বিরলা গ্রুপের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন আরিয়ামানের বাবা কুমার মাঙ্গালাম বিরলা। বিশ্বের ৪২টি দেশে এখন ছড়িয়ে আছে তাদের ব্যবসা। মেটাল থেকে শুরু করে সিমেন্ট, ফ্যাশন, টেক্সটাইল, আর্থিব সেবা, নবায়নযোগ্য শক্তি, কেমিক্যাল, রিয়েল এস্টেট, খুচরা ব্যবসাসহ অনেক শাখায় তাদের বিচরণ।
এমন পরিবারেরর সন্তান হয়েও আরিয়ামান চেয়েছিলেন ক্রিকেটে ক্যারিয়ার গড়তে। ভালোবাসার আঙিনায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টাও কম করেননি। মুম্বাইয়ে তার সুযোগ কম বুঝতে পেরে পরিবার ছেড়ে ১৭ বছর বয়সে পাড়ি জমান মধ্য প্রদেশে। সেখানে জুনিয়র সার্কিট থেকেই চেষ্টা করেন ধাপে ধাপে এগোতে। জেলা ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নিজেকে প্রমাণের চেষ্টা করতে থাকেন। মিডলসেক্সের সাবেক ক্রিকেটার পল উইকসের তত্ত্বাবধানে তিন মাস অনুশীলন করেন ইংল্যান্ডে গিয়ে। সেখানে মাইনর লিগও খেলেন।
অবশেষে ২০১৬-১৭ মৌসুমের সিকে নাইডু ট্রফিতে (অনূর্ধ্ব-২৩ দলের টুর্নামেন্ট) নিজেকে মেলে ধরতে পারেন ভালোভাবে। ৯ ইনিংসে ৩ সেঞ্চুরিতে আসরের সর্বোচ্চ ৬০২ রান করেন তিনি ৭৫.২৫ গড়ে।
এর আগ পর্যন্ত অবশ্য তাকে নিয়ে লোকের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন। তার নাম, তার পারিবারিক পরিচয়ই মুখ্য হয়ে উঠত বেশির ভাগ সময়। মধ্য প্রদেশের ক্রিকেটে তাকে শুরুতে আপন করে নিতে পারেননি কেউ। সামনে সমীহ করতেন প্রায় সবাই, আড়ালে চলত নানা আলোচনা। নিজেকে ‘আউটসাইডার’ হিসেবেই মনে হতো তার বেশির ভাগ সময়। তিনি সম্মান আদায় করতে চেয়েছিলেন পারফরম্যান্স দিয়েই।
সিকে নাইডু ট্রফিতে পারফর্ম করে নজর কাড়লেন বাঁহাতি এই ওপেনার। এটিই তার প্রথম শ্রেণির অভিষেকের দুয়ার খুলে দেয়। ২০১৭ সালে ওড়িশার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে স্বপ্ন পূরণের দিনটি এলো।। কিন্তু সেখানেও বাথা! অভিষেকের দিন সকালে অনুশীলনে ভেঙে গেল তার আঙুল। তবু মাঠে নামলেন। খুব বেশি রান করতে না পারলেও ভাঙা আঙুল নিয়ে ব্যথা সয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা ক্রিজে থেকে ৭২ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়লেন রাজাত পাতিদারের সঙ্গে। এই ইনিংসে তিনি আরও বেশি সম্মান আদার করে নিলেন সতীর্থদের কাছ থেকে।
পরের মৌসুমে বাংলার বিপক্ষে ইডেন গার্ডেন্সে দ্বিতীয় ইনিংসে ২৭১ মিনিট ক্রিজে কাটিয়ে ম্যাচ বাঁচানো সেঞ্চুরি যখন উপহার দিলেন, তখন তিনি নিজের নামেই পরিচিত।
সেই তৃপ্তির কথা বলেছিলেন তিনি তখন একটি সাক্ষাৎকারে।
“বিশ্বাস ও সম্মান অর্জনের সেরা উপায় হলো পারফরম্যান্স। যখন আমি রান করা শুরু করলাম, লোকে আমাকে অন্য চোখে দেখতে শুরু করল। মধ্যপ্রদেশে যখন প্রথম আসি, তখন নামের শেষ অংশের কারণেই বেশি পরিচিতি ছিল আমার। শুনতেই থাকতাম ‘বিরলার ছেলে, বিড়লার নাতি…।’কিন্তু পারফরম্যান্স দিয়েই লোকের ধারণা বদলে দিয়েছি, তারা আমাকে ভিন্নভাবে দেখতে শুরু করেছে।”
“এখনও পর্যন্ত এটাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন। সম্প্রতি একজন এসে আমাকে বললেন, ‘আপনি এত সাদাসিদে, এত সহজ-সরল যে, জানতামই না আপনি বিরলা পরিবারের সন্তান।’ আমার কাছে এটা ছিল পরিবর্তনের একটা ইঙ্গিত।”
এর মধ্যেই জায়গা পেলেন তিনি আইপিএলে। ২০১৮ আইপিএলের নিলামে তাকে ভিত্তিমূল্য ৩০ লাখ রুপিতে কিনে নিল রাজস্থান রয়্যালস। পরের আসরেও তাকে ধরে রাখল দলটি। মাঠে নামার সুযোগ অবশ্য হয়নি। তবে ক্রিকেট সম্ভাবনার ঝিলিক মেলে ধরছিলেন তিনি নানাভাবেই।
এরপরই উল্টো স্রোতের শুরু। একের পর এক কোট তাকে কাবু করে ফেলল। ২০১৯ সালের জানুয়ারির পর মাঠের বাইরে কাটাতে হলো মাসের পর মাস। ক্রিকেট স্বপ্নের মৃত্যুর শঙ্কায় বিষন্নতা তাকে ঘিরে ধরল।
টানা ১১ মাস ক্রিকেটের বাইরে থেকে মানসিক অবসাদে আক্রান্ত হয়ে এক পর্যায়ে হার মানতে বাধ্য হলেন। ২২ বছর বয়সে ক্রিকেট থেকে ‘অনির্দিষ্টকালের ছুটি’ নেন তিনি তীব্র মানসিক অবসাদের কথা জানিয়ে।
“মনে হচ্ছে যেন, কোনো ফাঁদে আটকা পড়েছি। এতদিন পর্যন্ত সমস্ত কষ্টের মধ্যে দিয়ে নিজেকে ঠেলে নিয়ে গেছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে নিজের মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতাকে অন্য সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখা প্রয়োজন। আমাদের প্রত্যেকেরই পথচলা নিজের মতো এবং এই সময়টা নিজেকে আরও ভালোভাবে বুঝতে, নতুন ও বৈচিত্র্যময় দৃষ্টিভঙ্গির জন্য মনকে উন্মুক্ত করতে এবং নতুন উপলব্ধির মধ্যে জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে বের করতে কাজে লাগাতে চাই।”
সেই উপলব্ধির পথ ধরে তিনি ছেড়ে যান ক্রিকেটের আঙিনা। ফিরে যান পারিবারিক পরিচয়ের বলয়ে। হার্ভার্ড বিজেনেস স্কুল থেকে এমবিএ করেছেন তিনি, লন্ডনের বেইস বিজনেস থেকে মাস্টার্স করেছেন গ্লোবাষ ফিন্যান্সে, কমার্স ডিগ্রি আছে ইউনিভার্সিটি অব মুম্বাই থেকেও। পারিবারিব ব্যবসায় নিজেকে মানিয়ে নিতে সময় লাগেনি তার। এখন তিনি আদিত্য বিরলা গ্রুপের পরিচালক।
খেলোয়াড়ি জীবনের সেই বিরতি রূপ নিয়েছে সমাপ্তিতে। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে আন্ধ্রা প্রদেশের বিপক্ষে রাঞ্জি ট্রফির ম্যাচটিই হয়ে থকে স্বীকৃতি ক্রিকেটে তার শেষ বিচরণ।
সেই তিনি সাত বছর পর ক্রিকেটে ফিরছেন নতুন পরিচয়ে। এখন তার তিনি ক্রিকেটার নন, ক্রিকেট দলের কর্ণধার। ৭৮ কোটি মার্কিন ডলার বা ১৬ হাজার ৬৬০ কোটি রুপি ভারতীয় রুপিতে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু কিনে নিয়েছে আদিত্য বিরলা গ্রুপ, দা টাইমস অব ইন্ডিয়া গ্রুপ, বোল্ট ভেঞ্চার্স ও বিএক্সপিই (ব্ল্যাকস্টোনস পারপেচুয়াল প্রাইভেট ইকুইটি স্ট্র্যাটেজি), এই চার প্রতিষ্ঠানে কনসোর্টিয়ামের। মালিকানা বদলের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন শেষে ফ্র্যাঞ্চাইজির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেবেন আরিয়ামান।
আইপিএল দলে থাকলেও কখনও ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি। এখন তিনি আইপিএল দলের মালিক। ক্রিকেটার হিসেবে তার অনেক স্বপ্নই মিলিয়ে গেছে, ভেসে গেছে সময়ের স্রোতেই। সময়ই এখন তাকে আবার সুযোগ করে দিয়েছে ক্রিকেটকে কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার। নতুন পরিচয়ে নতুন স্বপ্নের পথ রাঙিয়ে ক্রিকেটে ছাপ রাখার।