Published : 10 May 2026, 05:52 PM
গত জানুয়ারিতে বিপিএল চলার সময়কার ঘটনা। মিরপুরের ঘাসের ছোঁয়া থাকা প্রাণবন্ত উইকেট দেখে চট্টগ্রাম রয়্যালসে খেলতে আসা পাকিস্তানি পেসার আমের জামাল খানিকচা খোঁচার সুরে বলেছিলেন, পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্টেও যেন এখানে এরকম উইকেটই রাখা হয়। সেই টেস্ট এখন দুয়ারে দাঁড়িয়ে এবং ঠিকই সবুজাভ উইকেটের চ্যালেঞ্জই বেছে নিয়েছে বাংলাদেশ!
জামাল যদিও পাকিস্তানের স্কোয়াডে জায়গা পাননি। তবে পাঁচ পেসারের পাকিস্তানের পেস আক্রমণ যথেষ্টই ভালো। বাংলাদেশের তো এখন শক্তির বড় জায়গা পেস বোলিং ইউনিট। দুই দলের দুর্দান্ত পেস আক্রমণের সামনে ব্যাটসম্যানদের লড়াইয়ে চ্যালেঞ্জের মঞ্চ এখন প্রস্তুত।
বাংলাদেশ-পাকিস্তানের দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ শুরু হচ্ছে এই মিরপুর টেস্ট দিয়ে। শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে ম্যাচ শুরু শুক্রবার সকাল ১০টায়।
ম্যাচের আগে থাকছে ব্যতিক্রমী একটি আয়োজন। নিয়ম মেনে দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীতে পালা তো থাকবেই। তবে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত পারফর্ম করবেন নেমেসিস ব্যান্ডের ভোকাল ও জনপ্রিয় তারকা জোহাদ রেজা চৌধুরি।
দুই দলের এই দ্বৈরথের প্রথম পর্ব ছিল গত মার্চে। মিরপুরে ওয়ানডে সিরিজে পাকিস্তানকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। এবার আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ এই সিরিজের লড়াই।
সিরিজের আগে বারবারই ঘুরেফিরে এসেছে দুই দলের সবশেষ টেস্ট সিরিজের স্মৃতি। আগে কখনোই টেস্টে পাকিস্তানের সঙ্গে জিততে না পারা বাংলাদেশ ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডি থেকে সিরিজ জিতে ফিরেছিল ২-০ ব্যবধানে। দুই দলই যদিও বারবার বলেছে, সেই সিরিজ এখন অতীত এবং তারা বর্তমানে থাকতে চান, তবে সেই সুখস্মৃতির দোলা নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশ দলের জন্য প্রেরণার। পাশাপাশি প্রত্যাশার পারদও ওপরে উঠে গেছে ওই সাফল্যের কারণেই।
সাফল্যের সম্ভাব্য পথ হিসেবেই পেসারদের ওপর ভরসা রেখে স্পোর্টিং উইকেটের পথ বেছে নিয়ে টিম ম্যানেজমেন্ট। তাতে দায়িত্ব আর পরীক্ষা, দুটিই বেড়ে গেছে ব্যাটসম্যানদের। উইকেটে যদি সতিই পেসারদের সহায়তা থাকে, তাহলে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে তো ব্যাটিংই!
নাজমুল হোসেন শান্ত তা ভালো করেই জানেন। বড় রান করাকে তাই গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। টেস্ট শুরুর আগের দিন তিনি বললেন, প্রথম ইনিংসে বড় স্কোর গড়া জরুরি।
“আমি মনে করি, প্রথম ইনিংসটা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায় একটা দলের জন্য, বিশেষ করে ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে, এমনকি বোলিংয়ের ক্ষেত্রেও। ব্যক্তিগতভাবে চাই যে, ভালো উইকেটে ভালো রান হবে। সেই ক্ষেত্রে, চারশ বা চারশর বেশি যদি আমরা করতে পারি, সেটা দলের জন্য খুব ভালো। রান করাটা গুরুত্বপূর্ণ। ৮০ ওভারে যদি আমরা ৪০০ করে ফেলতে পারি, কোনো সমস্যা নাই। যদি কেউ ১২০ ওভার লাগায়, তাতেও আমার কোনো সমস্যা নাই। রান করাটা গুরুত্বপূর্ণ।”
দলের বড় স্কোর গড়ার জন্য প্রয়োজন ব্যাটসম্যানদের বড় ইনিংস। যেখানে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ঘাটতি তো সবারই জানা। শান্ত এখানেও শোনালেন প্রত্যয়।
“আমরা ব্যাটসম্যানরা যখন আলাপ করি, ড্রেসিং রুমে বা আমরা যখন প্র্যাকটিস করি বা প্রস্তুতি পর্বে থাকি, তখন সবসময় কথা বলি, কীভাবে আমরা ১০০, ১৫০, ২০০, এরকম বড় ইনিংস খেলতে পারি। সেই রানটাই আসলে দলকে সহায়তা করে। প্রতিটি ব্যাটসম্যানের লক্ষ্যই ওরকম থাকে যে, দলের জন্য কীভাবে বড় রান করতে পারি, ওই প্রেরণা নিয়েই সবাই ব্যাটিং করে।”
বাংলাদেশের একাদশের বেশির ভাগ জায়গা একরকম নিশ্চিতই। ওপেনার তানজিদ হাসানকে স্কোয়াডে রাখা হলেও তার খেলার সম্ভাবনা কমই। আগের সিরিজে সফল হওয়ায় সাদমান ইসলাম ও মাহমুদুল হাসান জয়ই হয়তো ইনিংস শুরু করবেন। এরপর মুমিনুল হক, নাজমুল হোসেন শান্ত, মুশফিকুর রহিম, লিটন কুমার দাস আর মেহেদী হাসান। পেস আক্রমণে নাহিদ রানা ও তাসকিন আহমেদের সঙ্গে থাকতে পারেন শরিফুল ইসলাম। বাকি একটি জায়গায় বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম খেলবেন নাকি বাড়তি ব্যাটসমান, সেটি থাকবে কৌতূহূল।
উইকেটে ঘাস থাকলেও যদি প্রচণ্ড রোদ থাকে, তাহলে সময়ের সঙ্গে উইকেট শুষ্ক হয়ে উঠতে পারে। সেটি ভাবনায় রাখলে দুই স্পিনার থাকার সম্ভাবনাই বেশি। বাড়তি ব্যাটসম্যান নিলে টেস্ট অভিষেকের হাতছানি থাকবে অমিত হাসানের সামনে।
উইকেট সবুজ হলেও অবাক হননি বলেই দাবি করলেন পাকিস্তানের অধিনায়ক শান মাসুদ। তিনি বরং বললেন, সব ধরনের উইকেটের প্রস্তুতি নিয়েই তারা এসেছেন।
“পিচে এখন ঘাস রয়েছে এবং আগামীকালও সম্ভবত এমনই থাকবে। আমরা গত দুই বছরে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন কন্ডিশনে খেলেছি। এমনকি বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানে এসেছিল, তখনও আমরা একই ধরনের উইকেট প্রস্তুত করেছিলাম। আমরা আমাদের ১৬ সদস্যের স্কোয়াডটি ভারসাম্যপূর্ণভাবে তৈরি করেছি, যেখানে সিম ও স্পিন উভয় ধরনের পরিস্থিতির জন্যই বিকল্প রয়েছে।”
পাকিস্তানেরও ভাবনার জায়গা ব্যাটিং এবং সেখানে তারা বড় ধাক্কা হজম করেছে ম্যাচের আগের দিন বাবর আজমকে হারিয়ে। অনুশীলনের মাঝপথে মাঠ ছেড়ে যাওয়া অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান বাঁ হাঁটুর চোটের কারণে খেলতে পারবেন না মিরপুর টেস্টে। পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইন আপে তাই দুজন অভিষিক্ত ব্যাটসম্যানকে দেখা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ওপেনিংয়ে ইমাম-উল-হাক ও মিডল অর্ডারে মোহাম্মাদ রিজাওয়ান, সালমান আলি আগা ও সাউদ শাকিলদের বাড়তি দায়িত্ব নিতে হবে।
ইতিহাস-ঐতিহ্যে ব্যবধান অনেক থাকলেও টেস্ট ক্রিকেটে দুই দলেরই বাস্তবতা এখন অনেকটা একই। টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ আছে ৯ নম্বরে, পাকিস্তান ৬। তবে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের গত চক্রে পাকিস্তান ছিল ৯ নম্বরে, বাংলাদেশ ৭।
এবার পয়েন্ট তালিকায় ওপরে উঠতে চায় দুই দলই এবং সেখানে এই সিরিজ থেকে দুই দলেরই চাওয়া থাকবে যত বেশি সম্ভব পয়েন্ট। তলানির দিকের দুই দলের লড়াইয়ে তাই ক্রিকেটীয় মান শেষ পর্যন্ত যেমনই হোক, উত্তেজনা থাকতে পারে জমাট।