১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

এজবাস্টনে ‘প্রথম’ জয়ে সমতা ফেরাল ভারত

শুবমান গিলের দ্বিশতক ও দেড়শর সঙ্গে মোহাম্মদ সিরাজ ও আকাশ দিপের দুর্দান্ত বোলিংয়ে অ্যান্ডারসন-টেন্ডুলকার ট্রফির দ্বিতীয় ম্যাচে ৩৩৬ রানে জিতল ভারত।

এজবাস্টনে ‘প্রথম’ জয়ে সমতা ফেরাল ভারত
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে রানের দিক থেকে নিজেদের সবচেয়ে বড় জয়ে সিরিজে সমতা ফেরাল ভারত। ছবি: রয়টার্স

স্পোর্টস ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 06 Jul 2025, 11:10 PM

Updated : 26 Aug 2026, 01:20 PM

এলোমেলো শটে বেশ কয়েকটি সুযোগ দিলেন ব্রাইডন কার্স। কখনও ক্যাচ ছেড়ে, কখনও ফিল্ডারদের নাগালের বাইরে থাকায় বেঁচে গেলেন তিনি। আকাশ দিপের বলে তেমনই এক শট করলেন তিনি। কাভারে দাঁড়িয়ে এবার ভুল করলেন না শুবমান গিল। সহজ ক্যাচ নিয়ে নিশ্চিত করলেন ভারতের বড় জয়।

প্রথম ইনিংসে ২৬৯ রানের পর দ্বিতীয়বারে ১৬১ রানের সঙ্গে দারুণ নেতৃত্বে চমৎকার ম্যাচ কাটানো গিলের হাতেই ম্যাচে শেষ ক্যাচটি যাওয়াই যেন ছিল নিয়তি। সেটিও আকাশের বলে। দুই ইনিংস মিলিয়ে যিনি ম্যাচের সেরা বোলার। প্রথম ইনিংসে ৪টির পর দ্বিতীয়বার ৬ উইকেট নিয়ে ৩৩৬ রানের জয়ে ২৮ বছর বয়সী পেসারও রাখেন বড় অবদান।

এজবাস্টনে রোববার ম্যাচের শেষ দিন ৬০৮ রানের ২৭১ রানে গুটিয়ে যায় ইংল্যান্ড। এই মাঠে স্বাগতিকদের বিপক্ষে নবম দেখায় এটিই ভারতের প্রথম।

রানের হিসেবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ভারতের সবচেয়ে বড় জয়ও এটি। এছাড়া দেশের বাইরে রানের হিসেবে তাদের সবচেয়ে বড় জয় এটি। টেস্টে সব মিলিয়ে তাদের এর চেয়ে বড় জয় আছে আর মাত্র তিনটি।

ব্যাটিং-বোলিংয়ে দাপট দেখিয়ে পাওয়া জয়ে অ্যান্ডারসন-টেন্ডুলকার পাঁচ ম্যাচের সিরিজে ১-১ সমতা ফেরাল সফরকারীরা।

প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নিয়ে ইংল্যান্ডের ব্যাটিং গুঁড়িয়ে দেন মোহাম্মদ সিরাজ। দ্বিতীয়বারে তিনি পান শুধু ১ উইকেট। তবে এবার জ্বলে ওঠেন আকাশ। ক্যারিয়ারে প্রথমবার ৫ উইকেট নেওয়ার দিন তার শিকার ৯৯ রানে ৬ উইকেট।

সিরাজকে দারুণ সঙ্গ দিয়ে প্রথম ইনিংসে ৪ উইকেট নিয়েছিলেন আকাশ। সব মিলিয়ে ম্যাচে ১৮৭ রানে ১০ উইকেট তার।

ইংল্যান্ডের মাঠে এক টেস্টে ১০ উইকেট নেওয়া ভারতের দ্বিতীয় বোলার তিনি। এজবাস্টনে ১৯৮৮ সালে ১৮৮ রানে ১০ উইকেট নিয়েছিলেন চেতান শার্মা।

তবে রেকর্ড বই ওলটপালট করে দুই ইনিংস মিলিয়ে ৪৩০ রান করা ভারত অধিনায়ক গিলের হাতে ওঠে ম্যাচসেরার পুরস্কার।

জয়ের চিত্রনাট্য আগের দিনই সাজিয়ে ফেলেছিল ভারত। ছয়শর বেশি রানের লক্ষ্যে ৭২ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল ইংল্যান্ড। শেষ দিনে ভারতের জয়ের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর শঙ্কা জাগিয়েছিল বৃষ্টি।

যে কারণে নির্ধারিত সময়ের ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট পর শুরু হয় শেষ দিনের খেলা। জয়ের পথে এগিয়ে যেতে দেরি করেননি আকাশ। প্রথম সাত ওভারেই আগের দিনের দুই অপরাজিত ব্যাটসম্যান অলি পোপ ও হ্যারি ব্রুককে ফেরান ২৮ বছর বয়সী পেসার।

অফ স্টাম্পের বাইরে ব্যাক অব লেংথ থেকে হালকা লাফিয়ে উঠে ভেতরে ঢোকা ডেলিভারি ঠিকঠাক খেলতে পারেননি পোপ (৫০ বলে ২৪)। বল তার কনুইয়ে লেগে এলোমেলো করে দেয় স্টাম্প। দিনের শুরুতেই সাফল্য পেয়ে উল্লাসে মাতে ভারত শিবির।

পরের ওভারে ব্রুককে আউট করেন আকাশ। অফ স্টাম্পের অনেকটা বাইরে একই লেংথে করা ডেলিভারি তীক্ষ্ণভাবে ভেতরে ঢুকে গেলে বেকায়দায় পড়ে যান ব্রুক। বল আঘাত করে তার প্যাডে। জোরাল আবেদনে সাড়া দিতে সময় নেননি আম্পায়ার। রিভিউ নিয়েও ফায়দা হয়নি ২৩ রান করা ব্রুকের।

মাত্র ৮৩ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে তখন বড় পরাজয়ের শঙ্কায় ইংল্যান্ড। প্রথম ইনিংসে ৮৪ রানে ৫ উইকেট হারিয়েছিল তারা। এর আগে সবশেষ ২০০৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হেডিলিং টেস্টের দুই ইনিংসেই একশর আগে ৫ উইকেট হারিয়েছিল তারা।

জেমি স্মিথকে নিয়ে কিছুক্ষণ দলকে এগিয়ে নেন বেন স্টোকস। চমৎকার বোলিংয়ে বারবার ব্যাটসম্যানদের পরীক্ষায় ফেলছিলেন আকাশ। প্রথম ঘণ্টার পর আক্রমণে আসেন সিরাজ। আরও বাড়ে ইংল্যান্ডের চ্যালেঞ্জ।

সব কিছু সামলেই উইকেট বাঁচিয়ে রেখে খেলছিলেন স্টোকস ও স্মিথ। কিন্তু লাঞ্চ বিরতির ঠিক আগের ওভারে ঘটে বিপদ। ওয়াশিংটন সুন্দারের ফুল লেংথ ডেলিভারি সামনের পায়ে ডিফেন্ড করার চেষ্টায় ব্যাটের আগে ছুঁয়ে যায় স্টোকসের প্যাড।

জোরাল আবেদনে আঙুল সাড়া দেন আম্পায়ার। রিভিউ নষ্ট করে ড্রেসিং রুমের পথ ধরেন ৬ চারে ৭৩ বলে ৩৩ রান করা ইংল্যান্ড অধিনায়ক। তার বিদায়ে ভাঙে ৭০ রানের ষষ্ঠ উইকেট জুটি।

বাকি সময়টা স্মিথের একার লড়াই। ক্রিস ওকসের সঙ্গে সপ্তম উইকেট জুটিতে ৪৬ রান যোগ করেন কিপার-ব্যাটসম্যান। প্রথম ইনিংসে  অপরাজিত ১৮৪ রান করা স্মিথ এবার ৭৩ বলে করেন ফিফটি।

পঞ্চাশ ছুঁয়ে দ্রুত রান তোলার চেষ্টা করেন স্মিথ। সুন্দারের এক ওভারে দুই ছক্কার সঙ্গে মারেন চার। তবে অন্য প্রান্ত থেকে তেমন সমর্থন পাননি ছন্দে থাকা কিপার-ব্যাটসম্যান। প্রাসিধ কৃষ্ণার বলে আলগা শটে উইকেট দিয়ে আসেন ওকস।

ওই ওভারেই স্মিথের বিরুদ্ধে এলবিডব্লিউর আবেদনে সাড়া দেন আম্পায়ার শরফুদৌল্লা ইবনে শহীদ সৈকত। রিভিউ নিয়ে নিজের উইকেট বাঁচান স্মিথ। রিপ্লেতে দেখা যায়, মিডল স্টাম্পের ওপর দিয়ে চলে যেত বল।

দুই ওভার পর আকাশের ওপর চড়াও হন স্মিথ। পরপর দুই বলে চমৎকার পুল শটে মারেন ছক্কা। তৃতীয় বলে গতি কিছুটা কমিয়ে দেন আকাশ। তাতেই বিপত্তি স্মিথের। আগেই ব্যাট চালিয়ে ডিপ স্কয়ার লেগে ধরা পড়েন তিনি। ৫ উইকেট পূর্ণ হয় আকাশের।

প্রথম ইনিংসে ১৮৪ রানে অপরাজিত থাকা স্মিথ এবার করেন ৯ চার ও ৪ ছক্কায় ৯৯ বলে ৮৮ রান। ম্যাচে তার সংগ্রহ ২৭২ রান।

কিপার-ব্যাটসম্যানদের মধ্যে এক টেস্টে এর চেয়ে বেশি রানের রেকর্ড আছে শুধু জিম্বাবুয়ের কিংবদন্তি অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের- ২০০১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩৪১ ও ২০০০ সালে ভারতের বিপক্ষে ২৮৭ রান।

বাকি সময়টুকু ছিল ভারতের জয়ের আনুষ্ঠানিকতার অপেক্ষা। জশ টংকে ফেরান রাভিন্দ্রা জাদেজা। স্লিপে কার্সের ক্যাচ ছাড়েন লোকেশ রাহুল। মিড অনে ক্যাচ নিতে পারেননি সিরাজ। এলোমেলো কিছু শটে পরাজয়ের ব্যবধান কমান কার্স।

শেষ পর্যন্ত ম্যাচে ভারতের সেরা দুই ক্রিকেটারের যুগলবন্দীতেই সমাপ্তি ঘটে ইংল্যান্ডের ইনিংসের। আর নিশ্চিত হয় ভারতের ঐতিহাসিক জয়।

চার দিন বিরতি দিয়ে লর্ডসে আগামী বৃহস্পতিবার শুরু হবে সিরিজের তৃতীয় টেস্ট।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

ভারত ১ম ইনিংস: ৫৮৭

ইংল্যান্ড ১ম ইনিংস: ৪০৭

ভারত ২য় ইনিংস: ৪২৭/৬ ডিক্লে.

ইংল্যান্ড ২য় ইনিংস: (লক্ষ্য ৬০৮) (আগের দিন ৭২/৩) ৬৮.১ ওভারে ২৭১ (পোপ ২৪, ব্রুক ২৩, স্টোকস ৩৩, স্মিথ ৮৮, ওকস ৭, কার্স ৩৮, টং ২, বাশির ১২*; আকাশ ২১.১-২-৯৯-৬, সিরাজ ১২-৩-৫৭-১, কৃষ্ণা ১৪-২-৩৯-১, জাদেজা ১৫-৪-৪০-১, সুন্দার ৬-২-২৮-১)

ফল: ভারত ৩৩৬ রানে জয়ী

সিরিজ: পাঁচ ম্যাচ সিরিজে ১-১ সমতা

ম্যান অব দা ম্যাচ: শুবমান গিল