Published : 09 Jul 2025, 07:12 PM
প্রথম ১২ ইনিংসে একটি সেঞ্চুরি ছাড়া উল্লেখযোগ্য কিছু নেই। এক বছর ধরে খেলার সুযোগ পাননি টেস্ট ক্রিকেটে। অবশেষে সুযোগটা যখন এলো, দুহাতে লুফে নিলেন জন এডরিচ। ট্রিপল সেঞ্চুরির ইনিংস খেলে এমন দুটি রেকর্ডের জন্ম দিলেন, যা তাকে অমর করে রাখল টেস্ট ইতিহাসে।
ইংল্যান্ডের ইতিহাসের সবচেয়ে সাহসী ব্যাটসম্যানদের একজন বলা হয় তাকে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি করা ২৫ ব্যাটসম্যানের একজন এডরিচের সেই ইনিংসটি ছয় দশক আগের। নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে হেডিংলি টেস্টে অপরাজিত ৩১০ রানের ইনিংস খেলেছিলেন ৫২ চার ও ৫ ছক্কায়।
সুদীর্ঘ টেস্ট ইতিহাসে এক ইনিংসে সবচেয়ে বেশি চার, বাউন্ডারি (চার ও ছক্কা মিলিয়ে) থেকে সবচেয়ে বেশি রান- দুটি রেকর্ডই তিনি গড়েছিলেন ১৯৬৫ সালের জুলাইয়ে, যা টিকে আছে এখনও। ৮ জুলাই ম্যাচের প্রথম দিনে ১৯৪ রানে অপরাজিত ছিলেন এডরিচ। পরে ট্রিপল সেঞ্চুরি স্পর্শ করেছিলেন ৬০ বছর আগে আজকের দিনটিতে।
এডরিচের আরেকটি অর্জন আছে, যা তার কাছ থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না কখনোই। ইতিহাসের প্রথম ওয়ানডে ম্যাচটির ম্যাচ-সেরা তিনি। ইংল্যান্ড হারলেও ৮২ রানের ইনিংস খেলে ম্যান অব দা ম্যাচ হয়েছিলেন এই ওপেনার। তবে ক্রিকেট মাঠে তার সবচেয়ে স্মরণীয় কীর্তি ওই ট্রিপল সেঞ্চুরির ইনিংসটি।
তিন ম্যাচের ওই সিরিজের প্রথম দুই টেস্টে খেলার সুযোগ পাননি এডরিচ। সেই দুই ম্যাচে দলের ইনিংস শুরু করেন জেফ বয়কট ও বব বারবার। তৃতীয় ম্যাচে চোটের কারণে খেলতে পারেননি বয়কট ও তিন নম্বরে ব্যাট করা টেড ডেক্সটার। বাধ্য হয়ে ওপেনিংয়ে ফেরানো হয় এডরিচকে, প্রথম টেস্টে চার নম্বরে সেঞ্চুরি করা কিংবদন্তি কেন ব্যারিংটনকে নামানো হয় তিনে।
এই ম্যাচের আগে এডরিচের টেস্ট ক্যারিয়ারের ছবিটা খুব উজ্জ্বল ছিল না। ১৯৬৩ সালে তার অভিষেক ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে। ওয়েস হল ও চার্লি গ্রিফিথের মতো ফাস্ট বোলারদের সামনে অভিষেক সিরিজে তিনি ভালো করতে পারেননি। ৩ টেস্ট খেলে ৬ ইনিংসে করতে পারেন কেবল ১০৩ রান।
পরে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে তাকে বাদ দেওয়া হয় দল থেকে। ১৯৬৪ সালে ভারত সফরের দলে সুযোগ পেলেও গলার সংক্রমণের কারণে সিরিজের প্রথম তিন টেস্টে তিনি খেলতে পারেননি। শেষ দুই টেস্টে খেললেও উল্লেখ করার মতো কিছু করতে পারেননি বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান।
ওই বছরই ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজে বয়কটের চোটের কারণে দ্বিতীয় টেস্টের জন্য নির্বাচকরা অন্য একজন ওপেনার খুঁজতে বাধ্য হন। সুযোগটা পেয়ে যান এডরিচ। লর্ডসে ওই টেস্টে ক্যারিয়ারে প্রথম পঞ্চাশ ছুঁয়ে সেটিকে রূপ দেন সেঞ্চুরিতে। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে প্রথম ইনিংসে দলের ২৪৬ রানের মধ্যে তিনি করেন ১২০। কিন্তু হেডিংলি ও ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে পরের তিন ইনিংসে ব্যর্থ হন আবার। ওভালে সিরিজের শেষ টেস্ট থেকে তো বটেই, পরে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর থেকেও বাদ পড়েন তিনি।
হেডিংলিতে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে আলোচিত ম্যাচটির আগ পর্যন্ত এডরিচ ১২ ইনিংসে একটি সেঞ্চুরিতে ৩৪০ রান করতে পারেন কেবল ২৮.৩৩ গড়ে। ওই ম্যাচের আগে তিনি সবশেষ টেস্ট খেলেছিলেন প্রায় এক বছর আগে।
হেডিংলিতে টস জিতে ব্যাটিং নিয়ে ইংল্যান্ড শুরুতেই হারায় বারবারকে। তিন নম্বরে নেমে এডরিচের সঙ্গী হন ব্যারিংটন। গোটা দিনে আর কোনো উইকেট পড়তে দেননি তারা।
প্রথম রানের দেখা পেতে এডরিচের লেগেছিল ২৫ মিনিট। দিন শেষে ডাবল সেঞ্চুরি থেকে স্রেফ ৬ রান দূরে ছিলেন তিনি। ইংল্যান্ড প্রথম দিন শেষ করেছিল ১ উইকেটে ৩৬৬ রানে।
দ্বিতীয় দিনে ব্যারিংটন আউট হয়ে যান ১৬৩ রান করে। তাদের জুটিতে আসে ৩৬৯ রান। টেস্টে ওই সময়ে দ্বিতীয় উইকেটে চতুর্থ সর্বোচ্চ জুটি ছিল সেটি, এখন সপ্তম সর্বোচ্চ।
এডরিচ চালিয়ে যান ব্যাটিং। পৌঁছে যান ট্রিপল সেঞ্চুরিতে। তার দৃষ্টি নিশ্চয়ই ছিল গ্যারি সোবার্সের অপরাজিত ৩৬৫ রানের রেকর্ডে। কিন্তু দ্বিতীয় দিনে ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইক স্মিথ ইনিংস ঘোষণা করে দেন ৪ উইকেটে ৫৪৬ রানে।
প্রায় ৯ ঘন্টা ক্রিজে থেকে ৪৫০ বলে ৫২ চার ও ৫ ছক্কায় ৩১০ রানে অপরাজিত থাকেন এডরিচ। পরে ম্যাচটি ইনিংস ও ১৮৭ রানে জিতে নেয় ইংল্যান্ড। নিউ জিল্যান্ড দুই ইনিংস মিলিয়ে করতে পারে এডরিচের চেয়ে মাত্র ৪৯ রান বেশি!
১৪৮ বছরের টেস্ট ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত আর কোনো ব্যাটসম্যান এক ইনিংসে চারের ফিফটি ছুঁতে পারেননি।
বুলাওয়ায়োতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্টে গত সোমবার অপরাজিত ৩৬৭ রানের ইনিংসে ৪৯টি চার মেরে এই তালিকায় দুইয়ে আছেন ভিয়ান মুল্ডার। দক্ষিণ আফ্রিকার ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক লাঞ্চ বিরতির সময় ইনিংস ছেড়ে না দিলে হয়তো এডরিচের রেকর্ডটি ভাঙতেও পারতেন তিনি!
মুল্ডারের আগে গত ছয় দশকে এডরিচের সবচেয়ে কাছাকাছি যেতে পারেন ভিরেন্দার শেবাগ। ২০০৬ সালে লাহোরে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২৫৪ রানের ইনিংসে ৪৭টি চার মারেন ভারতীয় ওপেনার।
এডরিচ যার রেকর্ড ভেঙেছিলেন, সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে বিবেচিত সেই স্যার ডন ব্র্যাডম্যান এখন এই তালিকায় চার নম্বরে আছেন। ১৯৩০ সালে হেডিংলিতেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ক্যারিয়ার সেরা ৩৩৪ রানের ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তির ব্যাট থেকে এসেছিল ৪৬টি চার।
১৯৯৪ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অ্যান্টিগায় ব্রায়ান লারার ৩৭৫ রানের ইনিংসে চার ছিল ৪৫টি। ২০০১ সালে কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ফলো-অনে পড়ে ভিভিএস লাক্সমানের সেই মহাকাব্যিক ২৮১ রানের ইনিংসে চার ছিল ৪৪টি।
এডরিচ ৩১০ রানের ইনিংসে শুধু চার ও ছক্কা থেকেই করেন ২৩৮। বাউন্ডারি থেকে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডেও তার ধারেকাছে কেউ নেই।
এখানেও এডরিচের সবচেয়ে নিকটে মুল্ডার। প্রোটিয়া অলরাউন্ডারের অপরাজিত ৩৬৭ রানের ইনিংসে বাউন্ডারি থেকে আসে ২২০ (৪৯ চার ও ৪ ছক্কা)।
২০০৩ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৩৮০ রানের ইনিংসে বাউন্ডারি থেকে ২১৮ রান (৩৮ চার ও ১১ ছক্কা) করে এই তালিকায় তিন নম্বরে আছেন অস্ট্রেলিয়ান ওপেনার ম্যাথু হেইডেন।
এক ইনিংসে বাউন্ডারি থেকে দুইশ রান আছে আর কেবল দুজনের। ২০০২ সালে লাহোরে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ৩২৯ রানের ইনিংসে ইনজামাম-উল-হাক বাউন্ডারি থেকে করেন ২০৬ (৩৮ চার ও ৯ ছক্কা)। ২০০৯ সালে মুম্বাইয়ে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শেবাগের ২৯৩ রানের ইনিংসে বাউন্ডারি থেকে আসে ২০২ রান (৪০ চার ও ৭ ছক্কা)।
এডরিচের অপরাজিত ৩১০ রানের ইনিংসটি ওই সময়ে ছিল ইংল্যান্ডের চতুর্থ সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর, এখন ষষ্ঠ সর্বোচ্চ।
রেকর্ড ইনিংসটির কদিন পরই, লর্ডস টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার ফাস্ট বোলার পিটার পোলকের (সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন গ্রায়েম পোলকের ভাই ও টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি শন পোলকের বাবা) বাউন্সারে মাথায় আঘাত পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয় এডরিচকে।
সে যুগে গতিময় ফাস্ট বোলারদের সামনে হেলমেট ছাড়াই খেলতে হতো ব্যাটসম্যানদের। তাদের সামনে এডরিচ ছিলেন অকুতোভয় ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। প্রবল সাহস নিয়ে বুক চিতিয়ে লড়াই করতেন তিনি। ফাস্ট বোলারদের ডেলিভারিতে একাধিকবার তিনি মারাত্মক চোট পেয়েছিলেন।
কাউন্টি দল সারের হয়ে প্রথম পূর্ণাঙ্গ মৌসুমে তার হাতের আঙুল ভেঙে দেন ফ্রেড ট্রুম্যান ও ফ্রাঙ্ক টাইসন। টেস্ট ম্যাচে পাঁজরের দুটি হাড় ভাঙার পরও তিনি ব্যাটিং করেন অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত দুই ফাস্ট বোলার ডেনিস লিলি ও জেফ থমসনের বিপক্ষে।
এসব আঘাত সামলেই রানের সৌধ গড়েন এডরিচ। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৫৬৪ ম্যাচে ৪৫.৪৭ গড়ে তার রান ৩৯ হাজার ৭৯০। এর মধ্যে ৭৭ টেস্টে ৪৩.৫৪ গড়ে রান ৫ হাজার ১৩৮। ১০৩ সেঞ্চুরির ১২টি টেস্টে, যার ৭টি অ্যাশেজ সিরিজে।
১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত টানা ১০ টেস্টে পঞ্চাশ স্পর্শ করেন এডরিচ। এই কীর্তি গড়া প্রথম ব্যাটসম্যান তিনিই।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বোচ্চ স্কোরারের তালিকায় এডরিচ আছেন ১৯ নম্বরে। তবে বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে তার চেয়ে বেশি রান করতে পেরেছেন কেবল ফ্র্যাঙ্ক উলি ও ফিল মিড।
ইংলিশ প্রথম শ্রেণির মৌসুমে তিনবার সর্বোচ্চ স্কোরার ছিলেন এডরিচ। ১৯৬২ সালে ৫১ গড়ে করেন ২ হাজার ৪৮২ রান, ১৯৬৫ সালে ৬২ গড়ে ২ হাজার ৩১৯ রান ও ১৯৬৯ সালে প্রায় ৭০ গড়ে ২ হাজার ২৩৮ রান।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তিনি ১৯৭৭ সালের জুলাইয়ে, ওভালে সারের হয়ে ডার্বিশায়ারের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে শূন্য রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে তিন অঙ্ক ছুঁয়ে পৌঁছে যান একশ সেঞ্চুরির ঠিকানায়।
নরফোকের বিখ্যাত ক্রিকেট পরিবারের কনিষ্ঠতম সদস্য এডরিচ। তার চার চাচাতো ভাই- বিল এডরিচ, এরিক এডরিচ, জেফ এডরিচ, ব্রায়ান এডরিচ, সবাই খেলেছেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে। এই চার জন আপন ভাই। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত যিনি, সেই বিল ইংল্যান্ডের হয়ে টেস্ট খেলেছেন ৩৯টি। মিডলসেক্সের হয়ে সমৃদ্ধ প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ার তার, ২১ বছরের বড় বিলের সঙ্গে যেন তুলনা না হয়, তাই জন এডরিচ বেছে নেন সারেকে।
পরে তিনি হয়ে ওঠেন সারের কিংবদন্তি। তাদের হয়ে দুই দশকের অধ্যায়ে ৪৬.০৭ গড়ে ৮১ সেঞ্চুরিতে করেন ২৯ হাজার ৫০৩ রান। কাউন্টি দলটির হয়ে তার চেয়ে বেশি রান আছে কেবল তিন জনের।
পাঁচ মৌসুম সারের অধিনায়ক ছিলেন এডরিচ। একটি টেস্টে নেতৃত্ব দেন ইংল্যান্ডকে। ওই টেস্টে এডরিচ অধিনায়কত্বটা পেয়েছিলেন ঘটনাচক্রে।
১৯৭৪-৭৫ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়ায় অ্যাশেজ সিরিজের জন্য অধিনায়ক মাইক ডেনেসের ডেপুটি করা হয় এডরিচকে। ব্রিজবেনে প্রথম টেস্টে লিলির বলে এডরিচের হাত ভেঙে যায়। প্রথম তিন টেস্টে বাজে ফর্মের কারণে (৬ ইনিংসে ৬৫) সিডনিতে চতুর্থ টেস্ট থেকে ডেনেস নিজেকে সরিয়ে নিলে অধিনায়কত্ব পান এডরিচ। নেতৃত্বের অভিষেকে স্বভাবজাত লড়াইয়ে তিনি করেন ১৭৭ বলে ৫০ রান।
ম্যাচের চতুর্থ ইনিংসে ইংল্যান্ডের সামনে লক্ষ্য ছিল ৪০০ রানের। ম্যাচ বাঁচাতে তাদের কাটিয়ে দিতে হতো সাড়ে আট ঘন্টা। তবে প্রচণ্ড ঝড়ের কারণে ইনিংস শুরুর আগেই নষ্ট হয়ে যায় ৯৫ মিনিট। চতুর্থ দিনে ১১ ওভার কাটিয়ে দিয়ে অপরাজিত রয়ে যান দুই ওপেনার ডেনিস অ্যামিস ও ডেভিড লয়েড।
শেষ দিনে ষোড়শ ওভারে বিনা উইকেটে ৬৮ থেকে ২২তম ওভারে ইংল্যান্ডের স্কোর হয়ে যায় ৩ উইকেটে ৭৪। এরই মাঝেই প্রথম বলে লিলির ডেলিভারিতে পাঁজরের নিচের দিকে আঘাত পেয়ে হাসপাতালে যেতে হয় এডরিচকে।
তবে সিরিজ বাঁচিয়ে রাখতে হাসপাতাল থেকে ফিরে মাঠে নেমে যান তিনি। ভাঙা পাঁজর নিয়ে শ্বাস নিতে সমস্যা হলেও ২২ গজে চালিয়ে যান লড়াই। দলের স্কোর তখন ৬ উইকেটে ১৫৬। সেখান থেকে হয়ে যায় ৮ উইকেটে ১৭৫। নবম উইকেটে বব উইলিস ও দশম উইকেটে জেফ আর্নল্ডের সঙ্গে জুটিতে মাটি কামড়ে উইকেটে পড়ে থেকে স্মরণীয় এক ড্রয়ের সম্ভাবনা জাগান এডরিচ।
কিন্তু পারেননি অল্পের জন্য, দিনের ৪৩ বল বাকি থাকতে ২২৮ রানে অলআউট হয় ইংল্যান্ড।
লিলি-থমসনদের আগুনের গোলা সামলে আড়াই ঘন্টার বেশি সময় উইকেটে থেকে ৩৩ রানে অপরাজিত রয়ে যান এডরিচ। উইলিস ৮৮ মিনিট ও আর্নল্ড ৩৫ মিনিট উইকেটে ছিলেন।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সব মিলিয়ে ৩২ টেস্টে ৭ সেঞ্চুরি ও ১৩ ফিফটিতে ৪৮.৯৬ গড়ে এডরিচ করেন ২ হাজার ৬৪৪ রান। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তার চেয়ে বেশি টেস্ট রান আছে মোটে সাত জনের। তবে দলটির বিপক্ষে কখনও শূন্য রানে আউট না হয়ে তার চেয়ে বেশি রান করতে পারেননি আর কেউ।
অ্যাশেজে ইংল্যান্ডের পঞ্চম সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক তিনি।
তর্কাতীতভাবে তার সেরা সময়টাও এক অ্যাশেজ সিরিজেই। ১৯৭০-৭১ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইংল্যান্ডের ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জয়ে তিনি বড় অবদান রাখেন ২ সেঞ্চুরিতে ৭২ গড়ে ৬৪৮ রান করে। ১৯৫৪-৫৫ মৌসুমের পর সেবারই প্রথম অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জয়ের স্বাদ পায় ইংল্যান্ড।
ওই সিরিজের মাঝেই ইতিহাসের প্রথম ওয়ানডেতে ছাপ রাখেন এডরিচ। এই সংস্করণে প্রথম বাউন্ডারি, প্রথম ফিফটি, প্রথম ম্যাচ-সেরার স্বীকৃতি- সবগুলোই তার।
৫ ফুট ৮ ইঞ্চি লম্বা এডরিচ শারীরিকভাবে ছিলেন খুব শক্তিশালী। অফ সাইডে, বিশেষ করে কাট শট খেলায় ছিলেন বেশ পারদর্শী। লফটেড শটে ছক্কা মারতেন অনায়াসে।
তার টেস্ট অভিষেক হয়েছিল যেখানে, ১৩ বছর পর শেষ টেস্ট ম্যাচটিও খেলেন সেই ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেই। ইংল্যান্ডের জন্য ম্যাচটি ছিল ভুলে যাওয়ার মতো। ওয়েস্ট ইন্ডিজের শক্তিশালী পেস আক্রমণের সামনে দুই ইনিংসে ৭১ ও ১২৬ রানে গুটিয়ে ৪২৫ রানে হেরে যায় স্বাগতিকরা।
তবে অ্যান্ডি রবার্টস, মাইকেল হোল্ডিং ও ওয়েন ড্যানিয়েলের মতো ভয়ঙ্কর ফাস্ট বোলারদের সামনে ৩৯ বছর বয়সেও এডরিচ মেলে ধরেন সাহসী আর দৃঢ়তাপূর্ণ ব্যাটিং। প্রথম ইনিংসে এক ঘন্টা ৪৮ মিনিট উইকেটে থেকে ৬৯ বলে করেন ৮ রান, দ্বিতীয় ইনিংসে দুই ঘন্টা ২০ মিনিটে ১০০ বলে ২৪। আরেক ওপেনার, ৪৫ বছর বয়সী ব্রায়ান ক্লোজ দ্বিতীয় ইনিংসে দুই ঘন্টা ৪২ মিনিটে ১০৮ বলে করেন ২০ রান। ক্লোজও এরপর আর কখনও ইংল্যান্ডের হয়ে খেলেননি।
খেলা ছাড়ার পরেও ক্রিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এডরিচ। ইংল্যান্ডের নির্বাচক, পরে ব্যাটিং কোচ হিসেবে কাজ করেন তিনি। ছিলেন সারের সভাপতি।
২০০০ সালে ৬৩ বছর বয়সে তিনি লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হন। তখন চিকিৎসকরা বলেছিলেন, বড়জোর আর সাত বছর বাঁচবেন। তবে আরও বেশি সময় বেঁচেছেন তিনি। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে স্কটল্যান্ডে নিজ বাড়িতে তার মৃত্যু হয় ৮৩ বছর বয়সে।
তার মৃত্যুর পর ইংল্যান্ড ও ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) তৎকালীন প্রধান নির্বাহী টম হ্যারিসন বলেছিলেন, “জনের চলে যাওয়ায় আমরা এক অসাধারণ ও সাহসী ব্যাটসম্যানকে হারালাম।”
এডরিচকে তুলে ধরার জন্য এই একটি বাক্যই যথেষ্ট!