Published : 24 Aug 2026, 03:42 PM
জয়ের জন্য তখন দরকার ২ রান। শামীম হোসেনের ফিফটির জন্য প্রয়োজন ৫। ধারাভাষ্যকার বললেন, “ফিফটি করতে হলে ছক্কা মারতে হবে শামীমকে।” কিন্তু বোলার করে বসলেন ওয়াইড। শামীমের সমীকরণে অবশ্য বদল নেই। ছক্কাই লাগত তার। পরের ডেলিভারিতেই অফ স্টাম্পের বাইরের বল স্লগ করে আছড়ে ফেললেন তিনি নিজেদের ড্রেসিংরুমের সামনে! বিশাল ছক্কায় পূর্ণ হলো তার ফিফটি। দল পেল হ্যাটট্রিক জয়।
অস্ট্রেলিয়ায় টপ এন্ড টি-টোয়েন্টিতে টানা তিন দিনে তৃতীয় জয়ের স্বাদ পেল বাংলাদেশ হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) দল। এবার তারা ভিক্টোরিয়া ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন একাডেমিকে হারাল ৫ উইকেটে।
আগের দুই ম্যাচের মতো এ দিনও জয়ের ভিত গড়ে দেন বোলাররা এবং যথারীতি সেখানে সবচেয়ে উজ্জ্বল মোহাম্মদ রুবেল। প্রথম ম্যাচ থেকেই এই রহস্য স্পিনারের বলে খাবি খাচ্ছেন ব্যাটসম্যানরা। এই ম্যাচে চার ওভারে মাত্র ১৫ রান দিয়ে তার শিকার চার উইকেট এবং চারটিই বোল্ড! এর মধ্যে তিনটিতেই ব্যাটসম্যান কিছুই বুঝতে না পেরে আউট হন ভুল লাইনে খেলে।
চার উইকেট নিয়েই আসর শুরু করেছিলেন তিনি, পরের ম্যাচে নেন তিন উইকেট। তিন ম্যাচে ১১ উইকেট নিয়ে টুর্নামেন্টের সফলতম বোলার এই ৩০ বছর বয়সী স্পিনার, ওভারপ্রতি রান দিয়েছেন স্রেফ ৪.৮৩।
এই ম্যাচে অবশ্য স্পিনে একজন যোগ্য সঙ্গী পান তিনি। টুর্নামেন্টে প্রথম খেলতে নেমেই তিন উইকেট আদায় করে নেন বাঁহাতি স্পিনার রকিবুল হাসান। ভিক্টোরিয়া একাডেমি আটকে যায় ১৩১ রানে।
সেই রান তাড়ায় বাজে শুরুর পর বাংলাদেশ এইচপি ছিল প্রবল বিপদে। সেখান থেকে দলকে উদ্ধার করে জয়ের কাছে নিয়ে যায় ইরফান শুক্কুর ও শামীম হোসেনের ৮৩ রানের জুটি। জয় ধরা দেয় ১৬ বল বাকি রেখেই।
বাংলাদেশের দলটি আগের দুই ম্যাচ খেলেছিল ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে। মূল স্টেডিয়ামের পাশে মারারা ক্রিকেট গ্রাউন্ড ২-এ হয় এই ম্যাচটি। উইকেটে ঘাসের ছোঁয়া ছিল কিছুটা, ছিল বাউন্সও। বাংলাদেশের টপ অর্ডার অবশ্য ভেঙে পড়ে নিজেদের একের পর এক বাজে শটে।
রান তাড়ায় প্রথম ওভারে দুটি বল সাবধানে খেলার পর তৃতীয় বলটিতেই জায়গা বানিয়ে তেড়েফুঁড়ে মারার চেষ্টা করেন হাবিবুর রহমা সোহান। বল উঠে যায় কেবল ওপরে। ক্যাচ নেন কিপার। শূন্য রানে ফেরা ওপেনার আগের দুই ম্যাচে করেছিলেন ৪ ও ৭।
পরের দুই ওভারে নান্দনিক দুটি শটে ছক্কা মারেন তিনে নামা আরিফুল ইসলাম। কিন্তু আউট হওয়া শটটি ছিল ততটাই বাজে। বাঁহাতি পেসার হ্যারি হোকস্ট্রার বলে আলতো করে ব্যাট পেতে দিয়ে সহজ ক্যাচ দেন তিনি পয়েন্টে। আগের দিনও আলতো শটে আউট হয়েছিলেন তিনি।
জিসান আলম তখনও পর্যন্ত ছিলেন শান্ত। পঞ্চম ওভারে আক্রমণে আনা হয় স্পিনার। একটু শর্ট বল পেয়ে মিড উইকেটের ওপর দিয়ে উড়িয়ে দেন তিনি। বাঁহাতি স্পিনার আয়ান শার্মা পরের বলটি করেন একই লেংথে, শুধু গতি একটি কমিয়ে। ব্যস, আবার একই জায়গা দিয়ে ছক্কার চেষ্টায় সীমানায় ধরা পড়েন জিসান।
আগের ম্যাচে ফিফটি করে দল থেকে উদ্ধার করা সাব্বির রহমান এবার বিদায় নেন দলকে আরও বিপদে ফেলে। বাঁহাতি রিস্ট স্পিনার ক্যালাম স্টোর দ্বিতীয় বলেই সুইপের চেষ্টায় বোল্ড হন অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান। আউট হওয়ার আগেও তিনি খেলতে পারেননি স্বচ্ছন্দে। ১৪ বল খেলে করতে পারেন স্রেফ ৫ রান।
অষ্টম ওভারে বাংলাদেশ এইচপির রান তখন ৪ উইকেটে ৩৭।
বিপদ আরও বাড়তে পারত, যদি জীবন না পেতেন ইরফান। তিন রানে তার ক্যাচ মুঠোয় জমিয়েও ফেলে দেন স্যাম এলিয়ট। জীবন পেয়ে বাংলাদেশ এইচপি অধিনায়ক জুটি গড়ে তোলেন শামীমের সঙ্গে।
পাল্টা আক্রমণের শুরুটা করেন শামীম। আগের ম্যাচে মিইয়ে থাকা (২৩ বলে ১৬) ব্যাটসম্যান এই ম্যাচে ছিলেন আপন রূপে। ক্রিজে যাওয়ার পরপরই উইল সাদারল্যান্ডকে চার মারেন কাট করে, ছক্কা মারেন ফ্লিক করে।
প্রথম ১২ বলে ৭ রান করা ইরফানও পরে দারুণ কিছু শটে খেলেন। সাদারল্যান্ডকেই ছক্কা মারেন তিনি টানা দুই বলে।
৩২ বলে ৪৩ করে ইরফান আউট হন বড় শটের চেষ্টায়। তবে জয় তখন কেবল সময়ের ব্যাপার। আব্দুল গাফফার সাকলাইনকে নিয়ে বাকি কাজ অনায়াসেই শেষ করেন শামীম। ২ চার ও ৩ ছক্কায় অপরাজিত থাকেন তিনি ৩৩ বলে ৫১ রান করে।
শেষের মতো বাংলাদেশ এইচপির শুরুটাও ছিল দারুণ। দ্বিতীয় ওভারে আক্রমণে এসে প্রথম বলেই উইকেট এনে দেন রুবেল। ক্যাম্পবেল কেলাওয়ে ভেবেছিলেন পিচ করে বেরিয়ে যাবে বল, কিন্তু বাঁহাতি ব্যাটসম্যানকে রাউন্ড দা উইকেটে করা ডেলিভারিতে বল পিচ করে ঢুকে যায় ভেতরে। হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকেন অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট দলে ডাক প্রত্যাশী ওপেনার।
হুবুহু একইভাবে বোল্ড হন তিনে নাম বাঁহাতি লিয়াম ব্ল্যাকফোর্ড।
পাওয়ার প্লেতে স্রেফ ৩৭ রান তোলা ভিক্টোরিয়া একাডেমিকে আরও চেপে ধরেন রকিবুল। পাওয়ার প্লে শেষেই আক্রমণে এসে প্রথম ওভারে টানা দুই বলে দেখা পান উইকেটের। সীমানায় শামীমের হাতে ধরা পেড়র টম রজার্স। নতুন ব্যাটসম্যান হ্যারি ডিক্সন স্টাম্পড প্রথম বলেই।
চরম বিপদে পড়া দলকে এগিয়ে নেন সাদারল্যান্ড ও স্যাম হার্পার। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে দুটি ওয়ানডে খেলা অলরাউন্ডার সাদারল্যান্ড ২৫ বলে করেন ৩০ রান। রকিবুলের বলে দারুণ ক্ষিপ্রতায় স্টাম্পিং করেন ইরফান।
সেখান থেকে দলকে বলতে গেলে একাই টেনে নেন অধিনায়ক হার্পার। সপ্তদশ ওভারে আক্রমণে ফিরে রুবেল বোল্ড করে দেন হোকস্ট্রা ও অস্টিন আনলেজার্ককে।
ভিক্টোরিয়া একাডেমির রান তখন ৯ উইকেটে ১০৪। শেষ জুটিতে দারুণ কিছু শট খেলে দলকে ১৩০ পার করান হার্পার। শেষ পর্যন্ত আউট হন তিনি ৩৬ বলে ৪৯ করে।
সেই পুঁজিতে লড়াই জমানোর ইঙ্গিত দিলেও শেষ পর্যন্ত পারেনি হার্পারের দল। আসরে প্রথম পরাজয়ের স্বাদ পায় তারা। ছুটতে থাকে বাংলাদেশ এইচপির জয়ের রথ।
টানা চতুর্থ দিনে বাংলাদেশ এইচপি পরের ম্যাচ খেলবে মঙ্গলবার। প্রতিপক্ষ অ্যাডিলেইড স্ট্রাইকার্স একাডেমি।
ভিক্টোরিয়া একাডেমি: ১৯.১ ওভারে ১৩১ (রজার্স ১৩, কেলাওয়ে ১, ব্ল্যাকফোর্ড ১১, সাদারল্যান্ড ৩০, ডিক্সন ০, হার্পার ৪৯, আয়ান ৫, এলিয়ট ১২, হোকস্ট্রা ১, আনলেজার্ক ০, স্টো ০*; আবু হায়দার ৪-০-২৬-০, রুবেল ৪-০-১৫-৪, সাকলাইন ৪-০-৩১-১, রিপন ৩.১-০-৩০-১, রকিবুল ৪-০-২৮-৩)।
বাংলাদেশ এইচপি: ১৭.২ ওভারে ১৩৬/৫ (সোহান ০, জিসান ৯, আরিফুল ১৫, সাব্বির ৫, ইরফান ৪৩, শামীম ৫১*, সাকলাইন ৬*; হোকস্ট্রা ৩-০-১৫-২, আনলেজার্ক ৩.২-০-২৫-০, সাদারল্যান্ড ৩-০-২৬-০, আয়ান ২-০-১৩-১, এলিয়ট ৩-০-২৯-১, স্টো ৩-০-২৬-১)।
ফল: বাংলাদেশ হাই পারফরম্যান্স দল ৫ উইকেটে জয়ী।