Published : 13 Apr 2026, 05:03 PM
নববর্ষ বরণের উৎসব ঘিরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে।
‘এসো প্রাণের উৎসবে, জাগো নব আনন্দে’—এ প্রতিপাদ্যে নববর্ষ উদযাপন করবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বর্ষবরণে থাকছে ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচসহ নানা বর্ণাঢ্য আয়োজন।
নববর্ষের প্রথম দিন মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্ট থেকে জারুলতলা পর্যন্ত ‘বৈশাখী শোভাযাত্রার’ মধ্য দিয়ে শুরু হবে দিনের আয়োজন। এরপর সকাল ১১টা থেকে জারুলতলায় বৈশাখী মঞ্চে হবে আলোচনা সভা।
দুপুর ১২টা থেকে বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম ঐতিহ্য পুতুল নাচ, বলী খেলা, কাবাডি খেলা ও বাউচি খেলা অনুষ্ঠিত হবে। দুপুর ২টা থেকে শুরু হবে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও সংগীতানুষ্ঠান।
দিনব্যাপী আয়োজনের অংশ হিসেবে থাকছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী জীবনধারার নানা উপস্থাপনা, যেমন নাগরদোলা, পালকি, গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি ও বায়োস্কোপ প্রদর্শনী। পাশাপাশি পুরো দিনজুড়ে চলবে বিশেষ উদ্যোক্তা মেলা।
রোববার চারুকলা ইনস্টিটিউট ঘুরে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের কেউ বাঁশ-কাঠ দিয়ে শোভাযাত্রার উপকরণ তৈরি করছেন, কেউ আবার সেগুলোতে রঙ-তুলির শেষ আঁচড় দিচ্ছেন। চলছে পেঁচা, পাখি, ঘোড়াসহ নানা প্রতীকী চরিত্রের মুখোশ তৈরির কাজ।
ক্যাম্পাসজুড়ে রঙ, তুলির আঁচড় দেওয়ার ব্যস্ততায় তৈরি হয়েছে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। শিক্ষার্থীদের চোখে-মুখে উঁকি দিচ্ছে উৎসবের আগাম আনন্দের ঝিলিক।
চারুকলার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন, “ছোটবেলায় পহেলা বৈশাখ মানেই ছিল সকালে নতুন জামা পরে মেলায় যাওয়া, নাগরদোলায় চড়া। এখন চারুকলার শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা নিজেরাই সেই উৎসবটা নিজের হাতে তৈরি করছি।
“গত এক সপ্তাহ ধরে দিন-রাত মুখোশ, মুরাল আর শোভাযাত্রার সরঞ্জাম প্রস্তুতের কাজ করছি।”
তিনি বলছিলেন, “ক্লান্তি লাগে, কিন্তু যখন দেখি ধীরে ধীরে পুরো কাজটা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, তখন ভীষণ ভালো লাগে। মনে হয়, ছোটবেলার সেই আনন্দটাই এবার নিজের হাতে গড়ে তুলছি।”
পহেলা বৈশাখ উদযাপন কমিটির আহবায়ক উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক কামাল উদ্দিন বলেন, “পহেলা বৈশাখ আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির অংশ—এখানেই আমাদের আনন্দের জায়গা।
“বিদেশি সংস্কৃতির তুলনায় আমাদের সংস্কৃতি আনন্দের এবং ভিন্ন। আমরা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির সেই আনন্দ আমরা সবাই মিলে ভাগাভাগি করে সর্বোচ্চভাবে উপভোগ করতে চাই।
মানুষ হিসেবে আমরা নানা উপায়ে আনন্দ পেতে চাই।”
স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলছিলেন, “আগে পহেলা বৈশাখে ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে সাপ খেলা, বানর নাচের মতো আয়োজন থাকত। তবে আমরা কোনো প্রাণীকে কষ্ট দিতে চাই না।
“সে বিবেচনা এসবের পরিবর্তে আমাদের এবারের আয়োজনে থাকছে কাবাডি খেলা, বলী খেলা, পুতুল নাচ, বউচি খেলা ও নাগরদোলার মতো বিষয়গুলো। সাংস্কৃতিক বিনির্মাণে আমরা দেশীয় সংস্কৃতিকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি।”
এই অধ্যাপক বলেন, এবারের আয়োজনে আলোকসজ্জার দিক থেকে কিছুটা সংযম রাখা হচ্ছে। সরকারের নির্দেশনা এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে আলোকসজ্জা সীমিত করা হয়েছে।
“আমরা একটি টেকসই ও সবুজ উপায়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করতে চাই।”
চারুকলা ইনস্টিটিউটের পরিচালক তাসলিমা আকতার বলেন, “চারুকলা ইনস্টিটিউট মূল ক্যাম্পাসে ফিরে আসায় এ বছর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও চারুকলা ইনস্টিটিউট যৌথভাবে, কেন্দ্রীয়ভাবে বৈশাখ উদযাপন করছে।
“আমাদের শিক্ষার্থীরা গত সপ্তাহ থেকেই প্রস্তুতির কাজ শুরু করে দিয়েছে।”
এবার চারুকলা ইনস্টিটিউট একটি সেমিনারের আয়োজন করেছে তুলে ধরে তিনি বলেন, “বৈশাখের বিশেষ আয়োজনে থাকছে আলপনা ও মুরাল। শোভাযাত্রায় থাকবে মুখোশ, পাখি, কাঠের ঘোড়া এবং ইলিশ মাছ—যা আমাদের ঐতিহ্যকে তুলে ধরবে।”
শিক্ষার্থীরা আগ্রহ ও উদ্দীপনার পাশাপাশি অন্য বিভাগের শিক্ষকদের সহযোগিতার বিষয়টি তুলে ধরে তাসলিমা আকতার বলেন, “এ পর্যন্ত আমরা কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হইনি। তবে সামনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরেকটু বেশি সহায়তা পেলে শিক্ষার্থীরা আরও বেশি উদ্দীপনা নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে পারবে।”
শিল্পী রশিদ চৌধুরী হোস্টেল সংসদের ভিপি খন্দকার মাশরুর আল ফাহিম বলেন, “দীর্ঘ ১৫ বছর আন্দোলন-সংগ্রামের পর চারুকলা ইনস্টিটিউট বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে ফিরে এসেছে। ফিরে আসার পর এটি আমাদের প্রথম বৈশাখ আয়োজন।
“এবারের বৈশাখ আয়োজনে থাকছে শোভাযাত্রার জন্য স্বরা, মুখোশ, ডামি ইত্যাদি। পাশাপাশি থাকছে মুরাল, যা প্রতি বছর থাকত না—এবার সেটিও যুক্ত হয়েছে। এছাড়া থাকছে আলপনা, যা চারুকলা ক্যাম্পাসে আসার আগে এভাবে নিয়মিত হতো না। আলপনা ও মুরালের মাধ্যমে আমরা আয়োজনের মাত্রা বাড়াতে পেরেছি, যা আমাদের কাছে খুবই ভালো লাগছে।”
প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি বলেন, মুরালের রঙের কাজ এবং আলপনার কাজ এখনও বাকি আছে, যা বৈশাখের আগের দিন শেষ হবে। বাকি প্রায় সব প্রস্তুতিই ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।