১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ডাকসু নির্বাচন: সেই তন্বিকে ‘জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে’ বিভিন্ন প্যানেল

‘তন্বি আমাদের জুলাইয়ে জ্বলে ওঠা বিক্ষোভের উৎস; সে আমাদের জুলাইয়ে গর্জে ওঠা প্রতিরোধের অনুপ্রেরণা,” বলেন গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের আব্দুল কাদের।

আরফাতুল ইসলাম নাইম আরফাতুল ইসলাম নাইম

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 28 Jul 2026, 07:32 PM

Updated : 11 Sep 2026, 05:23 PM

পিঠে ব্যাগ, হাতে লাঠি, চশমা পরা মুখমণ্ডলে রক্ত আর বেদম মারধরে জড়োসড়ো হয়ে যাওয়া যে তরুণীর ছবি জুলাই আন্দোলনের ‘মোড় ঘুরিয়েছিল’, সেই সানজিদা আহমেদ তন্বি প্রার্থী হয়েছেন এবারের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে (ডাকসু)।

চব্বিশের আন্দোলনে ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন তিনি।

রক্তাক্ত তন্বির ছবিটি তখন নাড়িয়ে দেয় সবাইকে। তাতে আন্দোলন গতি পায়। পরবর্তীতে ব্যাপক সহিংসতা, প্রাণহানির মধ্যে দিয়ে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের এ শিক্ষার্থী ডাকসু নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্যানেলে ‘গবেষণা ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক’ প্রার্থী হওয়ায় তাকে ‘সম্মান’ জানাচ্ছে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও প্যানেল। তন্বির পদে কাউকে প্রার্থী করছে না প্যানেলগুলো। একটি সংগঠন সেই পদে শুরুতে প্রার্থী দিলেও পরে সরিয়ে নিয়েছে।

ছাত্র সংগঠনগুলো বলছে, সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়ানোর তন্বির ছবিটি জুলাই আন্দোলনে আগের সরকারের দমন-পীড়নের স্মৃতি বহন করছে। আন্দোলনে বেদম মারধরের শিকার তন্বির প্রতি তারা ‘সম্মান রেখেই’ তার পদে কোনো প্রার্থী দিচ্ছে না।

আর নির্বাচনি প্যানেলগুলোর এমন কার্যক্রমের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের ২০১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী তন্বি। গবেষণায় নিজের আগ্রহ থেকেই ‘গবেষণা ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক’ পদে লড়তে চাইছেন। শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করতে চান তিনি।

ডাকসু নির্বাচনে তন্বির পদে কোনো প্রার্থী দেয়নি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ সমর্থিত প্যানেল ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন, বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর প্যানেল ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’, জামালুদ্দীন মুহাম্মাদ খালিদ ও মাহিন সরকারের নেতৃত্বে ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ’ এবং তিন বাম ছাত্রসংগঠনের প্যানেল ‘অপরাজেয় ৭১-অদম্য ২৪’।

বুধবার দুপুরে অপরাজেয় বাংলার সামনে সংবাদ সম্মেলন নিজেদের প্যানেল ঘোষণার সময় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, “পদটিতে তন্বির সম্মানে তাদের সংগঠনের কাউকে রাখা হয়নি। একইসঙ্গে তাকে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে তাকে পূর্ণ সমর্থন করছি।”

সোমবার গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক আব্দুল কাদের ফেইসবুক পোস্টে তাদের প্যানেল থেকে ‘গবেষণা ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক’ পদে কাউকে না রাখার ঘোষণা দেন।

তিনি লেখেন, “তন্বি আমাদের জুলাইয়ে জ্বলে ওঠা বিক্ষোভের উৎস। তন্বি আমাদের জুলাইয়ে গর্জে ওঠা প্রতিরোধের অনুপ্রেরণা। তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমাদের সমর্থিত প্যানেলে ‘গবেষণা ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক’ পদটি শূন্য রাখা হয়েছে এবং তন্বির প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন থাকবে।”

‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ এর থেকে জিএস পদপ্রার্থী মেঘমল্লার বসু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তন্বি আমাদের জুলাই যুদ্ধের ‘সিম্বল’। আমরা তার সম্মানে এ পদ থেকে আমাদের প্রার্থী সরিয়ে নিয়েছি।”

‘সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেল থেকেও ওই পদে কাউকে মনোনয়ন না দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন (একাংশ), সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (বাসদ) এবং ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’ (বিসিএল) সমন্বয়ে গঠিত ‘অপরাজেয় ৭১-অদম্য ২৪’ প্যানেলেও সেই পদে কাউকে রাখা হয়নি। বুধবার দুপুরে মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলনে এ প্যানেল থেকে ছাত্র ইউনিয়ন একাংশের সভাপতি মাহির শাহরিয়ার রেজা তাকে সমর্থন দেওয়ার কথা বলেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা ফেইসবুক পোস্টে তন্বিকে শুভকামনা জানিয়েছেন। তবে তার স্বতন্ত্র প্যানেলে ‘গবেষণা ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক’ পদে কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হবে কি না, সেটি নিশ্চিত নয়।

তবে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটে’ সাজ্জাদ হোসাইন খান ও ছাত্র অধিকার পরিষদের প্যানেলে সিয়াম ফেরদৌস ইমন ‘গবেষণা ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক’ পদে নির্বাচন করবেন।

তন্বি তার পদে মনোয়নপত্র জমা দিয়েছেন মঙ্গলবার। নির্বাচনে লড়াইয়ে ‘গবেষণা ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক’ পদ বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে নিজের আগ্রহ ও অভিজ্ঞতার কথা বলছেন এ শিক্ষার্থী।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “গবেষণায় শিক্ষার্থীদের জন্য ফান্ডিং নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের গবেষণায় আগ্রহী করার জন্য বিভিন্ন জার্নালের অ্যাক্সেস দেওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ডিংয়ের বাইরে করপোরেট, অ্যালামনাই বা এনজিওর সঙ্গে সমন্বয় করে গবেষণা ফান্ডিং আনা, ভালো মানের গবেষণার ক্ষেত্রে স্বীকৃতির ব্যবস্থা করা ও সভা-সেমিনারের মাধ্যমে তাদেরকে উৎসাহ প্রদান করে গবেষণাকে শিক্ষার্থীদের কাছে আগ্রহের জায়গা হিসেবে তৈরির সর্বোচ্চ চেষ্টা করব আমি।

“সার্বিকভাবে গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো শুরু করা এবং সে অনুযায়ী কাজ করাই আমার লক্ষ্য।”

তার পদে বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থী না দেওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, “যেসব সংগঠন আমাকে সম্মান জানিয়েছে, আমাকে এই পদের জন্য যারা যোগ্য মনে করেছে ও আমার ওপরে বিশ্বাস রেখেছে যে আমি এই পদে নির্বাচিত হলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারব, তাদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

“আমি শিক্ষার্থীদের ভোটে জিততে চাই। তাদের হয়ে কাজ করতে চাই।”

তন্বি বলেন, “আমি নিজেকে এই পদে যোগ্য মনে করছি, কারণ গবেষণায় আমার তীব্র আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমার স্নাতক পর্যায়ের একটি রিসার্চ পেপার এরই মধ্যে নামকরা একটি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশের অপেক্ষায়। মাস্টার্সেও বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমার গবেষণার কাজ চলমান। এরই মধ্যে এই রিসার্চটি জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপের জন্য সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত হয়েছে।

“এসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমি শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করতে চাই। আপনাদের সবার সহযোগিতা পেলে আমি আমার লক্ষ্য পূরণ করতে পারব।”

কোনো রাজনৈতিক সংগঠন বা দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিনা- এমন প্রশ্নে তন্বি বলেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক সংগঠন বা দলের সঙ্গে যুক্ত নন।

স্নাতকে ভালো সিজিপিএ রয়েছে তার; ফলাফলে ব্যাচের তৃতীয়।