Published : 23 Aug 2026, 05:50 PM
সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর ওপর নির্যাতনের দিবসে বেশিরভাগ আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকল বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘিরে।
কালো দিবসে উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীর বক্তব্যে এমনটাই দেখা গেছে।
রোববার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি অডিটোরিয়ামে এ আলোচনা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।
রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যে ২০০৭ সালের শুরুতে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশে জরুরি অবস্থা জারির কয়েক মাস পর ২০ অগাস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেশিয়ামে কয়েক সেনা সদস্যের সঙ্গে ছাত্রদের সংঘর্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আন্দোলনে নেমেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা।
বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশ চড়াও হলে রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
টানা তিনদিন আন্দোলনের পর ২৩ অগাস্ট ছাত্রদের হলত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষক এবং আটজন ছাত্রকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি সারা দেশে শিক্ষার্থীদের উপর নির্যাতন চালানো হয়।
পরে ছাত্র-শিক্ষকদের ধারাবাহিক আন্দোলনের মুখে মুক্তি পান কারাবন্দি ছাত্র-শিক্ষকরা। পরের বছর থেকেই ২৩ অগাস্টকে ‘কালো দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা।
উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেছেন, “খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে নিজেদের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে চেয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
“তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়া, যা মাইনাস টু ফর্মুলা হিসেবে পরিচিত ছিল।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেন, “আমরা ২০০৯ সাল থেকে প্রতি বছর ২৩ অগাস্ট দিনটিকে কালো দিবস হিসেবে পালন করে আসছি। ২০০৭ ও ২০০৮ সাল আমাদের কাছে অত্যন্ত বিভীষিকাময় ছিল।
“তৎকালীন মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দিনের আমল হিসেবে পরিচিত সেই সময়ে, ২০০৭ সালের ২০ অগাস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছিল।”
তিনি বলেন, “আমরা সেই সময়ের ভয়াবহ দিনগুলো এখনো ভুলিনি। আমি তখন শিক্ষক সমিতির কোষাধ্যক্ষ এবং পরবর্তীতে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম।
“আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকার কারণে একজন মেজর লেভেলের অফিসার এসে আমার অফিসে আমাকে ভয়ভীতি দেখান এবং এক প্রকার জোর করেই ধরে নিয়ে যান। শিক্ষকদের সাথে তাদের আচরণ ছিল অত্যন্ত অপমানজনক।”
অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়া, যা মাইনাস টু ফর্মুলা হিসেবে পরিচিত ছিল।
“তারা চেয়েছিল খালেদা জিয়া ও তার সন্তানদের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে নিজেদের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে।”
তিনি বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এমন এক জায়গা, যেখানে কখনো কোনো অন্যায় মেনে নেওয়া হয় না। গায়ের জোরে এখানে কেউ টিকে থাকতে পারেনি। ১৯৫২, ১৯৭০, ১৯৭১ কিংবা ১৯৯০—সবসময়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে।”
২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রসঙ্গে অধ্যাপক ওবায়দুল বলেন, “তারা ভেবেছিল এবারও হয়তো পার পেয়ে যাবে, কিন্তু ছাত্র-শিক্ষকদের আন্দোলনের মুখে তারা দুই বছরের মাথায় নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়।
“যদিও সেই নির্বাচনে তারা তাদের পছন্দের লোকজনকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গায়ে তারা যে আঘাত করেছিল তা আমরা ভুলব না।”
বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গ টেনে উপাচার্য বলেন, “আমরা ২০২৪ সালেও দেখেছি কীভাবে অগণতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলন দমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। খালেদা জিয়াকে যখন (২০০৮ সালে) দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হয়েছিল, তখন তিনি আপসহীনভাবে বলেছিলেন—‘এই দেশ ছাড়া আমার আর কোনো জায়গা নেই, মরতে হলে এই দেশেই মরব’। তার এই দৃঢ়তার কারণেই তিনি ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ উপাধি পেয়েছেন।”
২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার মধ্যে গ্রেপ্তার হন খালেদা জিয়া এবং তার বড় ছেলে তারেক রহমান। এক বছর পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পান বিএনপি চেয়ারপারসন।
তারেকও মুক্তি পেয়ে লন্ডনে চলে যান। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফেরেন।
জিয়া-খালেদা দম্পতির আরেক সন্তান আরাফাত রহমান কোকো প্রয়াত হয়েছেন ২০১৫ সালে।
জরুরি অবস্থার মধ্যে খালেদা জিয়া যখন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ হাসিনাও কাছাকাছি সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তিনি মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশ গেলেও খালেদা জিয়া যেতে অস্বীকৃতি জানান।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রসঙ্গে অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “তারেক রহমানের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়েছে, এমনকি তার কোমর ভেঙে দেওয়া হয়েছিল।
“আরাফাত রহমান কোকোকে স্লো পয়জনিংয়ের মাধ্যমে হত্যার অভিযোগও রয়েছে। এত নির্যাতনের পরেও তারা আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। সত্যের জয় সবসময়ই হয়। মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দিনের সেই কালো এজেন্ডা সফল হয়নি।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেন, “আজকের একটি পত্রিকার রিপোর্টে দেখলাম, বর্তমান সরকারের জনপ্রিয়তা যেখানে ৫৪ পার্সেন্ট, সেখানে রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যে তারেক রহমানের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ৬৬ পার্সেন্ট। এতেই বোঝা যায় দেশের মানুষ কাকে ভালোবাসে। মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দিনরা সফল হয়নি এবং ভবিষ্যতেও কেউ সফল হবে না।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, “২০০৭ এর ২০-২৩ অগাস্টে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ছাত্র নির্যাতন, সেই নির্যাতনই কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দাবিয়ে রাখার এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা তৎকালীন সরকারের উদ্দেশ্য ছিল।
“সেই আওয়ামী তল্পিবাহক ফ্যাসিস্ট সরকারের পালিয়ে যাওয়া তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী—আমি তার নাম উচ্চারণ করতে চাই না—তখন ঘোষণা করেছিলেন, এটা তাদের আন্দোলনের ফসল। সেই আন্দোলনের ফসল ফখরুদ্দিন সরকার পরবর্তীতে তার গর্ভে যে সরকার জন্ম দিয়েছিল, সেই ফ্যাসিস্ট সরকার বিগত ১৫ বছর কীভাবে নির্যাতন নিপীড়ন করেছে।”
তিনি বলেন, “২০০৭-এ তখন মাইনাস টু ফর্মুলার আড়ালে আসলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী শক্তি, একটি দল এবং তার পরিবারকে, জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ধ্বংস করার তার যে অপচেষ্টা ছিল; সেটাই ছিল এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আক্রমণের সাথে আমি তার যোগসূত্র মেলাতে চাই।
“আমরা বলতে চাই, ওই ধারাবাহিকতায় সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সেই যে কারা নির্যাতন, সেটা শেষ পর্যন্ত উনি কারাগারেই ছিলেন। বর্তমান মাননীয় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (তারেক রহমান), রিমান্ডে নিয়ে তার মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আরেক সন্তান মরহুম আরাফাত রহমান কোকো কী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, পরবর্তীতে তিনি ইন্তেকাল করেন।”
অধ্যাপক আলফেছানী বলেন, “ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে কীভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, সেটা দেশবাসী দেখেছে, বিশ্ববাসী দেখেছে। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এত নির্যাতনের পরও উনি বলেছেন, ‘প্রতিহিংসা যদি আমার মধ্যে থাকে, আমি যদি এর বিচার করি, তাহলে কি আমার পিঠের ব্যথা কমবে?’ তো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শক্তি সেই দল, যার হাতে বাংলাদেশ নিরাপদ, দেশের গণতন্ত্র নিরাপদ।
“আমি বিশ্বাস করি, আজকের এই আগস্টের আলোচনার মাধ্যমে আমাদের সেই স্পিরিট জাগবে, যে স্পিরিটের মাধ্যমে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কখনো দমানো যায় না। দেশের যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে এখানকার ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সাথে সাথে সারা বাংলাদেশ জেগে ওঠে।”
এ অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সালাম, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, প্রক্টর অধ্যাপক ইসরাফিল রতনসহ বিভিন্ন অনুষদের ডিন, প্রাধ্যক্ষ ও শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন।