Published : 31 Jul 2026, 10:47 AM
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরে সহকারী ফটোগ্রাফার হিসেবে এক ব্যক্তিকে দৈনিক ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যিনি উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তারা বলছেন, জনসংযোগ দপ্তরে ‘সহকারী ফটোগ্রাফার’ বলে কোনো অনুমোদিত পদ নেই। আবার এমন কোনো পদসৃজনও করা হয়নি। তাছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসএসসি পাসের নিচে কোনো নিয়োগের সুযোগ না থাকলেও এ ক্ষেত্রে অষ্টম শ্রেণি পাস ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
নিয়োগ পাওয়া মেয়র তালুকদার আর উপাচার্যের গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জে। গত ২৯ এপ্রিল তাকে খণ্ডকালীন সহকারী ফটোগ্রাফার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও পরে ১০ জুন দৈনিক ৫০০ টাকা হারে ‘নো ওয়ার্ক নো পে’ ভিত্তিতে তাকে নিয়োগের কথা বলা হয়। মেয়র তালুকদার উপাচার্যের সঙ্গে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন বলে নিয়োগের শর্তে বলা হয়েছে।
মোড়েলগঞ্জ বিএনপির নেতাকর্মীরা জানান, ২০২০ সাল থেকে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হোন অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তখন থেকে তার কর্মী হয়ে কাজ করেছেন মেয়র তালুকদার। সেই সুবাদে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলে অধ্যাপক ওবায়দুল উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হলে সেখানে তার ছায়াসঙ্গী ছিলেন মেয়র।
মেয়র তালুকদারের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
মোড়েলগঞ্জে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম সম্পৃক্ত হলে তার একনিষ্ঠ কর্মী হয়ে কাজ করেন মেয়র।
পদে পদে অনিয়মের অভিযোগ
কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, সহকারী ফটোগ্রাফার বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো পদ না থাকায় কাউকে নিয়োগ দিতে হলে ইউজিসি থেকে পদ সৃষ্টি করতে হবে। অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী পদ সৃজন করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক রেজিস্ট্রার বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন পদ সৃষ্টি করতে হলে সেটা মন্ত্রণালয় বা ইউজিসি থেকে করতে হবে।
“তবে খুব ইমার্জেন্সি যদি করতে হয়, সেটা সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে আবেদন করবে। সিন্ডিকেটে যাবে। সেখানকার সুপারিশে এ কাজ করা যেতে পারে। এটাই আমাদের রেওয়াজ।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক উপ-উপাচার্য বলেন, “অনেক সময় নিড ব্যাসিসে এক পদকে অন্য পদে কনভার্টও করা যায়। তবে সেটা সিন্ডিকেটের সুপারিশ সাপেক্ষে করা হয়।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সিন্ডিকেট সদস্য বলেন, “পদ ছাড়া এরকম কোনো নিয়োগ করা যায় না। এটা হয় পদ তৈরি করতে হবে, না হলে সিন্ডিকেট থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে করতে হবে। এরকম তো করার বিধান নাই।
“আর সহকারী ফটোগ্রাফার কোনো জরুরি পদ না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক ফটোগ্রাফার আছেন। উপাচার্যের যদি প্রয়োজন হয়, তিনি সেখান থেকে একজনকে সাথে রাখতে পারেন।”
জানতে চাইলে রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ বলেন, “মাননীয় উপাচার্য মহোদয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩ মোতাবেক, নির্বাহী ক্ষমতায় যে কাউকে মাস্টাররোলে নিয়োগ করতে পারেন।”
এক প্রশ্নের জবাবে রেজিস্ট্রার জানান, সহকারী ফটোগ্রাফার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মেয়র তালুকদারের শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ।
অষ্টম শ্রেণি পাস একজনকে সহকারী ফটোগ্রাফার পদে নিয়োগ দেওয়া যায় কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ বলেন, “মাস্টাররোলে নিয়োগে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখা হয় না।”
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সিন্ডিকেট সদস্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগে সিন্ডিকেটে একদম নির্দেশনা আছে—এসএসসি পাস ছাড়া কাউকে নিয়োগ করা যাবে না। এটা যদি হয়ে থাকে, তাহলে সেটা নিয়ম বহির্ভূত।”
কয়েক বছর ধরেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়য়ে দৈনিকভিত্তিক নিয়োগ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে আসছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। সেই নির্দেশনার পরও ঢাকাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন নিয়োগ চলছেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মচারী নিয়োগে সাধারণত বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। তবে মেয়র তালুকদারের ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ বলেছেন, “এ নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি। কেননা উপাচার্য মহোদয় যে কাউকে নিয়োগ করতে পারেন মাস্টাররোলে; এক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তি দিতে হয় না।”
তবে প্রশাসনিক এক কর্মকর্তা বলেন, “মাস্টাররোলে নিয়োগ দিলে অবশ্যই বিজ্ঞপ্তি দিতে হয়। তবে সেটা অনেকসময় খুব জরুরি প্রয়োজন হলে তখন ইন্টারনাল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। তবে বিজ্ঞপ্তি ছাড়া হয় না।”
যা বললেন উপাচার্য
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি তো তাকে সহকারী ফটোগ্রাফার নিয়োগ না, ফটোগ্রাফারের সহকারী নিয়োগ দিতে বলেছি।”
নিয়োগপত্রে তো সহকারী ফটোগ্রাফার লেখা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “এটা হয়তো ভুল হয়েছে। আমাকে আমার অফিস স্পষ্টভাবে অবগত করেনি। আমাকে তারা যথাযথভাবে নিয়মকানুন জানায়নি।”
মেয়র তালুকদারের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, “আমার এখানে তিনজন ক্যামেরাম্যান আছে। ক্যামেরাম্যান দুইজন থাকে বাইরে। আমার এখানে ক্যামেরাম্যান একজন আছে, যে ক্যাম্পাসে থাকে। অধিকাংশ সময় আমি যখন কোনো প্রোগ্রামে যাই, কাউকে নেওয়া সম্ভব হয় না। ইমার্জেন্সি ডাকলে কাউকে পাওয়া যায় না।
“তাই তাকে ডেইলি ব্যাসিসে নিয়োগ দিয়েছি। এক্ষেত্রে নিয়মের ব্যত্যয় হলে আমি রেজিস্ট্রার অফিসে কথা বলে ব্যবস্থা নিব।”
অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালনের আগে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে একই দায়িত্বে ছিলেন। তখনও যে মেয়র তালুকদার সঙ্গে ছিলেন তা উপাচার্য স্বীকার করেছেন।
এলাকার লোককে সহকারী ফটোগ্রাফার নিয়োগ করার বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “আমি তার দক্ষতা দেখেছি। এখন মোড়লগঞ্জের লোক কি চাকরি পাবে না? তার ক্যামেরার ওপর দক্ষতা আছে বলেই তাকে নিয়েছি।”
মেয়র তালুকদার ক্যামেরা নয়, ফোন দিয়ে ছবি তোলেন জানানো হলে তিনি বলেন, “সবাই ভালো ছবি তুলতে পারে না। তার ছবির মান ভালো।”
এক প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “আমি রেজিস্ট্রার অফিসে কথা বলব। যদি নিয়ম না থাকে, তবে আমি নিয়োগ বাতিল করব। আমি নিয়মের বাইরে কিছু করব না।”