১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ব্র্যাক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ ইউসিএসআইয়ের শিক্ষার্থীর, ফেইসবুকে আলোচনা

“যার বিরুদ্ধে অভিযোগ সেই নোটিস পাঠিয়েছে, আমি জবাব দিয়েছি। তারা স্ট্রাইক দিয়ে আমার ফেইসবুকের ভিডিওটিও নামিয়ে দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলছি। আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছি।”

ব্র্যাক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ ইউসিএসআইয়ের শিক্ষার্থীর, ফেইসবুকে আলোচনা
মানা বে ওয়াটার পার্কের ছবি।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 31 Jul 2026, 11:07 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:45 PM

বন্ধুরা মিলে ঘুরতে গিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ এনে ফেইসবুকে বক্তব্য দিয়েছেন ইউসিএসআই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষার্থী।

ঘটনার মাস তিনেক পর গত রোববার ওই তরুণীর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ফেইসবুকে এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে।

মালয়েশিয়ার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউসিএসআইয়ের শাখা ক্যাম্পাস রয়েছে ঢাকার বনানীতে।

সেখানকার শিক্ষার্থী নওশীন আহসান ফেইসবুক লাইভে অভিযোগ করেছেন, তাকে ‘উদ্দেশ্যমূলকভাবে’ হেনস্তা করেছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাসনীম আহমেদ চৌধুরী। ঘটনার তিন মাস পরও তিনি সেই ‘যৌন হেনস্তার’ ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারছেন না।

অপ্রীতিকর এ ঘটনায় তিনি এখন আইন পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছেন।

নওশীনের অভিযোগ, পূর্বপরিচিত তাসনীমসহ তারা সাত বন্ধু গত ২৮ এপ্রিল ঢাকা থেকে মুন্সীগঞ্জের ‘মানা বে ওয়াটার পার্কে’ ঘুরতে গিয়েছিলেন। সেখানকার ওয়াটার পুলে সাঁতার শেখানোর নাম করে তাকে ‘শারীরিকভাবে হেনস্তা’ করা হয়।

এত গুরুতর অভিযোগের এতদিন পরে বিষয়টা সামনে আনার কারণ প্রসঙ্গে তার ভাষ্য, ঘটনার পরপরই পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি ওই ছেলের বিরুদ্ধে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। অভিযোগ নিয়ে গিয়েছিলেন তাসনীমের বাবার কাছেও।

এ দুই জায়গা থেকে যথাযথ প্রতিকার না পাওয়ায় পুলিশি সহায়তা নিতে গুলশান থানায় গিয়েছিলেন। তবে এ থানা থেকে তাদের ঘটনাস্থল মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া থানায় যেতে পরামর্শ দেওয়া হয়।

কোনো পক্ষ থেকেই তার অভিযোগের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা ‘না নেওয়ায় বাধ্য হয়ে’ ফেইসবুকে এসে মুখ খুলেছেন এই তরুণী।

এ বিষয়ে মোবাইলে ফোন করে বক্তব্য জানতে চাইলে অভিযোগ ওঠা তরুণ তাসনীম কোনো কথা না বলেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

তার বাবা আহমেদ কবীর চৌধুরী বলেছেন, তারা বিষয়টাকে ‘আইনিভাবে মোকাবিলা’ করতে চান। যে কারণে কোনো বক্তব্য দিতে চান না। 

অভিযোগের পূর্বাপর

তাসনীমকে স্কুল থেকেই চিনতেন নওশীন; স্কুল পর্যায়ে একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়েছেন। পরে একসঙ্গে না পড়লেও একে অপরের ‘কমন ফ্রেন্ড’। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার ব্রেকে তারা বন্ধুরা মিলে প্রায়ই কোথাও বেড়াতে যান। সেই ধারাবাহিকতায় তারা পরিকল্পনা করে গত ২৮ এপ্রিল ‘মানা বে রিসোর্টে’ বেড়াতে যান।

নওশীন বলেন, “তাসনীমের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয় নাই অনেক বছর। দেখা গেল যে, ওর সাথে আমার লাস্ট টেক্সট হয়েছে এক বছর আগে। দেখা হয়েছে দেড় বছর আগে। তো এরকম কন্টাক্টে থাকি না। জারিফের (নওশীনের বন্ধু) সাথে ওর সম্পর্ক খুবই ভালো। তো জারিফই ওকে নিয়ে আসার পরিকল্পনাটা করে।”

সেদিন বেড়ানোর সময় সেখানকার ওয়াটার পার্কে বন্ধুরা মিলে সাঁতার কাটার সময় তাসনীম ‘উদ্দেশ্যমূলকভাবে’ তাকে ‘যৌন হেনস্তা’ করেছেন বলে অভিযোগ নওশীনের। 

পুলে তাসনীমকে বার বার এড়িয়ে যেতে চাইলেও একাধিকবার তিনি এমন আচরণ করেছেন বলে অভিযোগ তার।

তার ভাষ্য, ঘটনার পর তিনি ‘শকড’ হয়েছিলেন। বাসায় এসে বোনের সঙ্গে এ নিয়ে আলাপ করার পর বুঝেছেন তার সঙ্গে ইচ্ছাকৃতভাবে এমন আচরণ করা হয়েছে।

“এই জিনিসটা নিয়ে আমি এত ট্রামাটাইজ ছিলাম, এই জিনিসটা আমাদের বাংলাদেশে অনেক স্টিগমাটাইজড। বাবা-মাকে ভেঙে বলা এই জিনিসটাও একটা খুব বড় ব্যাপার। তারা তারা কীভাবে নেবে? আমি একজন দুজনের সাথে কথা বললাম, আমার ফ্রেন্ডদের সাথে। তারা বললো এটাতো নরমাল না। এরপর আমি থেরাপি নেওয়ার ট্রাই করি। সাইকোলজিস্টের কাছে যাই।”

ফেরার পর নওশীন এ নিয়ে বাকি বন্ধুদের সঙ্গেও আলাপ করেছেন দাবি করেন। তখন অন্য বন্ধুরা তাসনীমের সঙ্গে কথা বলেছেন। তখন তাসনীম বন্ধুদের কাছে বিষয়টিকে ‘অনিচ্ছাকৃত’ বলে দাবি করেছেন।

এ বিষয়ে তাসনীমের পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে ঘটনার সপ্তাহখানেক পর নিকেতনে তাদের বাসায় গিয়েছিলেন নওশীন।

তার দাবি, সেদিন তাসনীমের বাবা আহমেদ কবীর নওশীনের এমন অভিযোগ ‘পাত্তা না দিয়ে উল্টো খারাপ আচরণ করেছেন’।

এরপর তাসনীম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার দিনের ‘অনিচ্ছাকৃত আচরণের’ জন্য নওশীনের কাছে অনুতপ্ত হওয়ার কথাও বলেছেন।

নওশীনের সঙ্গে তাসনীমের কথোপকথনের স্ক্রিনশট এবং তার বাকি বন্ধুদের সঙ্গে এ বিষয়ে ফোনালাপের রেকর্ড হাতে পেয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

এ বিষয়ে জানতে ঘটনার দিন একসঙ্গে ঘুরতে যাওয়া জারিফ সামিত জামাল নামে তাদের এক বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে পরিচয় শুনে তিনি ফোন কেটে দেন।

আরেক বন্ধু আসিফ করিম বলেছেন, তিনি এ ‘জটিল বিষয়’ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চান না।

অভিযোগ করা হয় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে

ঘটনার পরপর ৯ মে তাহসীনের বিশ্ববিদ্যালয় ব্র্যাকের প্রক্টরের কাছে ইমেইলে অভিযোগ করেন নওশীন। ঘটনার দিনের বিস্তারিত বর্ননা দিয়ে ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নিতে অনুরোধ করেন তিনি।

নওশীন বলেন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ফিরতি মেইলে এই ‘অগ্রহণযোগ্য’ ঘটনার জন্য ‘প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ’ নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত বিভাগে অভিযোগটি পাঠানোর তথ্য দেয়। এরপর এ বিষয় কথা বলতে তাকে ১১ মে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেক্সুয়াল হ্যারেসমেন্ট, এক্সপ্লইটেশন, বুলিং অ্যান্ড র‌্যাগিং এলিমিনেশন কমিটি (সিব্রেক) থেকে ডেকে পাঠানো হয়।

সেদিন নওশীনের কাছ থেকে তার অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত শোনেন ‘সিব্রেকের’ ম্যানেজার মাইশা নূর। 

নওশীনের ভাষ্য, “বৈঠকে তিনি (মাইশা নূর) বলেছেন ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে হওয়ায় তাদের ‘তেমন কিছুই করার নেই’। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন মাস পরপর দেওয়া নিয়মমাফিক রিভিউতে বিষয়টি রাখার কথা বলেন। এ বিষয়ে কোনো রিভিউ থাকলে পরে জানাবেন।”

এ বিষয়ে সিব্রেকের ম্যানেজার মাইশা নূর ও প্রক্টর রুবানা আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। তখন বিশ্ববিদ্যালয়টির জনসংযোগ বিভাগ থেকে বলা হয়, এ বিষয়ে ওই দুই কর্মকর্তা বক্তব্য দেবেন না।

পরে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অফিস অব কমিউনিকেশন্স থেকে পাঠানো লিখিত বিবৃতিতে বলা হয়, “ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি যেকোনো ধরনের হয়রানি, সহিংসতা ও অসদাচরণের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে এবং বিশ্ববিদ্যালয় কমিউনিটির সবার জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

“এ সংক্রান্ত একটি অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে এসেছে এবং অভিযোগকারীর বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগে উল্লিখিত ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরে সংঘটিত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে অভিযোগটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়। তাই অভিযোগকারীকে তার বক্তব্যের সমর্থনে প্রাসঙ্গিক তথ্য-প্রমাণ জমা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। 

“প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নীতিমালা, ন্যায্য প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অধিকার বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে। বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ায় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে এ পর্যায়ে এর বেশি মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।”

তথ্য-প্রমাণ জমা দেওয়ার বিষয়ে নওশীন বলেছেন, “যেদিন তারা কথা বলেছে, সেদিন নরমালি ডকুমেন্টস চেয়েছে। আবার বলেছে তাদের হাত-পা বাধা, কিছুই করার নেই। এরমধ্যে তারা তিন মাস পরে রিভিও দেবে বলেছিল। পরে তারা যোগাযোগ করেনি, আমরা আর যাইনি।”

অভিযোগ আনার পর নোটিস

হেনস্তার অভিযোগ নিয়ে তাসনীমের বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরিবারের কাছে যাওয়ায় নওশীনের নামে এক আইনজীবীর মাধ্যমে লিগ্যাল নোটিস পাঠানো হয় তাসনীমের তরফে।

১২ মে পাঠানো নোটিসে ঢাকার জজ কোর্টের আইনজীবী তানভীর আহম্মেদ লেখেন, তার মক্কেলের সঙ্গে ‘দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সূত্রে’ তারা দুজনসহ আরো বন্ধু প্রায়ই বিভিন্ন রেস্তোরাঁ এবং দর্শনীয় স্থানে ঘোরাফেরা ও আড্ডা দিয়েছেন।

“নোটিস গ্রহীতার মৌন সম্মতিতে প্রায়ই আমার মক্কেলের সহিত চলাফেরা করিয়া আপনি আমার মক্কেলের বন্ধু-বান্ধবের নিকট মানহানিকর ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য প্রচার করিয়া আসিতেছেন। যাহা অত্যন্ত দুঃখজনক, উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত ও উদ্বেগের বিষয় বটে।”

নোটিসে ‘বন্ধুত্বসুলভ চলাফেরার সুযোগ নিয়ে’ নওশীনের বিরুদ্ধে ‘অনৈতিক সুবিধা দাবির’ অভিযোগ আনা হয়।

নোটিসে সাত দিনের মধ্যে ‘এহেন অবৈধ কর্মকাণ্ড ও কু-রুচিপূর্ণ বক্তব্য স্ব-প্রণোদিত হয়ে বন্ধ করতে’ নওশীনকে বলা হয়।

আইনজীবী তানভীর আহম্মেদ বলেন, “এটাতো বলার কিছু নাই, এটা তো লিগ্যাল নোটিসেই লেখা আছে।

“এগুলা ক্লায়েন্টরে জিজ্ঞাসা করেন, এগুলো কি আইনজীবীর বলার দায়িত্ব?”

এর প্রেক্ষিতে গত ১৮ মে ওই নোটিসের জবাব দিয়েছেন নওশীন। 

তার আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জিয়াউর রহমান প্লেটো বলেন, জবাবটি তাসনীমের কাছে পৌঁছেছে।

আইনজীবী প্লেটো বলেন, “ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির মত একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র যদি এরকম সামাজিক অবক্ষয়ের দিকে যায়, যেখানে মেয়ে মানুষটা নিরাপদ না। এখন পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ যেটা আমরা চিন্তা করছি, ওরা কী করবে আলাপ করে আমাকে যেটা বলবে বা ওটা যদি আমার কাছে আসে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেব।”

নওশীন বলেন, “যার বিরুদ্ধে অভিযোগ সেই নোটিস পাঠিয়েছে, আমি জবাব দিয়েছি। তারা স্ট্রাইক দিয়ে আমার ফেইসবুকের ভিডিওটিও নামিয়ে দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলছি। আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছি।”