১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

বর্জন-বিক্ষোভ: শিক্ষক ও ছাত্র প্রতিনিধি ছাড়াই হল চবির সিনেট অধিবেশন

সামনে চাকসু নির্বাচনের সময় সিনেটের পাঁচ শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হবে, বলেন উপাচার্য।

বর্জন-বিক্ষোভ: শিক্ষক ও ছাত্র প্রতিনিধি ছাড়াই হল চবির সিনেট অধিবেশন
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ আল্-ফোরকান।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 08 Aug 2026, 08:10 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:48 PM

আট শিক্ষককে নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর আপত্তি ও বিক্ষোভ এবং নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধিদের বর্জনের মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট বৈঠক হয়েছে।

শনিবার সকাল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সভাকক্ষে সিনেটের ৩৬তম অধিবেশন শুরু হয়।

অধিবেশন শুরুর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন জাতীয় ছাত্রশক্তি, ‘ভয়েস অব স্টুডেন্টস’ ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।

সিনেটের নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধিদের মধ্যে কয়েকজন আওয়ামী লীগপন্থি এবং আটজনের জুলাই আন্দোলনবিরোধী ভূমিকা থাকার অভিযোগ তুলে তারা এ কর্মসূচি পালন করেন।

আর অংশ না নেওয়া শিক্ষক প্রতিনিধিরা বলছেন, সিনেট সভায় যোগ দিতেই তারা ক্যাম্পাসে এসেছিলেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারায় তারা বৈঠকে যোগ দেননি। 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে ১২টি বর্গের মোট ১০২ সদস্য থাকেন। মৃত্যু, অবসরসহ বিভিন্ন কারণে শূন্য পদ বাদ দিয়ে এবারের অধিবেশনে কার্যকর সদস্যের সংখ্যা ৬০ জনে দাঁড়ায় বলে জানা গেছে। 

তাদের মধ্যে ২৪ জন সরাসরি এবং চারজন অনলাইনে বৈঠকে যুক্ত ছিলেন।

সিনেটে পাঁচজন নির্বাচিত শিক্ষার্থী প্রতিনিধি থাকার কথা থাকলেও এসব পদে এখন পর্যন্ত নির্বাচন না হওয়ায়, এবারের অধিবেশনে কোনো শিক্ষার্থী প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না।

২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিল শিক্ষকমণ্ডলীর মাধ্যমে নির্বাচিত ৩৩ জন শিক্ষক প্রতিনিধির মধ্যে মৃত্যু ও অবসরজনিত কারণে বর্তমানে ৯টি পদ শূন্য। 

বাকি ২৪ জন শিক্ষক প্রতিনিধির মধ্যে পদে ২০ জন শিক্ষক শনিবার ক্যাম্পাসে এলেও কেউ অধিবেশনে যোগ দেননি। 

সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এস এম মনিরুল হাসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধিরা সবাই একসঙ্গে সিনেট সভায় যোগ দিতে চেয়েছিলেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আটজন বাদে সবাইকে আসতে বলা হয়।

“আমরা বলি, আমরা ২০ জন শিক্ষক ক্যাম্পাসে এসেছি সিনেটে যোগ দেওয়ার জন্য। গেলে সবাই যাব, না হলে কেউ আসব না।”

পরে সশরীরে উপস্থিতির পরিবর্তে অনলাইনে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা সিনেট সভায় যুক্ত হবার জন্যেই ক্যাম্পাসে এসেছি। এমন তো না যে কারও খারাপ রেকর্ড আছে। কোনো কারণ ছাড়াই কেন আটজন থাকতে পারবে না? নির্বাচিত সদস্য হিসেবে এখানে যোগ দেওয়ার অধিকার তার রয়েছে।”

ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক মো. দানেশ মিয়া বলেন, “শুধু আটজন নয়, আমরা প্রায় ২০ জন শিক্ষক সিনেট অধিবেশনে যাচ্ছি না। কারণ, সিনেট কর্তৃপক্ষ আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। 

“২০১৫ সালের সিনেট নির্বাচনে নির্বাচিত শিক্ষকদের সবাই এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে আছেন।”

শিক্ষক প্রতিনিধদের সিনেট সভায় অংশ নেওয়ার বিরুদ্ধে কর্মসূচি পালন করা ভয়েস অব স্টুডেন্টসের সভাপতি আশিকুর রহমান বলেন, “৩৬তম সিনেট সভায় জুলাই আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া শিক্ষকদের বিষয়ে আমরা আমাদের কর্মসূচির মাধ্যমে দাবি জানিয়েছি। 

“আমাদের আটজন শিক্ষক আসবেন না বলে জানানো হয়েছে। এছাড়াও সাত দিনের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। আওয়ামীপন্থি যারা সদস্য আছেন, তারা আজকের পর থেকে সিনেটে থাকতে পারবেন না।”

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, “আমরা জানতে পারি, আওয়ামী লীগ সমর্থনকারী আট শিক্ষক সিনেটে উপস্থিত থাকবেন। এর প্রতিবাদে আমরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করি।”

পরে উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ওই আট শিক্ষক অধিবেশনে উপস্থিত হবেন না বলে তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছে, বলেন তিনি।

এরপর সকাল ১১টায় চাকসু (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) ভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে সিনেট অধিবেশন প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেন ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল থেকে নির্বাচিত চাকসুর ২৩ সদস্য। তারা উপাচার্যের কাছে ১৯ দফা দাবিসংবলিত একটি খোলা চিঠিও দেন।

চাকসুর জিএস সাঈদ বিন হাবিব বলেন, “আমরা শুধু আটজন শিক্ষককে নিয়ে কথা বলছি না। শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার তৎপরতায় জড়িত এবং শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করেছেন, এমন শিক্ষকও রয়েছেন। 

“সাবেক প্রক্টর, প্রভোস্টসহ যারা শিক্ষার্থীদের ওপর অত্যাচার করেছেন এবং হত্যার মদদ দিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।” 

তবে সিনেট অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত এজিএস আইয়ুবুর রহমান তৌফিক এবং ছাত্র ফেডারেশন সমর্থিত ‘বিনির্মাণ শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেল থেকে নির্বাচিত সহখেলাধুলা ও ক্রীড়া সম্পাদক তামান্না মাহবুব প্রীতি।

সিনেট অধিবেশনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগপন্থিদের পুনর্বাসনের অপচেষ্টার অভিযোগ তুলে দুপুর সোয়া ১টার দিকে জিরো পয়েন্ট এলাকায় বিক্ষোভ করেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা।

শিক্ষক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে কোনো বাধা ছিল না বলে দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ আল্-ফোরকান বলেন, “শিক্ষক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে কোনো বাধা ছিল না। সিদ্ধান্ত কিন্তু তাদের। আমরা তো সবাইকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি।”

আট শিক্ষককে নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর আপত্তির বিষয়টি প্রশাসন জানত তুলে ধরে উপাচার্য বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যাদের নেতিবাচক ভূমিকা ছিল, তাদের ব্যাপারে আপত্তি ছিল ছাত্রদের। আমাদের সিনেট সদস্যদের মধ্যে প্রায় আটজনের মতো ছিলেন, ছাত্রদের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে তাদের ব্যাপারে আপত্তি ছিল।”

তাদের সবাইকে সরাসরি ও ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে অধিবেশনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল দাবি করে তিনি বলেন, “নিরাপত্তারও কোনো ঘাটতি ছিল না। আমাদের প্রটেকশন টিম, নিরাপত্তা দপ্তরের সকল কর্মকর্তা এখানে উপস্থিত ছিলেন এবং পুলিশও ছিল।”

শিক্ষকদের অনুপস্থিতির কারণ কি? জবাবে উপাচার্য বলেন, “হয়তো ছাত্রদের মুখোমুখি হতে চাননি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অশান্ত করতে চাননি।”

অন্য সদস্যদের নিয়ে কোরাম পূর্ণ হওয়ায় অধিবেশন সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “ওই আট শিক্ষক না থাকলেও অন্য সদস্যদের নিয়ে কোরাম পূর্ণ হয়েছে এবং কোনো কোরাম সংকট ছাড়াই সিনেট অধিবেশন সম্পন্ন হয়েছে।”

সামনে চাকসু নির্বাচনের সময় সিনেটের পাঁচ শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হবে, বলেন উপাচার্য।