১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

নয় মাসে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ৫৪ শতাংশ

এসময়ে দেশের মোট আমদানি ব্যয়ের ১১ দশমিক ৫৫ শতাংশই গেছে জ্বালানি তেলের পেছনে।

নয় মাসে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ৫৪ শতাংশ
ফাইল ছবি

আবদুর রহিম হারমাছি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 18 May 2026, 09:23 AM

Updated : 26 Aug 2026, 03:38 PM

জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয় চলতি অর্থবছরের নয় মাস শেষে ব্যাপক বেড়েছে। জুলাই থেকে মার্চ সময়ে আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ব্যয় বেড়েছে ৫৪ শতাংশের বেশি।

এ সময়ে মোট পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশ যত খরচ করেছে তার মধ্যে ১১ দশমিক ৫৫ শতাংশই গেছে জ্বালানি তেল আমদানিতে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

শুধু ব্যয়ের হিসেবে জ্বালানি তেল আমদানি বেড়েছে তা নয়, পরিমাণও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেড়েছে।

তবে এ সময়ে অধিক পরিমাণে আমদানি হওয়া অন্য পণ্যের মধ্যে পোশাক খাতের সুতা থেকে শুরু করে অন্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি কমেছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ এবং খাদ্যপণ্য আমদানি কমেছে ১৩ শতাংশ।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতির বিশ্লেষকরা দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে জ্বালানি তেলের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা বলেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পণ্য আমদানির হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে মোট আমদানি ব্যয় ছিল ৫৪ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার। এরমধ্যে ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে জ্বালানি তেল আমদানিতে। এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এ সময়ে মোট আমদানির ১১ দশমিক ৫৫ শতাংশ খরচ হয়েছে জ্বালানি তেলে।

অপরদিকে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে পণ্য আমদানিতে মোট ৫২ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল। এর মধ্যে জ্বালানি তেলে ব্যয় হয়েছিল ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা মোট আমদানির ৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

এ হিসাবে চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে শুধু জ্বালানি তেল আমদানিতে ২ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার বেশি ব্যয় হয়েছে; শতাংশের হিসাবে ৫৪ দশমিক ৪১ শতাংশ।

এর আগে কোনো অর্থবছরের পুরো সময়ে জ্বালানি তেল আনতে এত খরচ হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, শুধু মার্চে ৭৯ কোটি ১৮ লাখ ডলারের জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছে।

সবশেষ গত অর্থবছরের পুরো সময়ে এ খাতে মোট ৫ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল।

এ হারে জ্বালানি তেল আসা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরের বাকি তিন মাসে এ খাতে আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।

আমদানি করা জ্বালানির তালিকায় রয়েছে ডিজেল, অপরিশোধিত তেল, ফার্নেস তেল, পেট্রোল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও বেস অয়েল।  

এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও বেড়েছে। সাপ্তাহিক ছুটির কারণে রোববার আন্তর্জাতিক বাজার বন্ধ ছিল। আগের দিন শনিবার অপরিশোধিত তেলের অন্যতম মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের প্রতি ব্যারেলের দাম ছিল ১০৯ ডলার ৩০ সেন্ট। আর ডব্লিউটিআই ক্রুডের দর ছিল ১০৫ ডলার ৪০ সেন্ট।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা করলে বিশ্ব বাজারে তেলের বাজার চড়তে থাকে। তখন ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বাড়তে বাড়তে ১২০ ডলারেও উঠেছিল। পরে অবশ্য তা কমে ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে। চলতি মে মাসের প্রথম দিকে তা আবার ১০০ ডলার ছাড়ায়।

এর বছর আগে গত বছরের মে মাসের শেষের দিকে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ৬০ ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম আমদানির ব্যয় ৮১ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়ে ৯৩ কোটি ৩৭ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে তেল ও লুব্রিকেন্ট (পিওএল) ব্যয় ৫০ দশমিক ২০ শতাংশ বেড়ে ৫ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে ৫১ কোটি ৫৬ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছিল অপরিশোধিত তেল আমদানিতে এবং ৩ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল পিওএল আমদানি বাবদ।

অপরদিকে চলতি অর্থবছরের নয় মাসে বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে মোট ৫৪ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে তা ৪ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে খরচের অঙ্ক ছিল ৫২ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার।

জ্বালানি তেল আমদানির খরচ এতটা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মূলত দাম বৃদ্ধি ও চাহিদা বাড়ার কারণে এই ব্যয় বেড়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়তির দিকে; কমবে বলে মনে হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে আগামী মাসগুলোতে এ খাতে ব্যয় আরও বাড়বে বলে মনে হচ্ছে।

সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের বিবেচনায় পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনের মত পরিস্থিতি এড়াতে বিশ্ব পরিস্থিতি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে কমপক্ষে দেড় মাসের মজুত রাখার পরামর্শ দেন বুয়েটের সাবেক এই অধ্যাপক।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হয়। মার্চ মাসে যে তেল দেশে এসেছে, তা আগেই এলসি (ঋণপত্র) খোলা ছিল। দামও কম ছিল। এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত যে তেল এসেছে তা বাড়তি দামে কিনতে হয়েছে।

অর্থবছরের বাকি সময়েও বাড়তি দাম থাকার শঙ্কার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “চলতি অর্থবছরে জ্বালানি তেল আমদানি খাতে মোট ব্যয় সাড়ে ৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। গত অর্থবছরের চেয়ে এবার ব্যয় ৪ বিলিয়ন ডলারের মত বাড়বে।”

জ্বালানি তেল আমদানিতে বাড়তি খরচের কথা বলেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুও। গত ২৮ এপ্রিল জ্বালানি খাত নিয়ে এক আলোচনায় তিনি বলেন, বৈশ্বিক সংকটের প্রভাবে দেশের জ্বালানি তেল আমদানিতে অতিরিক্ত দুই বিলিয়ন ডলার ব্যয় বেড়েছে। এই অতিরিক্ত ব্যয় দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আর্থিক চাপ তৈরি করে সংকটকে আরও তীব্র করেছে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে আর্থিক চাপ সামাল দিতে গত ১৮ এপ্রিল সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরকার। ডিজেল ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। কেরোসিন ১১২ থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়। অকটেন ১২০ থেকে বেড়ে ১৪০ টাকা এবং পেট্রোল ১১৬ থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা করা হয়।

চলতি অর্থবছরে পরিমাণের দিক দিয়েও জ্বালানি তেল আমদানি বেড়েছে। জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ৫৭ লাখ ৪০ হাজার টন জ্বালানি আমদানি করেছে। গত ২০২৪-১৫ অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৫০ লাখ ৫ হাজার টন। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পুরো সময়ে ৬২ লাখ ১৫ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছিল।

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের বার্ষিক চাহিদা ৭২ লাখ লাখ টনের মত। এর মধ্যে ৯২ শতাংশের বেশি বিপিসি পরিশোধিত তেল আমদানি করে। বাকি ১৫ লাখ টনের মত অপরিশোধিত তেল এনে পরিশোধন করা হয় ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে।