১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি কমেছে ১১%

অটেক্সার হিসাবে, একই মাসে ভারতের কমেছে ২৮.৮০%; চীনের কমেছে ১৭.৫৪% এবং ভিয়েতনামের কমেছে ১০.৬৯%।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 07 Sep 2026, 12:24 AM

Updated : 17 Sep 2026, 02:55 AM

একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি আয় জুলাই মাসে ১১ শতাংশের মতো কমেছে।

এ ধাক্কার পরও অবশ্য বাজারটিতে দ্বিতীয় শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। তবে জ্বালানি সংকটের সুরাহা না হলে রপ্তানি আয় আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী নেতারা।  

দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ২০ শতাংশ আসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) বাংলাদেশ সেখানকার বাজারে ৪৬৫ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ কম।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশটিতে ৪৯৮ কোটি ২৬ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিলেন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা।

শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের ‘অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল’ (অটেক্সা) সাত মাসের যে হিসাব দিয়েছে, তাতে জুলাইয়ের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। 

এ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৭৩ কোটি দুই লাখ ডলারের, যা গত বছরের জুলাইয়ে ছিল ৬৫ কোটি ১০ লাখ ডলার। শতকরা হিসাবে কমেছে প্রায় ১১ শতাংশ। 

একই মাসে ভারতের কমেছে ২৮ দশমিক ৮০ শতাংশ; চীনের কমেছে ১৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের কমেছে ১০ দশমিক ৬৯ শতাংশ।

পর্যাপ্ত গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া না গেলে আগামী মাসগুলো রপ্তানি আরও কমে যেতে পারে বলে মনে করছেন পোশাক রপ্তানিকারকরা। এটাকে উদ্বেগজনক বলছেন তারা।

মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের আওতাধীন কার্যালয়— অটেক্সার তথ্য বলছে, জানুয়ারি-জুলাই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ। সবচেয়ে বেশি কমেছে চীনের; ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ। ভারতের কমেছে ২৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

পাকিস্তান, মেক্সিকো ও হন্ডুরাসের কমেছে যথাক্রমে ৫ দশমিক ৬০, ১০ দশমিক ৫০ ও ১০ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

রপ্তানি বেড়েছে কম্বোয়িার ও ইন্দোনেশিয়ার। কম্বোয়িার বেড়েছে ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ; ইন্দোনেশিয়ার ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

অটেক্সার তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা গত জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ৪ হাজার ১৮৩ কোটি ৪৮ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছেন। এই আমদানি গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ কম।

গত বছরের প্রথম সাত মাসে ৪ হাজার ৫৭৯ কোটি ৮২ লাখ ডলারের পোশাক আমদানি করেছিলেন দেশটির ব্যবসায়ীরা।

২০২২ সালে আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি তার আগের বছরের চেয়ে ৩৬ শতাংশ বেড়ে ৯৭৩ কোটি ডলারে উঠেছিল। কিন্তু পরের বছর তা ২৫ শতাংশ কমে যায়।  ওই বছরে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ৭২৯ কোটি ডলার।

২০২৪ সালে অবশ্য সামান্য বেড়ে ৭৩৪ কোটি ডলার হয়; শতকরা হিসাবে বেড়েছিল দশমিক ৭৫ শতাংশ।

২০২৫ সালে বেড়েছিল ১২ শতাংশের মত; রপ্তানির অঙ্ক ছিল ৮২০ কোটি ডলার।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কেন কমছে— এমন প্রশ্নে পোশাক রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “সামগ্রিক হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা কিন্তু কম পোশাক আমদানি করেছে। তার প্রভাব আমাদের উপরও পড়েছে। 

“আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সব দেশের কমেছে। আমাদের প্রবৃদ্ধি যেটা কমেছে, সেটা কিন্তু চীন ও ভারতের তুলনায় অনেক কম।”

তার মতে, ট্রাম্পের শুল্কের কারণে সব দেশই আমেরিকার বাজারে সমস্যার মুখে পড়েছে। একেক সময় একের হারে শুল্ক আরোপ করায় সব হিসাবনিকাশ পাল্টে গেছে।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের এই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যদিও সাত মাসের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমার হার বৈশ্বিক আমদানি কমার তুলনায় কম। তবে সবশেষ জুলাই মাসে কমেছে কিন্তু অনেক; ১১ শতাংশ।

“এটাই আমাদের জন্য উদ্বেগের। গ্যাস-বিদুৎ সমস্যার সমাধান না হলে আগামীতেও কিন্তু এই নেতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে।”

বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী দেশের অবস্থান ধরে রাখতে নতুন কৌশল, মূল্য প্রতিযোগিতা ও ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এ ব্যবসায়ী নেতা।

একই কথা বলেন নিট পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন— বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দেশে বিদ্যুৎ সমস্যা তো ছিলই। গ্যাসের তীব্র সংকট শুরু হয়েছে ২১ জুলাই থেকে। গ্যাস সমস্যার কারণে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো বন্ধই ছিল বলা যায়। এ সময়ে আমরা মিলগুলো থেকে কোনো কাপড় পাইনি। পোশাক তৈরি করতে পারিনি; রপ্তানিও হয়নি। তার প্রভাব আমাদের প্রধান বাজার আমেরিকাতেও পড়েছে।”

গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান না হলে আগামী মাসগুলো আরও খারাপের দিকে যাবে বলে মনে করেন এ ব্যবসায়ী নেতা।

অটেক্সার তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পোশাক সরবরাহকারী দেশ ছিল ভিয়েতনাম। দেশটি থেকে আমদানি ৯৪৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার থেকে ৯৩৬ কোটি ৫৬ লাখ ডলারে নেমেছে।

তৃতীয় অবস্থানে থাকা চীনের রপ্তানি ৬৯২ কোটি ৪৭ লাখ ডলার থেকে নেমেছে ৪৫৫ কোটি ৫৭ লাখ ডলারে।

অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়ে ২৭৪ কোটি ৩৩ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। কম্বোডিয়ার রপ্তানি ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ বেড়ে উঠেছে ২৬২ কোটি ১১ ডলারে।

তবে ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি কমে ২৪৫ কোটি ৩৪ লাখ ডলারে নেমেছে। মেক্সিকোর ১০ দশমিক ৭৭ শতাংশ কমে নেমেছে ১৩৮ কোটি ৬২ লাখ, পাকিস্তানের ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ কমে ১২৬ কোটি ৮৯ লাখ ডলার এবং হন্ডুরাসের ১০ দশমিক ৩৩ শতাংশ ১০৫ কোটি ডলারে নেমেছে।

পিস বা পোশাকের সংখ্যার হিসাবে জানুয়ারি-জুলাই সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এই সাত মাসে ১৫২ কোটি ৯৭ লাখ পিস পোশাক রপ্তানি হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ অঙ্ক ছিল ১৫৯ কোটি ৯১ লাখ ২০ হাজার পিস।

পিস বা সংখ্যার হিসাবে জানুয়ারি-জুলাই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের পোশাক রপ্তানি কমেছে ২৪ দশমিক ১৭ শতাংশ। ভারতের কমেছে ২৪ দশমিক শূন্য দুই শতাংশ। তবে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার বেড়েছে।

অন্যদিকে ইউনিট মূল্যের ক্ষেত্রেও প্রায় সব দেশেই পতন দেখা গেছে। সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে চীনের, ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। বাংলাদেশে ইউনিট মূল্য কমেছে তুলনামূলকভাবে মাঝারি হারে, ২ দশমিক ২৬ শতাংশ।

ভিয়েতনামের ইউনিট মূল্য কমেছে ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। চীনের কমেছে ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়ার, ভারত ও পাকিস্তানের কমেছে যথাক্রমে ৬ দশমিক ১০, ১ দশমিক ৪০, ২ দশমিক ৩০ ও ৫ দশমিক ১২ শতাংশ। 

গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে সম্পূরক শুল্ক (পাল্টা শুল্ক) আরোপ করেন। পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগমুহূর্তে সে বছরের ৩১ জুলাই বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের জন্য শুল্ক কমানোর ঘোষণা দেন তিনি। তাতে বাংলাদেশের শুল্ক ৩৫ শতাংশ থেকে কমে হয় ২০ শতাংশ।

তখন চীন ও ভারতের পণ্যে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র সরকার।

প্রতিযোগী দেশের তুলনায় পাল্টা শুল্ক কাছাকাছি হওয়ায় ‘দুশ্চিন্তামুক্ত হন’ বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা। তাদের প্রত্যাশা ছিল এর সুফল মিলবে। সেই লক্ষণও দেখা দিয়েছিল।

দীর্ঘদিন ধরে যেসব কোম্পানি তৈরি পোশাক রপ্তানি করছে, সেসব কোম্পানির অনেকেই বাড়তি ক্রয়াদেশ পেতে শুরু করেছিল। কিন্তু হিসাবে দেখা যায় উল্টো, রপ্তানি না বেড়ে বরং কমতে থাকে।

এরইমধ্যে ট্রাম্পের শুল্ক নিয়ে নতুন জটিলতা দেখা দেয়। গত ২০ ফেব্রুয়ারি তার আরোপ করা বৈশ্বিক শুল্ক দেশটির সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নতুন আইনে সব দেশের পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। পরদিনই অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারি তা বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করেন।

এ অবস্থার মধ্যে গত ২৫ জুলাই জোরপূর্বক শ্রমে পণ্য উৎপাদন যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার অভিযোগে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের ওপর ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে ১৭টি দেশের জন্য ১০ শতাংশ এবং বাকি দেশগুলোর জন্য সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়।

বাংলাদেশের জন্য এই শুল্ক ১০ শতাংশ হওয়ায় ‘খুব একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না’ বলে মনে করছে সরকার।

শুল্ক ঘোষণার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পোশাক রপ্তানিকারক দেশ চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডকে সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক স্তরে রাখা হয়েছে। ফলে এসব দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা আরও বাড়বে বলে সরকার মনে করছে।