বিদ্যুতের বড় ঘাটতি কাটছে না, এলএনজি কার্গো বাড়ার আশায় পেট্রোবাংলা
গ্যাসের ঘাটতি যে কয়লা বা তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো দিয়ে পুরোপুরি সামাল দেওয়া যাবে, সেই সুযোগও সীমিত।
গ্যাসের ঘাটতি, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সংকট এবং কয়েকটি বড় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন না পাওয়ায় দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি খুব একটা কমছে না।
গত রবি ও সোমবার চাহিদা যেখানে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের আশপাশে ছিল, সরবরাহ ছিল ১২ থেকে ১৩ হাজার মেগাওয়াটের ঘরে। ফলে দিনে-রাতে অনেক সময় ঘাটতি ছিল আড়াই থেকে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।
মঙ্গলবার পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও বিকেল ৩টায় বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান ছিল ১ হাজার ৫৪৭
আগের দিন সোমবার একই সময়ে ব্যবধান ছিল ৩ হাজার ৬৯৩ মেগাওয়াট। রোববার ছিল ৩ হাজার ৬৯২ মেগাওয়াট।
তবে গ্যাসের ক্ষেত্রে সেপ্টেম্বরে কিছুটা স্বস্তির আশা করছে পেট্রোবাংলা। খোলা বাজার থেকে আটটি এলএনজি কার্গো কেনা এরই মধ্যে নিশ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থার এক কর্মকর্তা।
আরও দুটি কার্গো কেনা গেলে সেপ্টেম্বরে মোট ১০টি কার্গো এলএনজি পাওয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে এলএনজির সরবরাহ গত দুই মাসের তুলনায় বাড়বে।
কিন্তু দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে আসায় এবং মোট চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এখনও অনেক নিচে থাকায় সংকট পুরোপুরি কাটবে না।
বিদ্যুতে ঘাটতির চিত্র
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বিকেল ৩টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩৮৬ মেগাওয়াট। আর সরবরাহ হয়েছিল ১২ হাজার ৬৯৩ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৬৯৩ মেগাওয়াট।
এক ঘণ্টা পর বিকেল ৪টায় চাহিদা কমে ১৬ হাজার ৫২ মেগাওয়াট হয়। তখন সরবরাহ ছিল ১২ হাজার ৮৫১ মেগাওয়াট, ঘাটতি ৩ হাজার ২০১ মেগাওয়াট।
সোমবার দুপুর ১২টায় ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ১০১ মেগাওয়াট। বেলা ১টায় ছিল ২ হাজার ৯০৪ মেগাওয়াট।
রাতেও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকছে না। রোববার রাত ১টায় ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট। ভোর ৪টায় ৩ হাজার ৮৫ এবং সকাল ৬টায় ২ হাজার ৬৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল।
মঙ্গলবার পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়। বিকাল ৩টায় ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৫৪৭ মেগাওয়াট। বেলা ১২টায় ছিল ১ হাজার ৫৯৭ মেগাওয়াট। ভোর ৫টায় ছিল ১ হাজার ৬০৯ মেগাওয়াট। রাত ১২টায় ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৫৩৩ মেগাওয়াট।
রোববার দুপুর থেকে বিকেলের বড় একটি সময় চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি ছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান তিন জ্বালানি গ্যাস, কয়লা ও তেল, তিন ক্ষেত্রেই সরবরাহ সংকটের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুতকেন্দ্রে গ্যাস কমেছে
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানির যোগান কমেছে। এনএলডিসির হিসাবে ২৭ অগাস্ট বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ৮৫৭ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ হয়েছিল। ২৮ অগাস্ট তা ছিল প্রায় ৮৫৬ এমএমসিএফডি। ২৯ অগাস্ট তা কমে প্রায় ৮৩৭ এমএমসিএফডিতে নামে।
পেট্রোবাংলার ২৯-৩০ অগাস্টের প্রতিবেদনে মোট গ্যাস উৎপাদন ও আরএলএনজি মিলিয়ে সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৩০৭ দশমিক ১ এমএমসিএফডি। এর মধ্যে আরএলএনজি ছিল ৬৮২ দশমিক ৫ এমএমসিএফডি। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে দেওয়া হয়েছিল ৮৫২ দশমিক ৯ এমএমসিএফডি।
আর ৩০-৩১ মোট গ্যাস উৎপাদন ও আরএলএনজি মিলিয়ে সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৩২৮ দশমিক ৯ এমএমসিএফডি। এর মধ্যে আরএলএনজি ছিল ৭০১ দশমিক ৮ এমএমসিএফডি। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে দেওয়া হয়েছিল ৮৭৮ দশমিক ৬ এমএমসিএফডি।
দেশে সরকারি হিসাবে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ এমএমসিএফডি। ফলে সরবরাহ বাড়লেও চাহিদাতে বড় ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
জুলাই ও অগাস্টে এলএনজি সরবরাহে কয়েক দফা বিঘ্ন ঘটেছে। ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যা, রক্ষণাবেক্ষণ, বৈরী আবহাওয়া এবং নির্ধারিত কার্গো না আসায় অনেক সময় দুই টার্মিনালের সম্মিলিত সক্ষমতার অনেক কম গ্যাস পাওয়া গেছে।
দুই এফএসআরইউ থেকে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ১০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অনেক দিনই সরবরাহ ৫০০ থেকে ৭০০ এমএমসিএফডির মধ্যে ছিল।
পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, সেপ্টেম্বরে খোলা বাজার থেকে আট কার্গো এলএনজি কেনা নিশ্চিত করা হয়েছে। আরও দুটি কার্গো কেনার উদ্যোগ রয়েছে।
“১০ কার্গো পাওয়া গেলে সেপ্টেম্বরে সাম্প্রতিক সময়ের তুলনায় গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো সম্ভব হবে। আট কার্গোর এলএনজির দাম এমএমবিটিইউপ্রতি প্রায় ২৩ থেকে ২৪ ডলার পড়েছে।”
কয়লাতেও টান
গ্যাসের ঘাটতি যে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো দিয়ে পুরোপুরি সামাল দেওয়া যাবে, সেই সুযোগও সীমিত। এনএলডিসির হিসাবে ২৭ অগাস্ট কয়লা থেকে সারাদিনে ১১৭ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছিল। ২৮ অগাস্ট তা কমে ১১৩ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন ইউনিট এবং ২৯ অগাস্ট ১১১ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন ইউনিটে নামে।
২৯ অগাস্ট এসএস পাওয়ার সন্ধ্যার পিকে বর্তমান ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার প্রায় পুরোটাই দিয়েছে। কিন্তু মাতারবাড়ীর একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণে থাকায় কেন্দ্রটি থেকে পাওয়া গেছে ৫৫৮ মেগাওয়াট। পায়রা থেকে এসেছে ৫১০ মেগাওয়াট। এনএলডিসির প্রতিবেদনে সেখানে যান্ত্রিক সমস্যার কথা বলা হয়েছে।
রামপাল থেকে পাওয়া গেছে ৯২০ মেগাওয়াট এবং পটুয়াখালীর আরএনপিএল কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ১৩০ মেগাওয়াট। কিছু কয়লাকেন্দ্র ও আদানি থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও কয়লা-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার তথ্য দিয়েছে এনএলডিসি। এই অবস্থায় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর চাপ কমাতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার।
এনএলডিসির তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবারও মদনগঞ্জ, গাগনগর, কড্ডা, গাজীপুর, মেঘনাঘাট ওপিসিএল, কাঞ্চন পূর্বাচল, জেরা মেঘনাঘাটসহ বেশ কয়েকটি তেলভিত্তিক কেন্দ্রের পাশে ‘লিকুইড ফুয়েল শর্টেজ’ লেখা ছিল।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বিদ্যুতের ঘাটতি বাড়ার পেছনে একাধিক কারণের কথা বলেছেন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পূর্ণ উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছে না। এর সঙ্গে গ্যাসের সরবরাহ না বাড়ায় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও সীমিত থাকছে।
“তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রেও সব সময় পুরো সক্ষমতা ব্যবহার করা যায় না। মাঝেমধ্যে উৎপাদনে বিরতি দিতে হওয়ায় সেখান থেকেও প্রায় অর্ধেক সক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব হয়।”
