১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ব্যাংক রেজল্যুশন আইন: পুরনো শেয়ারধারীদের ফেরার সুযোগে আবেদন নেই, ১৮ক ধারা বাতিলে সংসদে বিল

সমালোচকদের ভাষ্য ছিল, এই ধারার সুযোগে এস আলমের মত কোম্পানি আবার ব্যাংকের কর্তৃত্বে ফিরতে পারে।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 03 Sep 2026, 08:13 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:54 AM

সংকটে পড়া ব্যাংকের পুরনো শেয়ারধারীদের শর্তসাপেক্ষে আবার সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় নেওয়ার যে সুযোগ ব্যাংক রেজল্যুশন আইনে রাখা হয়েছিল, তা বাতিল করতে সংসদে বিল উঠেছে।

‘ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশনে বিলটি পরীক্ষা করে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।

বিলে কেবল ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮ক ধারা বিলুপ্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আইনটি পাস হলে তা অবিলম্বে কার্যকর হবে।

১৮ক ধারায় রেজল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগে কোনো ব্যাংকের যারা শেয়ারধারক ছিলেন, তাদের নির্দিষ্ট শর্তে আবার ওই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছিল, যা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছিল। 

‘রেজল্যুশন’ হল আর্থিক সংকটে পড়া কোনো ব্যাংককে সরাসরি বন্ধ না করে পুনর্গঠন, একীভূতকরণ বা অন্য ব্যবস্থার মাধ্যমে সচল রাখার প্রক্রিয়া।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রচলিত রেজল্যুশন ব্যবস্থার পাশাপাশি বাজারভিত্তিক একটি বিকল্প ব্যবস্থা চালু করতে ১৮ক ধারা যোগ করা হয়েছিল।

এর উদ্দেশ্য ছিল রেজল্যুশনের আওতায় থাকা ব্যাংককে সচল রেখে পুনর্গঠন করা, মূলধন ঘাটতি ও তারল্য সংকট কমানো এবং আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা। 

একই সঙ্গে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক উদ্ধারে সরকারের আর্থিক সংশ্লেষ বা সরকারি অর্থের ব্যবহার কমানোও এর লক্ষ্য ছিল। তবে আইনটি কার্যকর হওয়ার পর ১৮ক ধারার সব শর্ত পূরণ করে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন করেনি বলে বিলে জানানো হয়েছে। এ কারণেই ধারাটি বাদ দেওয়ার প্রস্তাব আনা হয়েছে।

ব্যাংক রেজল্যুশন আইনটি চলতি বছরের ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাস হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ৯ মে জারি করা ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশকে স্থায়ী আইনে রূপ দিতে বিলটি সংসদে আনা হয়েছিল।

তবে অধ্যাদেশে না থাকা ১৮ক ধারা সংসদে বিল আনার সময় যুক্ত করা হয়। ওই ধারায় রেজল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগের শেয়ারধারী বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনায় উপযুক্ত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকটির শেয়ার, সম্পদ ও দায় নেওয়ার জন্য আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

তবে সমালোচকদের ভাষ্য ছিল, এই সুযোগে এস আলমের মত কোম্পানি আবার ব্যাংকের কর্তৃত্বে ফিরতে পারে।

গত ২৯ জুন সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১৮ক ধারা বাতিলের ঘোষণা দেন। তিনি তখন বলেছিলেন, অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সরকার ধারাটি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এরপর ১০ অগাস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ১৮ক ধারা বাদ দিয়ে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।

ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশটি আনা হয় আর্থিক সংকটে থাকা পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করার জন্য। 

এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে রেজল্যুশন প্রক্রিয়ায় এনে নতুন ব্যাংকটি গঠন করা হয়। ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

একীভূত হওয়ার আগে এক্সিম ব্যাংকের পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম মজুমদারের হাতে। অন্য চার ব্যাংকের পর্ষদে এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম ও তার পরিবারের নিয়ন্ত্রণ ছিল। 

এ কারণে পুরনো শেয়ারধারীদের ফিরে আসার সুযোগ রাখা ১৮ক ধারা নিয়ে বিশেষভাবে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

গত ১৬ অগাস্ট পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসক প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক একক ব্যবস্থাপনায় কার্যক্রম শুরু করে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের মার্চের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশ।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে মূলধনে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।