Published : 30 Jul 2026, 12:44 PM
বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) তালিকায় ঋণখেলাপি হিসেবে নাম অন্তর্ভুক্ত থাকার বিষয়ে আপিল বিভাগে আগের বিচারাধীন কার্যক্রম ও আদালতের আদেশ গোপন করে হাই কোর্টে নতুন করে আপিল করায় জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডকে পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
জরিমানার অর্থ আগামী এক মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ। জরিমানার এ অর্থ প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের উন্নত চিকিৎসায় ব্যয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি মাহমুদ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ ইস্পাত খাতের কোম্পানিটির এ বিষয়ক আপিল (ফার্স্ট মিসলেনিয়াস আপিল) খারিজ করে এ আদেশ দেয়।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। তার সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ (মাসুদ), সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সোলায়মান হোসেন ও মুহাম্মদ কুতুব উদ্দীন তুষার।
জিপিএইচ ইস্পাতের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ হোসাইন, পূর্ণেন্দু বিকাশ দাস ও মোহাম্মদ আক্তার হোসাইন।
আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল কাজল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আপিল বিভাগে এ বিষয়ক রিট আবেদনের তথ্যসহ হাই কোর্টের এক বেঞ্চের আদেশের তথ্য গোপন করে জিপিএইচ ইস্পাত গোপন রাখে। এ নিয়ে হাই কোর্টের আরেক বেঞ্চে নতুন করে রিট আবেদন করা হলে আদালত কোম্পানিটিকে এ জরিমানা করেছে।
বিস্তারিত তুলে ধরে তিনি বলেন, জিপিএইচ ইস্পাত এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি প্রতিবেদনে ঋণখেলাপি হিসেবে তাদের নাম না রাখার নির্দেশনা চেয়ে হাই কোর্টে একটি রিট আবেদন করেছিল। ওই আবেদনে হাই কোর্ট রুল ও স্থগিতাদেশ দিলেও পরে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে গেলে ৯ জুলাই সেই স্থগিতাদেশ স্থগিত করে। ফলে সিআইবি প্রতিবেদনে ঋণ খেলাপি হিসেবে কোম্পানিটির নাম প্রকাশ না করার বিষয়ে হাই কোর্টের নির্দেশনা আর বহাল থাকেনি।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের দাখিল করা লিখিত ‘স্টেটমেন্ট অব ফ্যাক্ট’ এ বলা হয়, একই বিষয়ে আগে হাই কোর্ট ও আপিল বিভাগে বিচারাধীন কার্যক্রম চলমান থাকার পরও সেই তথ্য গোপন করে প্রথমে নিম্ন আদালতে মামলা এবং পরে ওই মামলার আদেশের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে আপিল করা হয়।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জিপিএইচ ইস্পাতের মিডিয়া অ্যাডভাইজার অভীক ওসমানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
বুধবারের আদেশের বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল কাজল বলেন, “সুপ্রিম কোর্ট ও হাই কোর্টে একই বিষয়ে কার্যক্রম বিচারাধীন থাকার পরও জিপিএইচ ইস্পাত নিম্ন আদালতে একটি টাইটেল স্যুট করেছেন। সেই মামলায় ইনজাংশন চেয়েছেন, যেন তাদের গ্রুপের নামে কমপক্ষে ২৫টি ব্যাংকের ২১০০ কোটি টাকা ঋণের বিষয়ে কোনো ধরনের সিআইবি রিপোর্টে ঋণ খেলাপি হিসেবে দেখানো না হয়।
“কিন্তু কোথাও উল্লেখ করেননি যে, একই বিষয়ে এর আগে হাই কোর্টে মামলা করেছিলেন, সেখানে আদেশ পেয়েছিলেন এবং পরে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত সেই আদেশ স্থগিত করেছিলেন। নিম্ন আদালত আবেদন গ্রহণ না করলে তিনি আবার হাই কোর্টে এসে একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রার্থনা করেন।"
বিষয়টি আদালতের নজরে আনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, “যে মুহূর্তে আমি এটা জানতে পেরেছি, আদালতের দৃষ্টিতে এনেছি।
"এত বড় দুটি প্রসিডিং সুপ্রিম কোর্টে পেন্ডিং থাকা সত্ত্বেও তারা নিম্ন আদালতের আরজিতে কোথাও উল্লেখ করেনি। এমনকি আদালতের সামনে নতুন করে যে নিষেধাজ্ঞা চেয়েছে, সেখানেও উল্লেখ করেনি।"
এটিকে ‘আদালতের প্রতি প্রতারণার শামিল’ বলে তুলে ধরে তিনি বলেন, “এটা চলতে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে আমরা এমন একটা সময়ে আছি, যখন প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সুনিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।"
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “আদালতের নির্দেশে বিষয়টি এফিডেভিট আকারে উপস্থাপন করা হলে বাদীপক্ষের আইনজীবীরা নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং জানান যে পূর্বের রিট ও আপিল বিভাগের আদেশ সম্পর্কে তারা অবগত ছিলেন না। অনেক সময় সুচতুর ব্যক্তিরা ভিন্ন ভিন্ন মামলায় ভিন্ন ভিন্ন আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন রাখেন–বিষয়টি আদালতকে জানানো হয়েছে।”
জরিমানার অর্থের ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আদালতের কাছে তথ্য গোপন করে আসার কারণে তাদের দৃষ্টান্তমূলক অর্থদণ্ডের আবেদন করা হয়। এই অর্থ ২০২৪ সালের জুলাই গণআন্দোলনে আহত শিক্ষার্থী ও নাগরিকদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্যয়ের প্রার্থনা করা হয়।
“আদালত আবেদন গ্রহণ করে এক মাসের মধ্যে পাঁচ কোটি টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রথমে ১৫ দিনের সময় দিলেও কোম্পানির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তা ৩০ দিন করা হয়েছে।"
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মাসুদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "বিষয়টি আদালতের নজরে আনার পর আপিলকারী পক্ষ আর আপিলটি চালাতে চায়নি। তবে রাষ্ট্রপক্ষ আদালতকে জানায়, বিষয়টি এভাবে শেষ হওয়া উচিত নয়; কারণ আদালতের কাছ থেকে তথ্য গোপনের অভিযোগটি বিচারিক নথিতে থাকা প্রয়োজন। এখানে আদালতের ওপর একটা ফ্রড করা হয়েছে। কেউ এভাবে পার পেয়ে গেলে আরও ১০ জন এই সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবেন।”
জিপিএইচ ইস্পাতের আইনজীবী মোহাম্মদ আক্তার হোসাইন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২১০০ কোটি টাকার ঋণখেলাপির বিষয়টি এভাবে দেখার সুযোগ নেই। এখানে অনেকগুলো ব্যাংক জড়িত। শুনানিতে সব ব্যাংকের হিসাব একত্র করে ওই অঙ্কের কথা বলা হয়েছে।
“আমাদের অনেক ব্যাংকের ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে এবং তারা ক্লিয়ারেন্স দিয়েছে। শুধু একটি ব্যাংকের ক্লিয়ারেন্স বাকি ছিল। সেই কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক সিআইবি রিপোর্ট দিয়েছে এবং ওই বিষয়েই আমরা হাই কোর্টে গিয়েছিলাম।”
রায়ের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে এই আইনজীবী বলেন, “পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি পাওয়ার পর আদালতের নির্দেশনা মক্কেলকে জানানো হবে। এরপর তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী আপিলসহ পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
রিট আবেদন এবং নিম্ন আদালতে মামলার প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর জিপিএইচ ইস্পাতের ঋণ নীতিগত সহায়তার (পলিসি সাপোর্ট) অংশ হিসেবে একই বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ হিসেবে শ্রেণিকরণ (ক্লাসিফিকেশন) না করার নির্দেশনা দেয়।
পরে ২০২৬ সালের ৩ জুন আরেকটি পলিসি সাপোর্ট এর আওতায় আরেক চিঠিতে সেই সুবিধার মেয়াদ ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ায়।
তবে কোম্পানিটির অভিযোগ, ওই নীতিগত সহায়তা কার্যকর থাকার পরও তাদের নাম বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি তা প্রকাশ করা হয়।
এ অবস্থায় সিআইবি ডেটাবেজে নাম অন্তর্ভুক্ত ও প্রকাশকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা চেয়ে ২০২৬ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করে জিপিএইচ ইস্পাত।
এরপর হাই কোর্ট গত ৭ জুলাই রুল জারির পাশাপাশি সিআইবি ডেটাবেজে কোম্পানির নাম প্রকাশের ওপর ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেয়।
ওই আদেশে এবি ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, সিটি ব্যাংকসহ প্রায় ২৫টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট শাখায় থাকা হিসাব অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক চেম্বার বিচারপতির আদালতে ‘সিভিল মিসলেনিয়াস পিটিশন’ দায়ের করলে ৯ জুলাই হাই কোর্টের স্থগিতাদেশের কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়।
পরে হাই কোর্টের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আপিল বিভাগে ‘সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল’ দায়ের করে, যা মূল রিট আবেদনের সঙ্গে এখনো বিচারাধীন।
চেম্বার আদালত হাই কোর্টের দেওয়া স্থগিতাদেশের কার্যকারিতা স্থগিত করার পরও ১২ জুলাই জিপিএইচ ইস্পাত একই বিষয়ে ঢাকার ৫ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে টাইটেল স্যুট (নং ২৫৬/২০২৬) দায়ের করে এবং অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চায়। ১৫ জুলাই আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দেন।
পরে নিম্ন আদালতের ওই আদেশের বিরুদ্ধে করা ‘ফার্স্ট মিসলেনিয়াস’ আপিলে আগের রিট আবেদন, চেম্বার বিচারপতির আদেশ এবং আপিল বিভাগে বিচারাধীন কার্যক্রমের তথ্য গোপন করা হয়েছে বলে রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ তোলে।
আদালত বিষয়টি লিখিতভাবে উপস্থাপনের নির্দেশ দিলে অ্যাটর্নি জেনারেল 'স্টেটমেন্ট অব ফ্যাক্ট' দাখিল করেন। সেই বক্তব্য ও নথিপত্র বিবেচনায় নিয়েই বুধবার হাই কোর্ট আপিল খারিজ করে জিপিএইচ ইস্পাতকে ৫ কোটি টাকা জরিমানার আদেশ দেয়।