১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতিতে ডিজেল খরচ ৩৯০% বেড়েছে: নাসিম মঞ্জুর

“একটি গুরুত্বপূর্ণ এফএসআরইউ বিকল হলে বিকল্প কী হবে, তার পরিকল্পনা থাকাটা দরকার ছিল,” বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 13 Aug 2026, 05:05 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:50 PM

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে নিজের তিন কারখানায় জুন-জুলাইয়ে অতিরিক্ত ১ লাখ ৩৬ হাজার ২১৪ লিটার ডিজেল ব্যবহার করতে হয়েছে বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ী নেতা সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর।

তার ভাষ্য, আগের তুলনায় ব্যবহার বেড়েছে ৩৯০ শতাংশ। 

নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি দেশের সরবরাহ সক্ষমতা নিয়ে আমদানিকারকদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। 

বৃহস্পতিবার ঢাকার মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার মিলনায়তনে এক আলোচনায় এমন পরিস্থিতি তুলে ধরেন নাসিম মঞ্জুর।

‘বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট: তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথ’ শিরোনামে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এ অনুষ্ঠান আয়োজন করে।

 লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর মনে করেন, সরকারের অপেক্ষায় বসে থাকলে বাংলাদেশের বেসরকারি খাত আজকের জায়গায় দাঁড়াত না। 

“আমরা সরকারের অপেক্ষায় না থেকেই নিজেদের উদ্যোগেই কাজ করি,” বলেন তিনি।

তার কোম্পানির কারখানাগুলো টেক্সটাইলের মতো জ্বালানিনির্ভর নয় মন্তব্য করে নাসিম মঞ্জুর বলেন, “আমরা খুব ছোট কারখানা। টেক্সটাইলের মতো এনার্জি ইনটেনসিভ না। আমাদের মতো ছোট জুতার কারখানায় যদি ৩৯০ শতাংশ বেড়ে যায়, তাহলে পরিস্থিতিটা বুঝতে হবে।”

জ্বালানি সরবরাহ কম থাকলে শিল্প খাতকে আগেই সময়সূচি জানিয়ে দেওয়ার দাবি জানান তিনি। 

এ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, “সবাইকে আপনি সবসময় বিদ্যুৎ দিতে পারবেন না। তাহলে কখন (সংকট) বাড়বে, আমরা সেভাবে সমন্বয় করব। 

“আমরা যদি জানি, রাত ১২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত, তাহলে আমরা আমাদের প্রোডাকশন শিফট করব। কিন্তু কখন পাব, এই নিশ্চয়তাটা আমাদের দিতে হবে।”

চাহিদা মতো গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পাওয়ার প্রভাব রপ্তানি বাজারেও পড়ছে বলে তার ভাষ্য।

তিনি বলেন, “ক্রেতার আত্মবিশ্বাসটা একটু কমছে। তারা বলছে, ‘তোমরা কী প্ল্যান দেখাবে আমাদেরকে, যে তোমরা নিশ্চিত করতে পারো নেক্সট সিজনে, নেক্সট অর্ডারে?”

ভিয়েতনামে শ্রমিক সংকটের মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। 

তবে জ্বালানির অনিশ্চয়তা থাকলে কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো সেই সুযোগ নিতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

শিল্পে অগ্রাধিকার চান ব্যবসায়ীরা

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে শিল্পের উৎপাদন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। 

তার দাবি, উচ্চমূল্যে গ্যাস কিনলেও শিল্পে সরবরাহ নিশ্চিত হচ্ছে না। গ্যাস না থাকলেও বিল দিতে হচ্ছে। আবার উৎপাদন না হওয়ায় শ্রমিকের বেতন ও ব্যাংকঋণের চাপও সামলাতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, “আপনি আমাকে গ্যাস দেবেন না, কিন্তু আমাকে পেমেন্ট করতে হচ্ছে।”

শিল্পে জ্বালানি সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে পারভেজ বলেন, তা না হলে উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে।

আগের বিভিন্ন পরিকল্পনার জবাবদিহিও চান তিনি। শিল্পে গ্যাস সরবরাহ, নতুন কূপ খনন, সিস্টেম লস কমানো ও টার্মিনাল স্থাপনে ঘোষিত পরিকল্পনার কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, তার হিসাব দরকার বলে মন্তব্য করেন বিসিআই সভাপতি।

বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। দেশীয় উৎপাদন ও দুটি এফএসআরইউ মিলিয়ে সরবরাহ হয় প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট। 

তার হিসাবে, দৈনিক প্রায় ১৩০ কোটি ঘনফুট ঘাটতির কারণে ৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকে।

এলএনজি আমদানি বাড়ানোর ঝুঁকি

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের শফিকুল আলম বলেন, বেশি দামে এলএনজি আমদানি বাড়ানো স্থায়ী সমাধান নয়। তার হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি করা এলএনজির জন্য ৩৫০ কোটি ডলারের বেশি খরচ হয়েছে। আমদানি আরও বাড়লে গ্যাসের দাম, ভর্তুকি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে।

গ্যাসের সিস্টেম লস কমানো, শিল্পে জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার এবং ছাদে সৌরবিদ্যুতের প্রসার বাড়ানোর উদ্যোগ এখনই নেওয়া দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ এফএসআরইউ বিকল হলে বিকল্প ব্যবস্থা কী হবে, তার জরুরি পরিকল্পনা থাকা দরকার ছিল। জ্বালানি তেল আমদানি ও বিতরণে বেসরকারি খাতকে বড় ভূমিকা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। এলপিজির বাজারে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্যের সময়ে সরকার নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি নিশ্চিত করা যায়নি বলেও তার বক্তব্য।

তিনি বলেন, “আমার তো সমস্যা এক জায়গায়, আমি সমাধান করছি আরেক জায়গায়।”