১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ থেকে ‘স্থিতিশীল’ করল মুডি’স

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ‘‘এই মূল্যায়নের ফলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনে সহায়তা করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে “

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ থেকে ‘স্থিতিশীল’ করল মুডি’স
ফাইল ছবি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 16 Sep 2026, 12:12 AM

Updated : 17 Sep 2026, 03:00 AM

বাংলাদেশের ঋণমান ‘নেতিবাচক’ থেকে ‘স্থিতিশীল’ করেছে আন্তর্জাতিক ঋণমাণ নির্ণয়কারী প্রতিষ্ঠান মুডি’স।

রাজনৈতিক ঝুঁকি কমে আসায় এবং বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ সন্তোষজনক অবস্থানে পৌঁছায় বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন মূল্যায়ন করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ঋণমাণ প্রতিষ্ঠানটি।

মঙ্গলবার প্রকাশিত মুডি’স বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী 'ইস্যুয়ার' এবং 'সিনিয়র আনসিকিউরড' রেটিংকে ‘বি২’ এবং স্বল্পমেয়াদী ইস্যুয়ার রেটিং নট প্রাইম ‘এ’ অপরিবর্তিত রেখেছে।

এর মানে হচ্ছে¬–বাংলাদেশের রেটিং এখনও বি২; অর্থাৎ রেটিংয়ের মান পরিবর্তন হয়নি। তবে আগে যেখানে অবনতির ঝুঁকি বেশি মনে করা হচ্ছিল (নেতিবাচক), এখন ঋণমান প্রতিষ্ঠানটি মনে করছে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক মুডি’সের সবশেষ মূল্যায়নকে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিবেচনায় ‘অত্যন্ত ইতিবাচক’ হিসেবে তুলে ধরেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘‘এই মূল্যায়নের ফলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনে সহায়তা করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। 

“মূডি’স রেটিংসের এই ইতিবাচক মূল্যায়ন সার্বভৌম ঋণমান উন্নয়নে এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে দেশের অর্থনৈতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’’

এর আগে গত ২৮ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করেছিল আরেক আন্তর্জাতিক ঋণমান কোম্পানি এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল।

অপরদিকে ১৩ মে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক ঋণ মান সংস্থা ফিচ রেটিংও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করেছিল।

সিঙ্গাপুর থেকে মঙ্গলবার প্রকাশিত মুডিসের সবশেষ এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব ঝুঁকির কারণে আগে বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস নেতিবাচক বা ঋণাত্মক করা হয়েছিল, বি২ রেটিং পর্যায়ে তা এখন অনেকটাই সুষম বা ভারসাম্যপূর্ণ হয়েছে।

এর আগে ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে মুডি’স বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ঋণমান কমিয়েছিল; ‘বি১’ থেকে কমিয়ে ‘বি২’ তে এনেছিল। অর্থাৎ 'স্থিতিশীল' থেকে 'নেতিবাচক (ঋণাত্মক)' করেছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নেতিবাচক’ থেকে বাংলাদেশের ঋণমানের দৃষ্টিভঙ্গি ‘স্থিতিশীল’ করার সিদ্ধান্তটি প্রতিফলিত করে যে, নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে থাকা তীব্র রাজনৈতিক ও বৈদেশিক চাপ এখন অনেকটাই কমেছে। ফলে বি২ রেটিংয়ের পর্যায়ে ঝুঁকিগুলো এখন তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ।

“তবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা এখনও রয়ে গেছে।”

আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ণয়কারী প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, নির্বাচনের পর ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সরকারের শক্তিশালী ম্যান্ডেট রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কমিয়েছে।

একই সময়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের অবস্থারও উন্নতি হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন, আরও নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা এবং রেকর্ড পরিমাণ রেমিটেন্স এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

“বিশেষ করে, রেমিটেন্সের ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহ জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাতে বাংলাদেশকে সহায়তা করেছে।”

প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের অব্যাহত সম্পৃক্ততা বৈদেশিক অর্থায়ন ও সংস্কার কার্যক্রমের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

“তবে সংস্কারের গতি নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে এবং পরবর্তী আইএমএফ কর্মসূচির শর্তাবলি নিয়েও আলোচনা চলমান রয়েছে।”

রিজার্ভ বাড়লেও জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি ধীর

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের শেষে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ ছিল ২১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৬ সালের মাঝামাঝিতে এসে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে। এই রিজার্ভ দিয়ে চার মাসেরও বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।

এ পরিস্থিতির উন্নতির পেছনে বৈধ বা ব্যাংকিং চ্যানেলে রেকর্ড পরিমাণ রেমিটেন্স প্রবাহ, নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা এবং বাজারে পূর্বে বিদ্যমান অসঙ্গতি দূর করাকে প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে মুডি'স।

প্রতিষ্ঠানটির আশা, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪.১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা ৪.৩ শতাংশে পৌঁছাবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।

“পরবর্তীতে বিনিয়োগ ও শিল্প কারখানার কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক হলে ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে প্রবৃদ্ধি বেড়ে প্রায় ৪.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।”

প্রতিবেদনে বলা হয়, উচ্চ আমদানি ব্যয়, গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং তৈরি পোশাক খাতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ থাকার পরও অর্থনীতিতে মৌলিকভাবে কিছুটা স্থিতিস্থাপকতা দেখা যাচ্ছে।

“রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয় ব্যক্তিগত ভোগব্যয়কে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী রাখতে সহায়তা করছে। একই সঙ্গে বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের পরও তৈরি পোশাক খাত এখনো দেশের রপ্তানির প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে এবং এরপর ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে।”

ব্যাংকিং খাত

সার্বিক পূর্বাভাসে উন্নতি হলেও সংকুচিত রাজস্ব ভিত্তি, ঋণ পরিশোধের দুর্বল সক্ষমতা এবং ব্যাংকিং খাতের চরম ভঙ্গুরতার কথা তুলে ধরে বাংলাদেশের মূল ঋণমান 'বি২'-তেই বহাল রেখেছে মুডি‘স।

প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, সাম্প্রতিক সংস্কারের ফলে পুরো ব্যাংকিং খাতে ৩২.৮ শতাংশ খেলাপি ঋণের চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। একইসঙ্গে ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা বজায় রাখতে¬–জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ মূলধন পুনর্গঠন বাবদ জোগান দেওয়ার প্রয়োজন হবে।

“সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা এবং অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর সরকারের ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার কারণে মূলধন পুনর্গঠনের এই বিশাল চাহিদা সরকারের বাজেটের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।”

তবে এ সময়ে ব্যাংকিং খাতের তারল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল ছিল। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বার্ষিক আমানত প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, ব্যাংকিং খাতের মূল সমস্যা তারল্য সংকট নয়, বরং স্চ্ছলতা ও মূলধনের অভাব।

রাজস্ব আদায় 

প্রতিবেদনে বলা হয়, মুডি’স যেসব দেশের ঋণমান নির্ধারণ করে তাদের মধ্যে বাংলাদেশের সরকারি রাজস্ব সংগ্রহের ভিত্তি সবচেয়ে কম, যা সরকারের রাজস্ব সংক্রান্ত নমনীয়তাকে সংকুচিত করে রাখছে। মোট সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশের সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও অর্জিত সরকারি রাজস্বের প্রায় ৩০ শতাংশই চলে যাচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধে।

প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি অব্যাহত থাকা এবং ব্যাংকিং খাতকে সুরক্ষা দিতে অতিরিক্ত খরচের সম্ভাবনার কারণে মধ্যমেয়াদে সরকারের সার্বিক ঋণের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়বে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।

এছাড়া চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ঘাটতির সঙ্গে বিগত সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের মাঝে ঘাটতি অব্যাহত থাকা এবং ব্যাংকিং খাতকে সুরক্ষা দিতে অতিরিক্ত খরচের কারণে মধ্যমেয়াদে সরকারের সার্বিক ঋণের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়বে বলে পূর্বাভাসে বলেছে মুডি’স।

“অবশ্য নমনীয় বা সহজ শর্তের ঋণ সুবিধা অব্যাহত থাকলে তা সরকারের ঋণ গ্রহণের ব্যয় ও পুনঃঅর্থায়নের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করবে।”

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করল ফিচ