Published : 26 May 2026, 12:21 AM
প্রত্যাশিত দামে কোরবানির গরু-ছাগল বেচতে এখন আর শুধু ভালো দরকষাকষি জানলেই চলে না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পশুর পরিচিতিও থাকতে হয়।
এই পরিচিতি নির্ভর করে পশুটি অনলাইন দুনিয়ায় কতজনের কাছে পৌঁছালো, কতজনের কাছে সেটি ভালো লাগলো কিংবা কতজন পশুটি চিনল— এ ধরনের নানা মানদণ্ডের ওপর।
এই চেষ্টায় সফল হতে গিয়ে গরুর ছবি তোলা হচ্ছে; ভিডিও করা হচ্ছে; আছে ড্রোনের ব্যবহারও। প্রচার বাড়াতে কেউ কেউ ফেইসবুক বুস্টিংয়ে পয়সাও খরচ করছেন।
মাংস ব্যবসায়ী উজ্জ্বল এবার গরু ব্যবসায় নেমেছেন। কোরবানির ঈদ উপলক্ষ্যে প্রায় ৭০টি গরু কিনে এনেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। মিরপুর ১২ নম্বরের ইস্টার্ন হাউজিং গরুর হাটে তার তাবু।
এক ভিডিও নির্মাতাকে দিয়ে হাটে গরুর ভিডিও বানিয়েছেন তিনি। ফেইসবুকে নিয়মিত সেগুলো প্রচার করেন।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, গরুকে দৌড়ানো হচ্ছে; লাফানোর চেষ্টা করানো হচ্ছে। ভিডিওর ক্যাপশন লেখা, ‘মাথা নষ্ট করা দামে উজ্জ্বল ভাইয়ের কোরবানি গরু’।
সংলাপ শুরু হয় ‘তিরিং বিরং করা গরু, পাগলা গরু’ দিয়ে।
ভিডিওতে দামও জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সঙ্গে বলা হচ্ছে, ভিডিও দেখে যারা গরু কিনতে আসবেন, তাদের জন্য দাম কম রাখা হবে।
অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কোরবানির পশু বিক্রিতে নানা প্যাকেজও আছে। যেমন— ভাগে কোরবানি দেওয়া যাচ্ছে কিংবা কসাইও মিলছে।
গরু বিক্রির আরেক ভিডিওতে দেখা যায়, আলোকসজ্জাসহ নানাভাবে খামার সাজানো হয়েছে। গলা ও মাথায় মালা পড়িয়ে সারিবদ্ধভাবে গরুগুলোকে দাঁড় করানো হয়েছে ভিডিও করার জন্য। পেছনে বাজছে কাওয়ালি গান।
এসব ভিডিওর লাইভে ভেসে উঠছে নানা মন্তব্য। কেউ বলছেন— ‘খুব সুন্দর দাম বলছেন’, কেউ জানতে চাইছেন ওজন; কেউ আবার শুনতে চাইছেন বিক্রি হয়ে গেছে কিনা।
খামারিরা বলছেন, এখন শুধু হাটে গরু তুললেই হয় না, অনলাইনে পরিচিতিও তৈরি করতে হয়।
কেরানীগঞ্জের কলমারচর গ্রামের মনির এগ্রোর মালিক মনির হোসেন। তার দুই ডজনের বেশি গরু রয়েছে। দুটি আছে ‘লক্ষ্মী’ ও ‘সুন্দরী’ নামে।
‘ভাইরাল’ দাবি করা ‘লক্ষ্মীর’ দাম চাইছেন ২০ লাখ; ‘সুন্দরী’ দাম হাঁকাচ্ছেন ১০ লাখ। গরু বিক্রির ফেইসবুক পেইজও রয়েছে তার।
রোববার কেরানীগঞ্জের ঘাটারচরের সুলতানি হাটে তার দুই ‘ভাইরাল’ গরু দেখা যায়। এগুলো দেখতে অনেকেই ভিড় করেছেন। কেউ কেউ ছবি তুলছেন, ভিডিও করছেন।
মোজাফ্ফর আহদেম নামে একজন বলেন, “হাটে ভাইরাল গরু দেখতে এসেছি। ফেইসবুকে দেখার পর বাস্তাবে দেখতে এলাম। ফেইসবুক রিলস বানাব।”
হাটে আরো কয়েকটা ‘ভাইরাল’ গরু আছে বলে জানান তিনি।
খামারি মনির হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখন অনেক ক্রেতা আগে অনলাইনে গরু বাছাই করেন, ভিডিও দেখে শর্টলিস্ট তৈরি করেন, পরে সরাসরি গিয়ে সিদ্ধান্ত নেন।
“আগে হাটে ভালো জায়গা পেলে প্রত্যাশিত দামে বিক্রি করা যেত। এখন ফেইসবুকে ‘রিচ’ না থাকলে ক্রেতারা চিনবেই না।”
দেশে অনলাইনে পশু কেনা-বেচা বেড়ে যায় মূলত কোভিড মহামারীর মধ্য দিয়ে। মহামারী বিদায় নিলেও সেই প্রবণতা কমেনি।
অনলাইনে কেনাবেচার কারণে এখন মানসম্মত কোরবানির পশু বাছাইয়ের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে।
একসময় মানুষ কোরবানির হাটে গিয়ে মানুষ গরুর দাঁত দেখত, জাত দেখত, সুস্থতা দেখত। কিন্তু অনলাইনে কিনতে গিয়ে মানুষ এগুলো এখন যতটা পরখ করে, তার চেয়ে বেশি মনোযোগ দিচ্ছ ‘রিভিউয়ের’ দিকে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিতি পশুর দামে প্রভাব ফেলছে।
দেশে কোরবানির পশু বিক্রির অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি ‘গরুরহাট ডটকম’। এখানে শ্রেণিভিত্তিক লাইভ ওয়েট (প্রকৃত ওজন) এবং দাম নির্ধারণ করে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের পশু বিক্রি হয়।
তাদের মূল বিক্রয়কেন্দ্র পাবনার ভাঙ্গুড়া থানায়। তারা শুধু পশুই বিক্রি করে না, গো-খাদ্য থেকে শুরু করে গরুর দুধের তৈরি মিষ্টান্নও বেচে।
‘গরুরহাট ডটকম’ এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা সাগর আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অনলাইনে মানুষ বড় গরু কম কেনে। দেখা যাচ্ছে, দেড় লাখ টাকার নিচের গরুগুলোর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এই গরুগুলো আমাদের কোরবানির এক মাস আগেই বিক্রি হয়ে গেছে।”
ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ এস এম আসিফ বিন ইউসুফ বলেন, “প্রযুক্তির কল্যাণে কোরবানির পশুর বাজার এখন স্মার্টফোনের স্ক্রিনে।”
ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (এনএসডিএ) এ প্রশিক্ষক বলেন, “একসময় মানুষ হাটে গিয়ে গরু দেখত। এখন মানুষ গরুর ভিডিও ‘স্ক্রল’ করে। আগে যেখানে গরুর গুণগত মান বোঝাতে মুখের কথাই ভরসা ছিল, এখন সেখানে কাজ করছে ‘ভিউ’, ‘শেয়ার’, ‘ফলোয়ার’ কিংবা অনলাইন রিচ’।”
যুক্তরাষ্ট্রের রুটস ম্যানেজমেন্টের বাংলাদেশ প্রতিনিধি ইউসুফ বলেন, “৬০ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বাজারে প্রযুক্তির বিপ্লব আসছে। ভবিষ্যতে ডেডিকেটেড অ্যাপ, ব্লকচেইন ট্র্যাকিং, এআই-ভিত্তিক পশু স্বাস্থ্য ও ওজন মূল্যায়ন এবং কিস্তি সুবিধাসহ পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম তৈরি হবে।
“সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফলে কোরবানির পশুও এখন কেবল ধর্মীয় অনুষঙ্গ নয়; সেটি সামাজিক মর্যাদা, প্রদর্শন ও ডিজিটাল পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠছে।”