Published : 02 Aug 2025, 01:23 AM
বাংলাদেশি পণ্যের ওপর থেকে মার্কিন শুল্কের হার কমিয়ে আনার বিষয়টিকে অন্তর্বর্তী সরকারের মতো অনেকেই দেখছেন ‘গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বিজয়’ হিসেবে।
বিপরীত প্রতিক্রিয়া জানানো লোকজনও আছে, যাদের কেউ কেউ বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন কী কী শর্তে বাংলাদেশকে আমদানি শুল্কে ছাড় দিল, তা জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিত।
কেউ কেউ আবার বলছেন, ছাড় দেওয়ার পেছনে যদি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি কোনো শর্ত থাকে, তাহলে সেটা ‘চিন্তার বিষয়’।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর গত ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর চড়া হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের ঘাড়ে পড়ে ৩৫ শতাংশ।
পরে দুই দেশের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয় বাংলাদেশ।
মার্কিন কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণা আসে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, সয়াবিন তেল ও তুলা আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা আসে ছয় শতাধিক মার্কিন পণ্যে।
এরপর দুই দেশের প্রতিনিধি দলের কয়েক দফা বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার শুল্কের হার কমিয়ে ২০ শতাংশের ঘোষণা দেয় ওয়াশিংটন।
শুল্কে ছাড় দেওয়ার ঘটনাকে বড় ধরনের সাফল্য বলে দাবি করছেন প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যরা।
শুক্রবার এক বার্তায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তি নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশের শুল্ক আলোচক দলকে আমরা গর্বের সঙ্গে অভিনন্দন জানাই, যা এক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বিজয়।”
শুল্কে ছাড় পাওয়ার বিষয়টি ‘সুখবর’ হিসেবে দেখছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্কে আলোচনা স্থির হয়েছে, তা বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই একটি সুখবর। কারণ আমাদের ওপরে যে শুল্ক আরোপ হয়েছে, তা আমাদের প্রতিযোগী ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রায় সমান।”
শফিকুল আলম বলেন, “রপ্তানি বাজারে আমাদের প্রতিযোগী রাষ্ট্র ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারত, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় কাছাকাছি পরিমাণ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ভারতে বরং কিছুটা বেশি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।”
ওয়াশিংটনে আলোচনায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের প্রশংসা করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।
শুক্রবার ফেইসবুক পোস্টে তিনি বলেন, “বাণিজ্য উপদেষ্টা শুল্ক আলোচনার মাধ্যমে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন।”
আরেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, “১৫ শতাংশ কমিয়ে বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ২০ শতাংশ, যা আরো একটি সাফল্য।”
নানা প্রতিক্রিয়া সোশাল মিডিয়ায়
বাংলাদেশি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ছাড়ের ঘোষণায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া আসছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে।
শুল্কে ছাড় পেতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কী কী ধরনের সুবিধা দিতে হবে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন লেখক-গবেষক আলতাফ পারভেজ।
ফেইসবুকে তিনি লিখেছেন, “এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশ কী কী সুবিধা দিচ্ছে, সেটা কেউ বলছেন না বিস্তারিত। সেটাও কিন্তু বিশেষভাবে জানা দরকার সকলের। মুদ্রার দুই দিকই দেখা দরকার নয় কি? সব কিছুর জন্য নাগরিকদের মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা দরকার কিন্তু।”
তিনি লিখেছেন, “যারা আজ সুসংবাদ দিচ্ছেন, তারা কেউ বলছেন না, এনডিএ (নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট) তথা একটা গোপনীয়তার আওতায় সমঝোতা হলো।
“বাংলাদেশের জনগণ কিন্তু জানতে পারল না, কী কী শর্তে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যে শুল্ক ছাড় দিল। যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিতভাবেই দর কষাকষির আওতায় তার প্রত্যাশিত চাওয়া পেয়েই শুল্ক কমিয়েছে।”
কারো মতে, এই চুক্তি গোপন রাখাই স্বাভাবিক। নীতিগত কারণেই তা প্রকাশ করতে হয় না বলে মনে করেন তারা।
সাংবাদিক কামাল আহমেদ বলছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে এনডিএর কথা বলা হচ্ছে সেটা আসলে কী? বাণিজ্য আলোচনার সময়ে দর কষাকষির কোনো তথ্য প্রকাশ না করার শর্ত, নাকি কোনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি?”
তিনি বলেন, “দর কষাকষির তথ্য আলোচনার সময় গোপন রাখার শর্ত একটি স্বাভাবিক ব্যাপার, যেন প্রতিদ্বন্দ্বীরা কোনো সুযোগ নিতে না পারে। (এরকম এনডিএ চুক্তি পেশাগত অনেক কাজের জন্য আমাকেও করতে হয়। কাজ হয়ে যাওয়ার পর তার বিস্তারিত প্রকাশে আর কোনো বাধা থাকে না)।
“কিন্তু বিষয়টি যদি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কোনো বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি শর্ত হয়, যেমনটি ছিল ভারত-বাংলাদেশ ২৫ বছরের মৈত্রী চুক্তি, তাহলে সেটা অবশ্যই চিন্তার বিষয়। সুতরাং নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট কী নিয়ে, সেটা স্পষ্ট হওয়া দরকার।“
কেউ বলছেন, আগামীতে দেশের রপ্তানি খাত প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বেশি বেকায়দায় পড়ে যাবে।
লেখক কল্লোল মুস্তাফা ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, “রপ্তানি খাতকে অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের চেয়ে বাড়তি অসুবিধায় পড়তে হবে। এই সিদ্ধান্ত দুটি হলো- এক. অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক চট্টগ্রাম বন্দরের মাশুল গড়ে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত, দুই. বেসরকারি কনটেইনার ডিপোর (আইসিডি) মাশুল ৩০ থেকে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত।“
পোস্টে তিনি আরো বলেন, “এই দুটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে আমদানি খরচ যেমন বাড়বে, তেমনি রপ্তানিকারকদের বাড়তি মাশুল দিতে গিয়ে প্রতিযোগিতায় অন্যান্য দেশের চেয়ে পিছিয়ে পড়তে হবে।
“এই পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত, চট্টগ্রাম বন্দরের মাশুল বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা এবং বেসরকারি কনটেইনার ডিপোর মালিকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাদের মাশুল বৃদ্ধি সহনশীল পর্যায়ে নামিয়ে আনা।“
লেখক হাসান মুর্শেদ ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন , “স্বল্পমেয়াদি শুল্ক ছাড় পেতে গিয়ে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক ঋণ, আমদানি ব্যয় ও সামরিক নির্ভরতার ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্টের তথ্য জনগণের জ্ঞাত বহির্ভূত, যা স্বচ্ছতার পরিপন্থি।
“বাংলাদেশ বেসামরিক ও সামরিক প্রয়োজনে ২৫টি বোয়িং বিমান কিনবে, যার ব্যয় ধরা হচ্ছে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার। প্রতিটি বিমানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচও যুক্ত হবে। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের ২৫টি বোয়িংয়ের আদৌ দরকার আছে কিনা?”
তিনি বলেন, “তুলা, গম, সয়াবিন তেলসহ বেশ কিছু কৃষিপণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনতে হবে, যা বাংলাদেশ সাধারণত কম দামে ভারত, ব্রাজিল বা রাশিয়া থেকে পেত। এর সঙ্গে যুক্ত হবে অধিকতর পরিবহন খরচ।“
আরও পড়ুন
বাংলাদেশি পণ্যে ২০% সম্পূরক শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের