Published : 19 Jul 2026, 11:13 PM
দেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর নীতিমালা শুধু আমলাদের দিয়ে বানালে ‘কাজ হবে না’ বলে মনে করেন আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মানোয়ার হোসেন।
তার পর্যবেক্ষণ হল, বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে ব্যবসায়ীদের মতো মাঠপর্যায়ে কাজ করা মানুষের সঙ্গেও সরকারকে বসতে হবে।
তবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশে এক ধরনের স্থিতিশীলতা ফিরেছে বলে মনে করেন এ শিল্পমালিক।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নিয়মিত আয়োজন চিনওয়্যাগ উইথ দ্য চিফস অনুষ্ঠানে এসব অভিমত তুলে ধরেন মানোয়ার হোসেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেইসবুক পেইজে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করা হয়, যেখানে অবকাঠামো খাত, শ্রমবাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাব ও অর্থপাচারসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন তিনি।
দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের বর্তমান পরিবেশ মূল্যায়ন করতে গিয়ে মানোয়ার হোসেন বলেন, "ব্যবসার পরিবেশে পরিবর্তনের চেয়ে বেশি যেটা দেখছি— একটা স্থিতিশীলতা চলে আসছে। মানুষের প্রত্যাশা ও রাজনীতিতে একটা গণতন্ত্র আসছে।
“আমাদের মধ্যে যে একটা দ্বিধা ছিল, কোথায় যাচ্ছি, কী হচ্ছে না হচ্ছে, সেটা দূর হয়ে গেছে। তবে ব্যবসা এত তাড়াতাড়ি ঘুরে দাঁড়াবে বলে আমার মনে হয় না। কিন্তু এটার প্রভাব আস্তে আস্তে ব্যবসায় আসা শুরু করবে। তখন হয়তো মানুষ আবার বিনিয়োগ করবে, ব্যবসা আরেকটু বাড়বে। এখনকার কথা যদি বলেন, আমরা সাংঘাতিক রকম একটা চ্যালেঞ্জের পর্যায়ের মধ্যে আছি।"
বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, "বিনিয়োগ জিনিসটা খুব সহজ একটা শব্দ, কিন্তু এটাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া খুব কঠিন।
"এই জায়গায় শুধু সরকার একা, আমলারা একা যদি পলিসি তৈরি করা শুরু করে, তাহলে কাজ হবে না।”
তিনি বলেন, "আমরা যারা প্রকৃতপক্ষে মাঠপর্যায়ে কাজ করছি, যারা ব্রিজের মতো কাজ করি, আমাদের সঙ্গে কথা বললে সরকারের কাজ করা সহজ হবে; বন্ধ হয়ে যাওয়া অর্থনীতির চাকা চালু করা আরো বাস্তবসম্মত হবে, আরো দ্রুত হবে।”
দেশের অর্থনীতির বর্তমান যে শ্লথ গতি, তার সূত্রপাত কোভিড মহামারীর সময় থেকে শুরু হয় বলে মনে করেন মানোয়ার হোসেন।
এরপর একের পর প্রতিবন্ধকতা সামনে আসে মন্তব্য করে তিনি বলেন, "আপনি যদি ব্যবসায়ীদের কথা বলেন, আমার মনে হয়, ৯০ শতাংশ ব্যবসায়ী বলবে যে ব্যবসার অবস্থা 'বেশি ভালো নাই’। তো এতগুলো লোক নিশ্চয়ই সাফার করছে বলেই এরকম বলছে।

"এখন আমার ব্যবসা যদি ভালো চলে, আমি যদি বলি যে খারাপ চলছে, তাহলে এটার ওপর থেকে আল্লাহর রহমতও চলে যাবে, এটাই আমরা বিশ্বাস করি। এর মানে হচ্ছে, প্রকৃত অর্থে (ব্যবসা) খারাপ চলছে।"
এর কারণ তুলে ধরতে গিয়ে দেশ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ পাচার হয়ে যাওয়ার কথা সামনে আনেন তিনি।
মানোয়ার হোসেন বলেন, "আমরা সংবাদপত্রে পড়ি, সংসদে শুনি— অনেক অনেক টাকা বাংলাদেশ থেকে চলে গেছে। তো বাংলাদেশে তো একটা ভ্যাকুয়াম রয়ে গেছে। এই ভ্যাকুয়ামটা কিন্তু প্রত্যেকের ওপর প্রভাব ফেলছে, কোনো না কোনোভাবে।”
বিগত কয়েক বছরের ‘ভুল নীতি’ ও অর্থনৈতিক চাপ দেশের ইস্পাত ও আবাসন খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন মানোয়ার হোসেন।
তার মতে, ইস্পাত শিল্পের অর্ধেকের বেশি উৎপাদন সক্ষমতা এখন অলস পড়ে আছে।
"আপনি যত দিন হারাচ্ছেন, আপনি কিন্তু ততগুলো মেশিন বন্ধ করছেন। আমি স্টিল ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে জড়িত, আমার মনে হয় যে আমাদের অন্তত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কারখানা বন্ধ আছে।”
তার পরামর্শ হল, “খুব তাড়াতাড়ি কীভাবে দেশের কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রিটাকে গতিময় করা যায়, সেদিকে সরকারকে নজর দিতে হবে। শুধু ট্যাক্স বাড়ালে কিন্তু আপনার টোটাল ট্যাক্স বাড়ে না। ট্যাক্স কমিয়েও বা পুরোপুরি মওকুফ করে দিয়েও আয় বাড়ানো সম্ভব।"
এ খাত থেকে কর মওকুফের দাবি তুলে তিনি বলেন, "আমি খুব পরিষ্কারভাবে অর্থমন্ত্রীর কাছে হাতজোড় করে বলছি , আপনি অবকাঠামো খাতকে পুরোপুরি, দরকার হলে পাঁচ বছরের জন্য বা দুবছরের জন্য ট্যাক্স ফ্রি করে দিন।”
গেল মাসে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। এই বাজেটকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও এতে অনেক ‘গভীর সমস্যা’ সরকারের নজর এড়িয়ে গেছে বলে মনে করেন মানোয়ার হোসেন।
তিনি বলেন, "আমার কাছে তো মনে হচ্ছে যে এটা একটা ভালো বাজেট, সুন্দর বাজেট। কিন্তু এটার পরীক্ষা তো শুরু হলো। এইটা কতটুকু আমাদের প্রয়োজন পূরণ করতে পারছে, সেটা বোঝা যাবে সামনের দিনগুলোতে।
"সরকার হয়ত যা করেছে, ভালোই করেছে। কিন্তু সম্ভবত এর থেকে সংকটগুলো আরো অনেক গভীর। উনারা যতটুকু দেখতে পারছেন খালি চোখে, তারচেয়ে অনেক বেশি গভীর।"
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ দেশের অর্থনীতিতে বড় ক্ষত। অনেকেই এর জন্য একচেটিয়াভাবে ব্যবসায়ীদের দায়ী করলেও মানোয়ার হোসেনের বোঝাপড়া খানিকটা ভিন্ন।
তার মতে, ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপির সংখ্যা নগণ্য, বরং বেশির ভাগ ব্যবসায়ী বিগত সরকারের ভুল নীতি ও জ্বালানি সংকটের কারণে দেউলিয়া হয়ে গেছেন।
"উদ্যোক্তাদের সবাইকে আমি দোষ দেব না। কিন্তু দু-চার-পাঁচজনের জন্য পুরো শ্রেণিটাকেই দেশের শত্রু হিসেবে দেখা হচ্ছে।"
তিনি বলেন "একজন ব্যবসায়ী যখন প্রজেকশন তৈরি করেন, তিনি চিন্তা করেন, ৩৩০ দিন বিদ্যুৎ পাবেন, গ্যাস পাবেন, টাকার অবমূল্যায়ন হবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই, টাকার মূল্য নেই।"
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিকাশ বাংলাদেশের শ্রমবাজারে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়েও নিজের চিন্তাভাবনা তুলে ধরেন মানোয়ার হোসেন।
তিনি বলেন, "এক নম্বর কথা হচ্ছে, এই পরিবর্তনটা খুবই বাস্তব। আপনাকে এটা মেনে নিতে হবে। এআই প্রযুক্তি মানুষকে আরো দক্ষ করতে সাহায্য করবে এবং কস্ট কমাতে সাহায্য করবে।
"অনেকেই এটাকে ভয়ের চোখে দেখছে, কিন্তু আমরা এটাকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। আমরা বিশ্বাস করি, আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে আনোয়ার গ্রুপে মানুষ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একটা সমন্বয় দেখা যাবে।”

শ্রমের মূল্য কম হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে একটা সুবিধা পায় বাংলাদেশ। তবে এই সুবিধার উল্টো দিকও দেখছেন মানোয়ার হোসেন।
তিনি বলেন, "বাংলাদেশের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ আছে। আমরা তো দেশকে সস্তা শ্রমের দেশ হিসেবে তুলে ধরতে খুব পছন্দ করি।
"এই জায়গা থেকে আমরা যদি বেরিয়ে আসতে না পারি, তাহলে আমাদের জন্য খুব অসুবিধা হবে।"
এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, "মধ্যপ্রাচ্যে অনেক বাঙালি গাড়ি চালকের চাকরি চলে যাচ্ছে। কারণ ওদিকে নারীরা গাড়ি চালাচ্ছেন। আবার স্বয়ংক্রিয় গাড়ি চলে আসছে। এসব মানুষকে শ্রমবাজারে পুনর্বাসন করতে হবে।”
নানা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও দেশের শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশার কথা শুনিয়েছেন মানোয়ার হোসেন।
"আমি সবসময় আশাবাদী। আমি কখনো আশাহীন হতে পারি না। আশাহীন হয়ে গেলে আমার ১৪ হাজার লোক কাল হতাশায় ভুগবে।”
দীর্ঘ ৬০ বছরের বেশি সময় ধরে বাজারে আছে আনোয়ার গ্রুপ। ‘৬০০ গ্রেড’ রডসহ তাদের ৩৬টি পণ্য রয়েছে। ভবিষ্যতে কৃষিভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
এ বিষয়ে মানোয়ার হোসেন বলেন, "আমাদের মূল ব্যবসা হচ্ছে টেক্সটাইল, এটা থাকবে। তবে এখন আমরা খুব মন দিতে চাচ্ছি কৃষির দিকে।“
বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে কেউ উদ্যোক্তা হতে চাইলে কী কী প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়বেন, সেই প্রশ্নে তিনি বলেন, "নতুন উদ্যোক্তাদের আমি একটা কথাই বলি যে, কপি-পেস্ট মেন্টালিটিতে যেও না। বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের একটা প্রজন্ম ‘কপি-পেস্ট ফিলোসফিতে’ গিয়ে নিজেদের টাকা ধ্বংস করেছে, ব্যাংকের টাকা ধ্বংস করেছে।
"তোমার ভেতরে যেটা আছে, তুমি যেটার প্রতি প্যাশনেট, সেটা করো। কঠোর শ্রম ছাড়া কোনো গতি নাই। শর্টকাটে বড়লোক হওয়া যায়, এমন কিছু আমার অভিধানে নাই।”
নতুন উদ্যোক্তাদের প্রতি তার পরামর্শ হলো, “একটা ব্যবসা শুরু করবা, দুই-চার-পাঁচ বছর লাগবে প্রতিষ্ঠিত হতে, কিন্তু হাল ছেড়ে দিও না।
"আমার বয়স প্রায় ৫৮, সাড়ে ৫৮ বছর। আমি এখনো সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত কাজ করবই। তো কঠোর পরিশ্রম ছাড়া গতি নাই।”