এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে বাড়ল ২০ টাকা
ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের নতুন দর সোমবার থেকে কার্যকর হবে।
চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার।
নতুন দর অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৬০ টাকায় বিক্রি হবে।
রোববার রাতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জ্বালানি তেলের নতুন দাম নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সোমবার থেকে এ দর কার্যকর হবে।
সবশেষ জুনে তিন ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। ডিজেল ১১৫ টাকায় অপরিবর্তিত রেখে কেরোসিন ১৩০ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা থেকে ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪০ টাকা থেকে ১৪৫ টাকা করা হয়।
এরপর জুলাই, অগাস্ট ও সেপ্টেম্বরেও সেই দাম বহাল ছিল।
গেল এপ্রিলের পর সরকার আবার এক লাফে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এত বেশি বাড়াল।
কেন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হল? সেই ব্যাখ্যা দিয়ে একই দিন সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয় বলছে, পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও সরকার দেশে সেই হারে দাম বাড়ায়নি বলে বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, মার্চ থেকে অগাস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনুযায়ী শুধু ডিজেলেই বিপিসির লিটারপ্রতি প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছে দাবি করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দৈনিক এ লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা।
এ হারে এক বছরে শুধু ডিজেলেই প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হবে বলেছে মন্ত্রণালয়।
লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ানোর ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে সরকার মনে করছে।
দাম বাড়ানোর আরেকটি কারণ হিসেবে অন্য দেশের সঙ্গে দামের ব্যবধান তুলে ধরা হয়।
মন্ত্রণালয়ের দেওয়া হিসাবে, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ভারতের কলকাতায় ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা এবং শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা।
থাইল্যান্ডে এ দাম ১৫১ টাকা ২২ পয়সা, ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০ টাকা ৭১ পয়সা, ফিলিপাইনে ১৬৮ টাকা ৫৩ পয়সা, পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪৪ টাকা ৭৯ পয়সা।
বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, দেশে জ্বালানি তেলের দাম তুলনামূলক কম থাকায় অন্য দেশে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে এলএনজি খাতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ব্যয়ের কথাও দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে সরকার।
রোববারের গেজেটে জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য কাঠামোর বিস্তারিত দেওয়া হয়েছে।
সেখানে ডিজেলের কর-উত্তর এক্স-রিফাইনারি বা শোধনাগার থেকে খালাস হওয়া মূল্য লিটারপ্রতি ১২৩ টাকা ৫৮ পয়সা ধরা হয়েছে। কেরোসিনে তা ১৪৩ টাকা ৭৮ পয়সা, অকটেনে ১৪৯ টাকা ৭৮ পয়সা এবং পেট্রোলে ১৪৪ টাকা ৯৯ পয়সা।
এর সঙ্গে ব্যবসায়ী পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট, শুল্ক, তেল বিপণন কোম্পানির মার্জিন (লাভ), সমান পরিবহন ভাড়া তহবিল ও বিপিসির উন্নয়ন তহবিলের অর্থ যোগ করা হয়েছে।
এসব যোগ করে মূল স্থাপনা কেন্দ্র মূল্য দাঁড়িয়েছে ডিজেলে ১৩০ টাকা ১৩ পয়সা, কেরোসিনে ১৫০ টাকা ৮২ পয়সা, অকটেনে ১৫৭ টাকা ১২ পয়সা এবং পেট্রোলে ১৫২ টাকা ২৩ পয়সা।
ডিপো থেকে ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে ডিলারের স্থানীয় পরিবহন খরচ রাখা হয়েছে সব ধরনের তেলে লিটারপ্রতি ১ টাকা ১৬ পয়সা।
ডিলার ও এজেন্ট কমিশন রাখা হয়েছে ডিজেলে ৩ টাকা ৭১ পয়সা, কেরোসিনে ৩ টাকা ২ পয়সা, অকটেনে ৬ টাকা ৭২ পয়সা এবং পেট্রোলে ৬ টাকা ৬১ পয়সা।
এসব যোগ করে ভোক্তা পর্যায়ে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
ডিপো থেকে ৪০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে ট্যাংকলরিতে জ্বালানি তেল পরিবহনের ভাড়া ২০২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
ইরান যুদ্ধের কারণে দেশের জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকটের সময় গেল ১৮ এপ্রিল চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাখে অনেকখানি বাড়ায় সরকার।
তখন ডিজেল ১০০ টাকা থেকে ১১৫ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা করা হয়।
মার্চে ডিজেলের দাম ছিল লিটারপ্রতি ১০০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা।
সোমবারের নতুন দাম কার্যকর হলে মার্চের তুলনায় ডিজেলের দাম লিটারে ৩৫ টাকা, অকটেন ৪৫ টাকা, পেট্রোল ৪৪ টাকা এবং কেরোসিন ৪৩ টাকা বেশি হবে।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিল রেখে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে প্রতি মাসে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের ব্যবস্থা চালু হয়।
এ পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য, আমদানি ব্যয়, শুল্ক-কর, ডলারের বিনিময় হার, বিপিসির মার্জিন, ভ্যাট ও বিতরণ ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া হয়।
