উত্তর বাসাবো এলাকায় পানির এটিএম বুথে কিছুক্ষণ

বোরহান বিশ্বাস
Published : 19 Oct 2021, 10:07 PM
Updated : 19 Oct 2021, 10:07 PM

কার্তিকের মধ্য দুপুরে তপ্ত রোদে দাঁড়িয়ে আছেন আফতাব উদ্দিন। তার সামনে-পেছনে বিশুদ্ধ খাবার পানি সংগ্রহের দীর্ঘ লাইন। তিনি আছেন মাঝামাঝিতে। এটিএম বুথের সেন্সরের কাছাকাছি পৌঁছাতে তার আরো ঘণ্টা খানেক সময় লাগতে পারে। খোলা আকাশের নিচে ঘামে শরীর ভিজে গেছে। তবুও লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন পানির জন্য। এভাবে মাঝে মাঝেই  লাইনে দাঁড়িয়ে পানি সংগ্রহ করেন তিনি।

আফতাব উদ্দিনের মত উত্তর বাসাবো ঝিলপাড় জামে মসজিদ সংলগ্ন ১নং পানির পাম্পের ওয়াটার এটিএম বুথ থেকে পানি সংগ্রহ করছেন আরো অনেকেই ।

যতটুকু জানি, ২০১৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজধানী ঢাকায় কাজ শুরু করে ড্রিংকওয়েল প্রজেক্ট। বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে ড্রিংকওয়েলের পানির এটিএম বুথ। উত্তর বাসাবোতে ২০১৯ সালে এটিএম বুথ বসানো হয়।

১৫০ টাকা রেজিস্ট্রেশনে প্রতি লিটার পানি ৪০ পয়সায় সংগ্রহ করা যায়। তখনও বাসা-বাড়িতে পানি ফুটিয়ে পান করার প্রবণতা ছিল। অতি উৎসাহী কেউ কেউ এটিএম থেকে দিনের যে কোনো সময় ঝামেলাহীন পানি সংগ্রহ করতেন। অন্যরা বিস্ময়ে ভাবতেন 'বিশুদ্ধ পানি, না ফুটিয়েই খাওয়া যায়'!

এক-দুই করে ক্রমে সেই সংখ্যা বেড়ে আজ পানির এটিএম বুথে গ্রাহক সংখ্যা সাড়ে চার হাজার।

উত্তর বাসাবো ছাড়াও এখন তিলপাপাড়া, মধ্য বাসাবো, বউ বাজার, খিলগাঁও তিন কলোনীসহ বেশ কিছু এলাকা থেকে গ্রাহকরা আসেন পানি নিতে। সকাল ৬টা থেকে রাত ১০ পর্যন্ত বিরতিহীন চলে পানি সরবরাহ।

অনেক গ্রাহক সশরীরে উপস্থিত থাকেন না। তখন এ কাজে নিয়োজিত তিনটি ভ্যানে পানি পৌঁছে যায় গ্রাহকের বাড়িতেও। ভ্যানচালকরাই তাদের বাসায় ক্যান, জার নিয়ে এসে পানি ভরে দিয়ে আসেন। এজন্য তারা পারিশ্রমিকও পান।

ভ্যান চালকদের একজন মো. ইসলাম বলেন, দূরত্ব বুঝে ২০ টাকা থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নিয়ে থাকেন।

প্রথমাবস্থায় ২০ লিটারের জার ব্যবহারে বিধি-নিষেধ থাকলেও এখন আর সেটি মানছেন না কেউ। অনেকেই নির্দ্বিধায় পাঁচ-সাতটি করে জার নিয়ে আসছেন।

বাসাবো নাভানা টাওয়ারের সামনে থেকে আসা এক গ্রাহক বললেন,  বারবার আসা সম্ভব নয়; তাই কয়েক দিনের পানি একবারে নিয়ে যাচ্ছেন।

তবে সবার চোখ এড়িয়ে কেউ কেউ ব্যবসার জন্যও পানি নিয়ে যাচ্ছেন ২০ লিটারের অসংখ্য জারে করে। এমন পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়ছেন সাধারণ গ্রাহকরা যারা পাঁচ লিটারের একটি বা দুটি ক্যান নিয়ে পানি নিতে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন।

২০ লিটারের জারে পানি বিক্রয় করা নিয়ে একটি নোটিশ এটিএম বুথে এখনো  দেখা গেল। এতে বলা হয়েছে, ওয়াসার এটিএম বুথ থেকে জারের মাধ্যমে পানি বিক্রি করা যাবে না।

ওই নোটিশে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পক্ষ থেকে ২০ লিটার জারে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য কোনো গ্রাহক ওয়াসার এটিএম বুথ থেকে পানি সংগ্রহ করতে পারবে না বলে অনুরোধ করা হয়েছে। অনুরোধের পত্রটি সেন্সরের উপরে রাখা আছে যেন পানি ভরতে গিয়ে গ্রাহকদের নজরে আসে।

দৈনন্দিন জীবনের অতি প্রয়োজনীয় উপকরণ পানি। প্রতি বছরই ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। যে কারণে পানির চাপও দিন দিন কমছে। উত্তর বাসাবোর এই বুথে বর্তমানে দুটি সেন্সরের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।

মানুষের ভিড় কমাতে আরেকটি সেন্সর মেশিন বসানো হলেও পানির চাপ কম থাকায় তা এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি।

এটিএম বুথে দায়িত্বরত বিল্লাল হোসেন বলেন,  "গ্রাহক সংখ্যা দুই বছরে চার হাজার ছাড়িয়ে গেছে। দৈনিক আট হাজার লিটার পানি সরবরাহ করা হয় এখান থেকে। পানির জন্য লাইনে দাঁড়ানো মানুষ পরিস্থিতির কারণে মাঝে-মধ্যে উত্তপ্ত হয়ে ওঠেন।"

নির্ধারিত কোনো টার্গেট না থাকায় প্রায় প্রতিদিনই নতুন রেজিস্ট্রেশন করে কার্ড সংগ্রহ করছেন গ্রাহকরা। এদিকে শীত আসছে বলে পানির চাপও নিম্নমুখী। তারপর বসন্ত পেরিয়ে গ্রীষ্ম। ঠিক সেই সময়ে গ্রাহকের খাবার পানির চাহিদা কোন প্রক্রিয়ায় সুষ্ঠুভাবে মেটানো হবে তা কেউ জানেন না।  ওয়াসাকে এখন থেকেই এ নিয়ে ভাবতে হবে।

সাধারণ গ্রাহকের চাওয়া একটাই; তারা যেন নির্বিঘ্নে পানীয় জল নিয়ে ঘরে ফিরতে পারেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক