০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ইস-স-স একটুর জন্যে।

কাজী রাশেদ

Published : 02 Mar 2016, 08:05 PM

Updated : 23 Jun 2022, 11:28 PM

ধরুন লটারীর টিকেট কিনেছিলেন। ফল বের হওয়ার পর নাম্বার মিলাতে যেয়ে দেখলেন সব নাম্বার মিলে গেছে শুধু শেষের নাম্বার টি আপনার মিলে নাই। অথবা পরীক্ষার রেজাল্ট বেড়িয়েছে, আপনি অথবা আপনার নিটকজন মাত্র এক বা দুই নাম্বারের জন্যে কাক্ষিত ফল পান নাই। এরকম জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদের অনেক কিছুই হতে হতে হয় না। পেতে পেতেও আমাদের হাতে এসে পৌছায় না আমাদের আরাধ্য ইচ্ছে গুলো।

পৃথিবীর অন্যকোন দেশে বা জাতিতে আছে কিনা জানা নাই কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে বা বাঙ্গালী সমাজে এমন কোন পরিবার নেই বা ব্যক্তি নেই যে বা যিনি জীবনে এই রকম পরিস্থিতিতে পড়েন নাই। বা এমন পরিস্থিতিতে পরে জীবনে একবারো বলেন নাই ইস-স-স, একটুর জন্যে হলো না। এই আক্ষেপ বা না পাওয়ার কষ্ট বাঙ্গালীর সমাজ জীবনে সব সময়ের জন্যেই ছিলো। এশুধু কাজ বা কাঙ্ক্ষিত ফল না হওয়ার জন্যেই নয়, বরঞ্চ অন্যের সাফল্যে যখন নিজের অক্ষমতাটা প্রকট হয়ে দেখা দেয়, নিজেকে লজ্জিত মনে হয় তখনি নিজেকে স্বান্তনা দেওয়ার আশায় নিজেকে আমরা প্রায়ই প্রবোধ দেই ইস একটুর জন্যে আমারটা হলো না অথবা আমার ভাগ্যে লাগলো না। নাহলে এটাতো আমারই প্রাপ্য ছিলো।

পরশ্রীকাতরতা কথাটা পৃথিবীর অন্য কোন অভিধানে নেই বলেই এখন পর্যন্ত প্রমাণিত। অন্যের সাফল্যে, অন্যের খুশীতে নিজে জ্বলে পুরে শেষ হওয়ার যে উদাহরণ তা একমাত্র মনে হয় বাঙ্গালী সমাজেই বিদ্যমান। জেলাসি বলে একটা কথা ইংরাজী ভাষায় চালু আছে কিনতু জেলাসির আভিধানিক অর্থ পরশ্রীকাতরতা নয়। আবার পরশ্রীকাতরতার মানেও কিন্তু জেলাস নয়।

পরশ্রীকাতরতা আমাদের সমাজের প্রতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ওতপ্রোতভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ইদানীংকালে এই আক্ষেপের মাত্রা বেড়ে গেছে অনেক। না পাওয়ার আক্ষেপ থেকে আগে মানুষ নিজের কপালকে দোষ দিতো অথবা সৃষ্টি কর্তার উপর ছেড়ে দিতো। এখন আর কপালের দোষ দিয়ে ব্যাপারটাকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করে না। এখন সবাই নিজের পাওয়া না পাওয়ার হিসাবটা কড়ায় গন্ডায় বুঝে নিতে চায়। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে সমাজের সকল শ্রেণীপেশার মানুষের মধ্যে এই পরশ্রীকাতরতা যতোই বাড়ছে ততোই মানুষ মানুষকে নীচে টেনে নামানোর চেষ্টা করছে। এতে করে একজন আরেকজনকে খুন করতে পিছপা হচ্ছে না। মানুষের হিংসার বলি হচ্ছে নিস্পাপ শিশুরা। শুধুমাত্র হিংসার জন্যে দুধের শিশুকে মেরে মাটি চাপা দিয়ে লুকিয়ে ফেলতেও মানুষ আজ কুন্ঠিত হচ্ছে না। হবিগঞ্জের চার অবুঝ শিশুকে মেরে মাটি চাপা দেওয়া, কুমিল্লার ঢূলিপাড়ায় সৎ ভায়ের হাতে দুই দুধের শিশুকে গলা টিপে হত্যা এসবই পরশ্রীকাতরতার ফল।

আমার যোগ্যতা থাকুক আর নাই থাকুক এটা কোন বিবেচ্য বিষয় না। আমার কেনো হলো না, আমার কেনো হবে না এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। মানুষের বিবেক, বিবেচনা, দয়া মায়া, বিচার বুদ্ধি সবকিছুই আজ রসাতলে যেতে বসেছে। আমার আমিত্ব আজ বিসর্জন দিয়েছি আমরা সবাই। বাবা মা, ভাইবোন, স্বামী স্ত্রী বা পুত্র কন্যা কোন সম্পর্কই আজ নিরাপদ হচ্ছে না নিজেদের লোভ বা পরশ্রীকাতরতার কাছে।

এই সমাজ থেকে পরশ্রীকাতরতা দূর করতে না পারলে, ইস আমারটা কেনো হলো না এই চিন্তা দূর করতে না পারলে সমাজের হানাহানি বন্ধ করা যাবে না। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় শিশু হত্যা, নারী নির্যাতন, খুনোখুনী বা একে অন্যকে ধ্বংসের যে সংবাদগুলো আমাদে্রকে ভাবিয়ে তুলছে এর পিছনের কারণই হলো আমাদের পরশ্রীকাতরতা। আমাদের মনের ভিতরে সবসময়ের জন্যে যে না পাওয়ার কষ্টটা আমাদের কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে প্রতিনিয়ত তারই প্রতিফলন ঘটছে আমাদের সমাজে।