২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

সরকারের রাশিয়া সফর: লাভ-ক্ষতির খতিয়ান

জিনিয়া

Published : 16 Jan 2013, 04:54 PM

Updated : 23 Jun 2022, 11:56 PM

বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর রাশিয়া সফর সচেতন মহলে ইতোমধ্যেই অনেক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কারণ আর আট দশটা গুরুত্বহীন সফরের তুলনায় রাশিয়া সফর বিভিন্ন কারণে অনেক বেশি গুরুত্ববহ হয়ে উঠেছে। গুরুত্ব বিচারে এই সফরে বাংলাদেশের জন্য সবার আগে প্রাধান্য পায় সর্বাধুনিক তৃতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তি নির্ভর ৬০ বছর মেয়াদী পরমাণু বিদ্যুত্‍ কেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি। বাংলাদেশে পাবনায অবস্থিত রূপপুরে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষম পারমাণবিক কেন্দ্র স্থাপনের জন্য রাশিয়া বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক সহায়তা দেবে যা দেশের বিদ্যুত্ ঘাটতি কমাতে সহয়তা করবে। চুক্তির খসড়া অনুযায়ী, পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারিগরি গবেষণার জন্য রাশিয়ার কাছ থেকে ৫০ কোটি ডলার ঋণ পাবে বাংলাদেশ।এই বিপুল অর্থ ব্যয় করা হবে শুধুমাত্র বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে কত খরচ হবে তা নির্ধারণে কারিগরি গবেষণার জন্য। পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্বলিত এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দুটি ইউনিটের প্রতিটি স্থাপনে ১৫০ থেকে ২০০ কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে যার পুরো অর্থ যোগান দেবে রাশিয়া এমনটাই চুক্তিতে রয়েছে বলে মিডিয়াতে প্রকাশ।

এ কথা অনস্বীকার্য যে আমাদের বিদ্যুতের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। প্রতিবছর বিপুল ভর্তুকি দিতে হয় সরকারের অপরিনামদর্শী শ্বেতহস্তিতে পরিণত হওয়া রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ প্লান্টের জন্য।এই সব স্বল্পমেয়াদের বিদ্যুৎ প্লান্টের পিছনে যে অর্থ ভর্তুকি দেয়া হয় তার থেকে অনেক অল্প খরচেই রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ প্লান্টগুলো আধুনিকায়ন করে সেসবের কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে আমাদের বিদ্যুতের ঘাটতি মেটানো সম্ভব ছিল। কিন্তু সেসবের ধার না ধেরে সরকার উচ্চাভিলাষী পাওয়ার প্লান্ট নির্মাণের জন্য ২০০-২৫০ কোটি ডলারের ঋণের ফাঁস স্বেচ্ছায় গলায় জড়িয়ে নিল।

বিদ্যুত্‍খাতকে শক্তিশালী করার কথা বলে বিপুল অঙ্কের অস্বচ্ছ এই ঋণের টাকায় যে বিপুল অঙ্কের দুর্নীতি হবে না এমন কী কোনও গ্যারান্টি সরকার আমাদের দিতে পারবে? বিদ্যুত্‍ সমস্যার সমাধানের নামে বর্তমান সরকার যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনগণের উপর নতুন এই ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিল তা থেকে বেরিয়ে আসার কোনও পথ সরকার কী খোলা রাখতে পেরেছে বা পারবে?

বিদ্যুত্ খাতে ঋণের চেয়েও সব থেকে আশঙ্কাজনক হল রাশিয়ার সাথে ১০০ কোটি ডলারের(প্রায় সাড়ে আট হাজার টাকায়)বিপুল অঙ্কের ঋণের দ্বারা সমরাস্ত্র ক্রয় চুক্তি। বিশাল অঙ্কের ঋণ নিয়ে অস্ত্র কেনার আদৌ কোনও প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশের ছিল কী না তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। অস্ত্র কেনার এই অর্থ অস্ত্র বিক্রেতা রাশিয়ার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে কেনা হবে যার সুদের হার কত, কত বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে, কোনও কারণে ঋণ শোধ করতে না পারলে ফলাফল কী হতে পারে, এসব আমরা কিছুই জানি না। এমন কী আমরা কী ধরনের অস্ত্র কিনব তাও রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের সমঝোতা চুক্তিতে নির্ধারন করা হয় নি। এর অর্থ এই নয় কী যে আমাদের আসলেই কোনও অস্ত্রের দরকার কী না তা সরকার নিশ্চিত নন!!!!

যে পণ্যের আমাদের অত্যাবশ্যকীয় কোনও প্রয়োজনীয়তা নেই, সেই পণ্য ক্রয়ের জন্য কেন এই বিশাল অঙ্কের ঋণের ফাঁদে আমরা পড়ছি? যেখানে আমরা মাত্র কিছুদিন আগেই আইএমএফ থেকে ১০০ কোটি ডলারের ঋণ নিয়েছি উন্নয়নের কথা বলে। আইএমএফ এর কঠিন শর্তের ঋণ নিয়ে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা না করেই আমাদের সরকার সে অর্থ বিভিন্ন খাতে ব্যয় করে ইতোমধ্যে আইএমএফ এর কাছ থেকে তিরস্কৃত হয়েছে। সেই অর্থের দায় মাথায় আছে, আছে পুরোনো অনেক ঋণ এর দায়, তার পরেও নতুন করে কেন এই বিশাল অঙ্কের ঋণ নেয়া হল রাশিয়া থেকে? রাশিয়া তাদের অস্ত্র বিক্রয়ের জন্য পরমাণু বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনের লোভ দেখিয়ে যে এই বিপুল লোনের ফাঁস আমাদের গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নাই।

এ কথা আমরা সবাই জানি যে বর্তমার সরকার বিগত সময়ে বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের নামে এই রাশিয়া থেকেই মোট ১২৪ মিলিয়ন ডলার দিয়ে আটটি মিগ-২৯ বিমান কিনে যথেষ্ট বিতর্কের জন্ম দেয়। আবারও ক্ষমতায় এসে মেয়াদকালের এই শেষ সময়ে রাষ্ট্রীয় ঋণে অস্বচ্ছ চুক্তির আওতায় সমরাস্ত্র কিনে পরবর্তীতে যথেষ্ট বিতর্কের জন্ম দেবে বই কী!! অচিরেই যোগ হবে অস্ত্র ক্রয় কেলেংকারী।

নির্বাচনের আগে কোনও রকম ভাবনা চিন্তা ছাড়াই এইসব আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত এর ফল ভোগ করবে এদেশের খেটে খাওয়া জনগণ। কারণ সরকার আসে-যায়, একজনের ভুলের বোঝা অন্যের কাঁধে চাপিয়ে পাঁচ বছরের জন্য বিদায় নিয়ে তারা তামাশা দেখে, ক্ষমতায় আসা দল সেই ভুল না শুধরে নতুন উদ্যম নিয়ে আবার ভুল করে..এ যেন ভুলের দুষ্টু চক্র!!আর তার প্রভাব এসে পড়বে সেই দুষ্টু চক্রের কেন্দ্রে থাকা খেটেখাওয়া সাধারণ জনগণের দৈনন্দিন জীবনে। জনস্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে শক্তিশালী মহাজনি দেশের সাথে অপ্রয়োজনীয় এই সব চুক্তি যে তাদের আধিপত্য বিস্তৃতি করবে তা বলাবাহুল্য। এইসব চুক্তির নাগপাশে আটকে রেখে একটি উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়ন ব্যাহত হবে এবং বাংলাদেশের জনগণকে ভবিষ্যতে আরও কঠিন সংকট মোকাবিলা করতে হবে তা সহজেই অনুমেয়।

***
লেখাটি আজ বাংলানিউজ২৪.কম এ মুক্তমত বিভাগে একি শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। এই পোস্টটি আমার লেখা সেই আর্টিকেলের সংকলিত ভার্সন।