ঘুঘুমারি: বেঁচে থাকার লড়াই যেখানে অবিরাম

এ দুর্গম চরে ন্যূনতম মৌলিক সুবিধা চান বাসিন্দারা।

মাছুম কামালবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 30 Jan 2024, 03:09 AM
Updated : 30 Jan 2024, 03:09 AM

মাঘের হাঁড়কাপানো শীত উপেক্ষা করে রমনা ঘাট থেকে ছুটল ইঞ্জিনচালিত নৌকা। কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার এ ঘাট থেকে গন্তব্য ঘুঘুমারি চরে যেতে নৌপথেই পাড়ি দিতে হবে ১৫ কিলোমিটার। বাকি ৩ কিলোমিটার স্থল হলেও চরের বালুপথ পাড়ি দিতে হবে ঘোড়ার গাড়ি আর পায়ে হেঁটে।

নৌকা থেকে যতদূর চোখ যায়, বালুচর ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। ঘণ্টা খানেক পর নৌপথের যাত্রা শেষ হল। এরপর ঘোড়ার গাড়ি চেপে খানিক পথ যাওয়ার পর সেই বাহন থমকে দাঁড়াল। বালুর সেই চেনা পথ যে শীতের মধ্যে কঠিন ঠেকছিল ঘোড়ার কাছে! অগত্যা হেঁটেই বাকি কিলো দেড়েক পথ পাড়ি দিতে হল।

এরপরই সামনে এল ঘুঘুমারি চরের জনবসতি। উলিপুর উপজেলার এ দুর্গম চরে সাধারণত মূল ভূখণ্ডের কেউ যেতে চান না। ভৌগোলিকভাবে চরটি পড়েছে রৌমারী, চিলমারী ও উলিপুর উপজেলার মাঝামাঝি অংশে।

চরের বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপে জানা গেল, দুই যুগ আগে ব্রহ্মপুত্র নদের বুক চিড়ে ঘুঘুমারি চর জাগে। প্রায় এক হাজার একর বিস্তৃত এই চরে ৪৫০টি পরিবারের হাজার দুয়েক মানুষের বাস।

স্থানীয় বাসিন্দারা মূলত ভুট্টা, বাদাম, সরিষা, গম আবাদ করেন। অল্পবিস্তর ধানও হয়। কৃষি ছাড়া আয়ের আর কোনো পথ নেই ঘুঘুমারির মানুষের।

উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামে ঘুঘুমারিসহ চার শতাধিক চরে ৫ লাখের বেশি মানুষের বসবাস। ধরলা, দুধকুমার, ফুলকুমার, ব্রহ্মপুত্র, বুড়িতিস্তাসহ ১৬টি নদ-নদী আছে, যার মধ্যে ১০টিই ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত। 

সংকটের অন্ত নেই

একে তো যাতায়াতে অসুবিধা, তার ওপর শিক্ষা-স্বাস্থ্য সুবিধা পাওয়াও কঠিন। সরকারি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে, সেটা চর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে। আর চরের মধ্যে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপের।

কবে একটি উচ্চ বিদ্যালয় আর অন্তত একটি কমিউনিটি ক্লিনিক হবে, তা নিয়ে অপেক্ষা আর ফুরোয় না স্থানীয়দের।

তাদের একজন হেনা আক্তার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বললেন, “সমস্যা অনেক, আমাদের চারপাশে নদী। সরকারের কাছ থেকে সহায়তা পাই নাই তেমন। একটা যদি হাই স্কুল হয়, আমাদের বাচ্চারা পড়তে পারবে।

“দূরে চরশুমারী হাই স্কুল আছে। আমরা ওখানে পড়াশোনা করেছি। কিন্তু, ওটা ম্যালা দূর। নদী পার হয়ে ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার যাওয়া লাগে।“

হেনা বলেন, “আরেকটা অসুবিধা আমাদের আছে। আমাদের এখানে স্বাস্থ্যসুবিধা একেবারেই নাই।“

বেঁচে থাকার জন্য আগে সেটি নিশ্চিত করাই জরুরি বলে মনে করেন এই নারী।

“ধরেন আমার বাচ্চা অসুস্থ হইছে। জ্বর আসছে অনেক। সামান্য পরামর্শ পেলেই হয়ত সেরে যেত। কিন্তু সেটা তো আমরা পাই না। আমাদের যেতে হয় চরশুমারী, নৌকা ধরে। যদি একটা খ্যাও ফেল করি, অনেক সময়ের দরকার হয়। হেঁটে-হেঁটে যাওয়া লাগে। গাড়ির ব্যবস্থাও নেই।“

চরের বাসিন্দারা যে ফসল ফলান, তা সংরক্ষণের টেকসই ব্যবস্থাও নেই ঘুঘুমারিতে।

হেনা আক্তার বলেন, “গতবছর আমি ভুট্টা চাষ করছিলাম। ২২ মণের মতো ভুট্টা হয়। কিন্তু সংরক্ষণ করতে না পারায় কম দামেই বিক্রি করতে হয়। একটা গুদাম থাকলে ভালো দাম পেতাম।”

চরের আরেক বাসিন্দা সুরুজ মিয়াও বললেন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা।

তিনি বলেন, “আমাদের এখানে বাচ্চাগুলা ঠিকমতো পড়াশুনা করতে পারে না। একটা হাই স্কুল থাকলে খুব ভালো হয়।”

দরিদ্রের মাঝেই জীবনকে কীভাবে চালিয়ে নিতে হয়, তার অসংখ্য উদাহরণ আছে ঘুঘুমারির বাসিন্দাদের মধ্যে।

তাদের একজন খাদিজা খাতুন থাকেন চরেই সরকারের গুচ্ছগ্রামে। টিনের চালে সৌরবিদ্যুৎ থাকলেও প্রায় অকেজো, রাতে জ্বলে না বাতি।

কুড়িয়ে আনা বাদাম উঠানে বাছছিলেন খাদিজা। বললেন, “স্বামীটা পঙ্গু। কামাই করতে পারে না। মানুষের থেকে চেয়ে-চিন্তে নিয়ে আসি এটা-ওটা। বাদাম কুড়িয়ে এনে পেট চালাই।”

বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছে কিছু প্রতিষ্ঠান

ঘুঘুমারির প্রায় ১৫০টি পরিবারকে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পের আওতায় নিয়ে এসেছে ফ্রেন্ডশিপ, যার আওতায় বর্তমানে সেচ সুবিধা মিলছে। কিছুদিনের মধ্যে বিদ্যুৎ সুবিধা মিলবে।

পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাটি জমিতে ব্যবহারের জন্য বাড়ির আঙ্গিনায় ভার্মি কম্পোস্ট সার তৈরির প্ল্যান্ট করে দিয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি কমিউনিটি ক্লিনিক, সিড হাব, ফারমার্স ক্লাবও স্থাপন করেছে।

২০২২ সালে সাসটেইনেবল ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট নেয় ফ্রেন্ডশিপ, যার আওয়তায় এসব সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। আর প্রকল্পে অর্থায়ন করছে বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টাড।

প্রকল্পের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক মাহিদুল ইসলাম বলেন, ”এখানে আমরা মোট ১৯২টি সোলার প্যানেল সেট করেছি, যার প্রত্যেকটি ৩০০ ওয়াটের।

“দিনের বেলায় এই প্রকল্পের সুবিধা (সেচ) আমরা দিতে পারছি, রাতে পারছি না। যেহেতু ডিসি লাইন। এজন্য আমরা এটাকে ব্যাটারি ব্যাংকে রূপান্তর করছি। এরপর ১৯৫টি ব্যাটারির মাধ্যমে তিনটি ইনভার্টার ব্যবহার করে রাতেও (বিদ্যুৎ) দেওয়ার ব্যবস্থা করছি।“

এ প্রকল্পের আওতায় বিদ্যুৎ নিলে মাসে সর্বনিম্ন ১১১ টাকা করে পরিশোধ করতে হয়। এ নিয়ে কেউ কেউ অসন্তোষ জানিয়েছেন।

মাহিদুল বলেন, “আমরা ম্যানুয়াল মিটার ব্যবহার করছি না। প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করব৷ আমরা যাদের থেকে এই সার্ভিস নিয়েছি, তারা একটা চার্জ নেবে প্রত্যেক মাসে। ফলে আমরা সর্বনিম্ন এই চার্জ নিচ্ছি।

“আমরা আসলে এখানে অসহায়। এখানে আমাদের কিছু স্টাফ আছে, মেনটেইন্যান্স কস্ট আছে।“

ফ্রেন্ডশিপের কর্মকর্তা মাহিদুল জানান, সেচের জন্য এখানে প্রতি শতক ধানে ৮০ টাকা, সরিষা বা অন্য ফসলে ২০ টাকা করে খরচ নেওয়া হয়। এই আয়ের ৫০ শতাংশ অপারেটরের কাছে যাবে।

ফ্রেন্ডশিপের পার্টনারশিপ ডেভেলপমেন্ট বিভাগের সহকারী পরিচালক এনামুল হক বলেন, “আমরা গড়পড়তা হারে বাসাগুলোতে সংযোগ দিতে পারছি না। ব্যবস্থাপনাটা যেহেতু একটু কঠিন। আমরা মূলত দুস্থ এবং ছোট বাচ্চা আছে- এমন পরিবারগুলোকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য আগে বেছে নিই।

“ক্যাপাসিটি অনুযায়ী যতজনকে দেওয়া সম্ভব, দিচ্ছি। ওরা শুধু মেনটেইন্যান্স কস্ট দিচ্ছে, আমরা কিন্তু লাভ নিচ্ছি না। এটা আমরা পাইলট হিসেবে করেছি, ডোনার বাড়লে আমরা আরও বড় করব আশা করি।“

চরের বাসিন্দা জুঁই আক্তার বলেন, “ফ্রেন্ডশিপ থেকে ট্রেনিং নিয়ে উপকৃত হয়েছি। শাক-সবজির মৌসুম কোনটা কখন, কীভাবে চাষ করতে হবে- ট্রেনিং করেই জানতে পেরেছি। ফ্রেন্ডশিপের সিড হাব থেকে বীজ পেয়েছি। অনেক উপকার হইছে, যা বলার মতো না।“

এই চরের আরেক কৃষক আরশাদুল হক বলেন, “আগে যদি ৩০ একরে ১০ মণ ফসল পেতাম, এখন ১৫ মণ পাই। সমস্যা তো আছেই, তবু ফ্রেন্ডশিপ এখানে আসার পরে জীবনযাত্রা পরিবর্তন হইছে।“

ঘুঘুমারি চরের বাসিন্দাদের জীবনমান উন্নয়নে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড চার্টাড বাংলাদেশের হেড অব কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ব্র্যান্ড ও মার্কেটিং বিটপী দাস চৌধুরী বলেন, ”এই চরে ফ্রেন্ডশিপ অনেক বছর ধরে কাজ করছে, তখন আমরা ওদের সঙ্গে সিএসআর প্রকল্পের আওতায় পুরো প্রকল্প ডোনেশন করেছি। এই প্রকল্প কীভাবে চলবে, এটা ফ্রেন্ডশিপ লোকাল কমিউনিটির সাথে পরিকল্পনা করবে।“

দুর্গম এলাকায় কাজ করার কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “সরকারের অনেক উদ্যোগ আছে, কিন্তু এটা দুর্গম এলাকা হওয়ায় এটা আসলে কঠিন। এখানে কিভাবে উৎপাদন করা যায়, সে জায়গা থেকে আমরা উদ্যোগ নিয়েছি।

“সোলার প্রকল্পটা কৃষি প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে আরও (সুবিধাভোগী) বাড়ানো যায় কিনা, সে পরিকল্পনা আছে আমাদের। আমরা ১৫০ পরিবারকে নিয়ে শুরু করলাম। যদি দেখি আরও চাইছে, তাহলে আমরা বাড়ানোর চিন্তা করব।”