একসঙ্গে ৮০ উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রীর, ২০টির ভিত্তি স্থাপন

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “উন্নয়নের নাম করে কিন্তু সমস্ত খাল, বিল, নদী-নালা, পুকুর পর্যন্ত ভরাট করে ফেলা হয়। আমি মনে করি, এটা অত্যন্ত গর্হিত একটি কাজ।“

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 16 Oct 2023, 11:01 AM
Updated : 16 Oct 2023, 11:01 AM

একই অনুষ্ঠানে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ৮০টি উন্নয়ন প্রকল্প ও পুনর্খনন করা ৪৩০টি ছোট নদী-খাল-জলাশয়ের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাশাপাশি নতুন অনুমোদিত ২০টি উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেছেন তিনি।

বাসস জানায়, সোমবার গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এসব প্রকল্প উদ্বোধন করেন সরকার প্রধান।

অনুষ্ঠান থেকে ৬৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থাপিত ‘কমিউনিটি আই সেন্টার’ এরও উদ্বোধন করেন শেখ হাসিনা।

এ সময় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের ওপর দুটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এরপর ‘জয়যাত্রা’ নামে একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। এতে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো এতে তুলে ধরা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০০৯ সাল থেকে তার সরকার পানিসম্পদ উন্নয়ন খাতে ৯৭০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। দেশব্যাপী ৫ হাজার ৮১১ সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে।

এই সময়ে ৯৯০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ করা হয়েছে, ১ হাজার ৫৪৪ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। ১০ হাজার ৫৭১ কিলোমিটার বাঁধ মেরামত করায় ৩১টি জেলাকে নদী ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

গত দেড় দশকে ৫ হাজার ৩০০ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ড্রেজিংকৃত মাটি যত্রতত্র না ফেলে তার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে তার সরকার ১ হাজার ৮৬ বর্গ কিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, তার সরকার ৪১ সেট ড্রেজার কিনেছে এবং এগুলো ব্যবহার করে ৫ হাজার ৩৫৫কিলোমিটার নতুন সেচ খাল খনন ও ১ হাজার ৯৪২ সেচ খাল পুনর্খনন করেছে। তিনি বলেন, “পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় বন্যার আগাম সতর্ক বার্তা মোবাইলে এসএমএস এর মাধ্যমে জনগণকে প্রেরণের উদ্যোগ নিয়েছে।”

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকার পানি খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “একবার ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের পর প্রতিবছর মেনটেইনেন্স ড্রেজিং করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

অনুষ্ঠানে যশোরের শার্শা, পাবনার সাঁথিয়া এবং মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিল। প্রধানমন্ত্রী সেসব এলাকায় উপস্থিত স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময়ও করেন।

‘নদী ও খাল প্রাণের মতো’

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে দেশের নদীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার ওপর জোর দেন। বলেন, “হার্টে ব্লক তৈরি হলে মানুষ মারা যায়। আমাদের নদী ও খালগুলো মানুষের প্রাণের মতো, এগুলোকে প্রবাহিত রাখতে আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে।

“আমাদের দেশ নদীমাতৃক, নদীই আমাদের জীবন। এগুলো ঠিক শরীরের ধমনি-শিরা-উপশিরার মতো। হার্টের ধমনি ব্লক হলে রক্ত যেমন সঞ্চালন হতে না পেরে মানুষ মারা যায়, আমাদের দেশের নদী-নালাও আমাদের জীবনের মতই। তাদের সচল রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। নদীর প্রবাহ যেন অব্যাহত থাকে সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমাদের প্রতিটি প্রকল্প গ্রহণ ও সম্পন্ন করতে হবে।”

বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, “উন্নয়নের নাম করে কিন্তু সমস্ত খাল, বিল, নদী-নালা, পুকুর পর্যন্ত ভরাট করে ফেলা হয়। আমি মনে করি, এটা অত্যন্ত গর্হিত একটি কাজ। আমাদের দেশে যখনই যে প্রকল্প নেওয়া হবে অবশ্যই এই পানি সম্পদকে রক্ষা করার ব্যবস্থা সেখানে সকলকে নিতে হবে।“

আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর থেকে নদীগুলো ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয় জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকেই তাকে সে সময়ে সমর্থন করতে পারেনি, নদীর পাড় বাঁধানোর দিকেই নজর ছিল।

শুধু পাড় বাঁধিয়েই হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, “তাহলে তো নদী ভরাট হয়ে যাবে।”

‘পানির প্রবাহ যেন রুদ্ধ না হয়’

সড়ক, রেললাইন বা যে কোনো স্থাপনাই যাই করা হোক সেখানে যেন কোনোভাবেই পানির প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত না হয় সে দিকে নজর রাখার নির্দেশও দেন সরকারপ্রধান।

তিনি বলেন, “বন্যার সময় রাস্তা বা যে জায়গাটা ভেঙে যাচ্ছে, সেখানে আর মাটি ভরাট না করে কালভার্ট বা ব্রিজ করে দেয়ারও নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে, যেন পরবর্তীতে বানের পানি সঠিকভাবে নেমে যেতে পারে।”

পরিকল্পনা করার সময় এসব বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জলাবদ্ধতা যেন সৃষ্টি না হয় সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। এজন্য প্রতিটি প্রকল্পের সঙ্গে অন্তত একটা জলাধার রাখতে হবে।

“প্রকৃতিকে তার আপন খেয়ালে চলতে দিতে হবে এবং এরই মধ্যে আমাদের সম্পদ রক্ষারও ব্যবস্থা নিতে হবে।”

জলপথ পরিচ্ছন্ন্ রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন শেখ হাসিনা। জলপথ, নদী, সড়ক-মহাসড়ক, কোথাও বর্জ্য না ফেলা এবং নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলার আহ্বানও জানান তিনি। কলকারখানার দূষিত বর্জ্য জলাধার বা নদীতে না ফেলার বিষয়েও সতর্ক করেন।

যত্রতত্র যেন শিল্প কারখানা গড়ে না ওঠে সেদিকে নজর দিয়ে তার সরকার সারাদেশে একশটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জিয়া, খালেদা জিয়া বা এরশাদ এরা কেউই এদিকে নজর দেয়নি। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পরই দূষণ প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছে।”

তিনি বলেন, “পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় গৃহীত প্রকল্পের মাধ্যমে পানির চাহিদাভিত্তিক অতিরিক্ত ব্যবহার ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ অর্জন করা সম্ভব। এর মাধ্যমে বর্তমানের চাহিদা মিটিয়ে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটা সুরক্ষিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা আমরা রেখে যেতে চাই।”