রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র আগামী সপ্তাহে পুরোদমে চালুর পরিকল্পনা
স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, সীমিত পরিসরে সেবা চালু হলেও প্রতিদিনই রোগী আসছেন। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ২০ জন নারী বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নিয়েছেন। কয়েক দিনে ৫০ জনের বেশি শিশু টিকা নিয়েছে।
রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর সেকশনে ভাঙচুরের শিকার রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের মেরামতকাজ এগিয়ে চলছে।
আগামী সপ্তাহ থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির সব কক্ষে পুরোদমে সেবা চালুর আশা করছে কর্তৃপক্ষ।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের পরদিন থেকেই সীমিত পরিসরে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করেন কর্মীরা। তৃতীয় দিন থেকে দুটি কক্ষে টিকাদানের পাশাপাশি স্বাস্থ্য পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।
মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মূল ভবনের এক পাশের সেমিপাকা ঘরের টিনের ছাউনি নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে। অন্য পাশের সেমিপাকা ঘরের কিছু মেরামতকাজ তখনও চলছিল।
মূল ভবনসহ বিভিন্ন ভাঙা দেয়াল পুনর্নির্মাণের কাজ শেষ হলেও বেশ কয়েকটি জায়গায় রঙের কাজ চলছিল।
কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, “এখনও সব কিছু ঠিক হয়নি। এই সপ্তাহের মধ্যে সব ধরনের মেরামতের কাজ শেষ হবে। তারপর আগামী সপ্তাহেই পুরোদমে সেবা চালু করতে পারবো বলে আশা করছি।”
স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, সীমিত পরিসরে সেবা চালু হলেও প্রতিদিনই রোগী আসছেন। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ২০ জন নারী বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নিয়েছেন। কয়েক দিনে ৫০ জনের বেশি শিশু টিকা নিয়েছে।
বর্তমানে মূল ভবনের ১০২ নম্বর কক্ষে দুজন চিকিৎসক স্ত্রীরোগসংক্রান্ত পরামর্শ দিচ্ছেন। পাশের একটি টেবিলে পুষ্টিবিদ ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের একজন কর্মী নারীদের পরামর্শ দিচ্ছেন। ১০৩ নম্বর কক্ষে চলছে হাম-রুবেলার টিকাদান কার্যক্রম।
কেন্দ্রের ক্লিনিক ইনচার্জ ডা. শাহনাজ ইসলামী বলেন, “আমাদের গ্যাসের লাইন ছাড়া অন্য বিদ্যুৎ-পানির সংযোগ সচল হয়েছে। দুটি কক্ষ ব্যবহার করতে পারছি।”
তিনি বলেন, “আমরা এখন পর্যন্ত গাইনি, পরিবার পরিকল্পনা এবং নারীদের বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিচ্ছি। কিন্তু যন্ত্রপাতি এখনো আগের মতো কিছুই নেই, তাই পরামর্শের মধ্যে সেবা সীমাবদ্ধ রয়েছে। আশা করি, আগামী সপ্তাহে পুরো কেন্দ্রের সব কক্ষ বসার উপযোগী হলে অন্য সব সেবাও চালু করা সম্ভব হবে।”
কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, পরিবার পরিকল্পনা অফিসের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে এবং সেখান থেকে কিছু সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছে। মেরামত শেষ হলে আরও প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেওয়ার কথা রয়েছে।
“সেই হিসেবে এই সপ্তাহে মেরামত শেষ হবে এবং আগামী সপ্তাহ থেকে আমরা সব ধরনের সেবা দিতে পারব।”
মঙ্গলবার কেন্দ্রের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা যায়, ভাঙচুরের পর ছড়িয়ে থাকা ইটের টুকরো ও অন্যান্য সামগ্রী সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নতুন করে নির্মাণ করা দেয়ালগুলোতে রঙের কাজ চলছে। দরজা-জানালার গ্রিলও আনা হয়েছে এবং কয়েকটি কক্ষে তা বসানো হয়েছে।
কেন্দ্রের নিরাপত্তায় পুলিশ ও আনসার সদস্যদেরও সেখানে দেখা যায়।
কর্মরত মিস্ত্রি ইলিয়াস হোসেন বলেন, মঙ্গলবার দিনের কাজ শেষে রঙের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এক সপ্তাহ পর আবারও রঙের একটি প্রলেপ দিতে হবে।
সাভার থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসা আল্পনা আক্তার বলেন, “আমার পাশের বাসার একজন গর্ভবতী তিনি এবং আমি কিছু বিষয়ে পরামর্শ নেওয়ার জন্য এসেছি।”
বর্তমানে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকের ব্যক্তিগত অর্থায়নে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির সংস্কারকাজ চলছে।
কেন্দ্রের বাইরের দুটি সেমিপাকা ঘর নির্মাণ এবং মূল ভবনের মেরামত হলেও আপাতত দুটি কক্ষেই সেবা দেওয়া হচ্ছে। অন্য কক্ষগুলো পুরোপুরি ব্যবহারের উপযোগী না হওয়ায় সেখানে এখনও সেবা শুরু করা যায়নি।
১৯৭৪ সাল থেকে মিরপুরের গরিব, অসহায় মা ও শিশুদের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। গত ২৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে সেখানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
রাড্ডা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, প্রায় ২০০ লোক দেশীয় অস্ত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঢুকে একটি টিনশেড ও তিনটি সেমিপাকা ভবন গুঁড়িয়ে দেয়। পাকা ভবনের আল্ট্রাসাউন্ড কক্ষ, টিকাকেন্দ্র ও ল্যাবরেটরিসহ পাঁচটি কক্ষের জানালা-দরজা ভেঙে ফেলা হয়।
তাদের অভিযোগ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে আসবাবপত্র, ওষুধ, আল্ট্রাসোনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্রিজ, এসি ও আলমারিসহ বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে যাওয়া হয়। এতে এক কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়।
হামলার পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় শাহ আলী থানায় করা মামলায় স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়াসহ ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়। স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতার নামও এ ঘটনায় এসেছে।
ওই ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম এলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ তিনি পদত্যাগ করেন।
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তিনি প্রয়াত বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর বোন। তার প্রয়াত স্বামী সাইদুর রহমান নিউটনও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ঢাকার একটি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর মিষ্টিও ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।
২০০৬ সালে শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার থাকাকালে ওই সমিতির সভাপতি ছিলেন মিষ্টি। রাড্ডা সেন্টারের জমি ওই সমিতির নামে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য সে সময় গৃহায়ন ও গণপূর্ত কর্তৃপক্ষের কাছে করা একটি আবেদনে সভাপতি হিসেবে মিষ্টির স্বাক্ষর ছিল।
রাড্ডাকাণ্ড নিয়ে আলোচনার মধ্যেই ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। পাশাপাশি ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। এছাড়া বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জনকে বহিষ্কারের ঘোষণা আসে।
