জুলাই আন্দোলনে আহত হওয়ার অভিযোগে মামলা, তদন্তে এল সড়ক দুর্ঘটনা
“এটা আসলে জুলাই আন্দোলনে আহত হওয়ার মামলা ছিল না। বাদী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন। তদন্ত করতে গিয়ে তা উঠে এসেছে,” বলেন তদন্ত কর্মকর্তা।
জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মারধরে আহত হওয়ার অভিযোগে জাফর আহমেদ নামে এক ব্যক্তি মামলা করলেও পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তার সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার বর্ণনা।
২০২৫ সালের ১৫ মার্চ আদালতে ১৩ জনের নামে ওই মামলা করা হয়; আসামিদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা বলা হয় এজাহারে।
তবে দেড় বছর পর চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পুলিশের জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, মাদারীপুরের শিবচরে বাবার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার ‘নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হয়ে’ প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-কর্মচারী ও অন্যদের নামে করেন বাদী।
জাফর আহমেদের বাড়ি শিবচর উপজেলার রাজার চরে। থাকেন মোহাম্মদপুর এলাকায়। আসামিদের অধিকাংশের বাড়িও শিবচর উপজেলায়। তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
আসামি তালিকায় রয়েছেন- জুলফিকার আলী ভুট্টো, হেলাল উদ্দিন, আব্দুল্লাহ শাহীন, আব্দুর রহমান, মাইনুদ্দিন, সিরাজুল ইসলাম, হাবিব, দেলোয়ার হোসেন, শাহাদাত মোল্লা, আবদুর রহিম, ইয়াদ মাহমুদ খান শেলী, মো. আসিফ, রায়হানুর রহমান মিল্টন। নাম তুলে না ধরে আরও ১৫০/২০০ জনকে আসামি করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার এসআই আকরামুজ্জামান বলেন, “তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। এটা আসলে জুলাই আন্দোলনে আহত হওয়ার মামলা ছিল না। বাদী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন। তদন্ত করতে গিয়ে তা উঠে এসেছে।
“তদন্তে যেটা পেয়েছি, সেটা উল্লেখ করেই আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ না পাওয়া তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।”
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হক আগামী ২ নভেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন রেখেছেন বলে প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মিজানুর রহমান জানিয়েছেন।
মামলায় যে অভিযোগ
জাফর আহমেদ মামলায় অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই সকাল ১০টার দিকে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করে। ওই সময় তিনি পুলিশের গাড়ির ধাক্কায় পড়ে যান। এরপর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তার ওপর আবার হামলা করে। এতে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পরে নিজেকে হাসপাতালে দেখতে পান। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরদিন ৬ অগাস্ট তার বাম পায়ে অস্ত্রোপচার হয়।
জাফর আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “জুলাই আন্দোলনে যে আহত হয়েছি, তদন্ত কর্মকর্তাকে সব রিপোর্ট (চিকিৎসা সংক্রান্ত রিপোর্ট) দিয়েছি। ঘটনার সময় আসামিদের দুই-তিনজন শুক্রাবাদে, দুই-তিনজন মোহাম্মদপুরে ছিলেন। বাকিরা এলাকা (শিবচর) থেকে ঢাকায় যাওয়া-আসা করতেন।
“আসামিরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। গত ডিসেম্বর মাসেও জুলফিকার আলীসহ কয়েকজন আমার ওপর হামলা করে।”
এ বক্তব্যের পর ফোন কেটে দেন তিনি।
‘শুধু শুধু আমাদের বিরুদ্ধে মামলাটা করেছে’
মামলার ৪ নম্বর আসামি হেলাল উদ্দিন শিবচর উপজেলার রাজার চরে আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া কওমী মাদ্রাসায় শিক্ষক। মাদ্রাসাটি মামলার বাদী জাফর আহমেদের বাবা প্রতিষ্ঠা করেন।
হেলাল বলেন, “জাফর আহমেদের বড় ভাই এখন দায়িত্বে আছেন পরিচালক হিসেবে। জাফর আহমেদ একসময় পরিচালক ছিলেন। তবে বিভিন্ন দোষের কারণে সরতে বাধ্য হন। পরিচালক থাকাকালে খামাখা মামলা করতেন। মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনদের বিরুদ্ধে জিডি, মামলা করেন। কারও সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো না এই খামাখা মামলা করার কারণে।”
হেলাল দাবি করেন, “মাদ্রাসার শিক্ষক ও এলাকার কয়েকজনের বিরুদ্ধে যে মামলাটা দিয়েছে, আমরা কেউ জড়িত না। যে তারিখে আক্রমণ করার কথা বলেছে, আমরা সেদিন মাদ্রাসাতে ছিলাম। তার কারণে শুধু শুধু আমাদের কয়েকজনকে শিবচর থানায় দৌড়াতে হয়েছে। টাকা খরচ করতে হয়েছে।
“তার বাবার মাদ্রাসায় আমরা আছি। উনি (জাফর) অ্যাক্সিডেন্ট করার পর দুইবার হুইল চেয়ারে করে মাদ্রাসায় এসেছেন। আমরা তাকে হুইল চেয়ারসহ মাদ্রাসার দোতলায় উঠিয়েছি। তার সব রেকর্ড আছে। শুধু শুধু আমাদের বিরুদ্ধে মামলাটা করেছে।”
‘নিজেদের মাদ্রাসা নিয়ে বিরোধ’
জাফর আহমেদের বাবা আব্দুছ ছামাদ ১৯৭০ সালে আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১৫ সালের ৩ অগাস্ট তিনি মারা যান। এরপর জাফরের বড় ভাই শামসুল হককে মোতাওয়াল্লীর দায়িত্ব ও মাদ্রাসা পরিচালনার দায়িত্ব দেন তাদের মা আমিরুন নেছা। সহায়তার জন্য জাফর আহমেদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে বলেছেন, কিছুদিন পর মাদ্রাসায় একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকজন শিক্ষকের সহায়তায় বড় ভাইকে সরিয়ে নিজেকে মোতাওয়াল্লী ঘোষণা করেন জাফর আহমেদ। তার কর্তৃত্বের কারণে মাদ্রাসায় আর্থিক সংকট ও বিশৃঙ্খলাসহ নানা সমস্যা তৈরি হয়। এরপর আমিরুন নেছা স্থানীয় লোকজন ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে বড় ছেলে শামসুল হককে পুনরায় মোতাওয়াল্লী ঘোষণা করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জাফরকে অপসারণের পরই মামলার আসামি জুলফিকার আলী ভুট্টো, হেলাল উদ্দিন, আব্দুল্লাহ শাহীন ও আব্দুর রহমানের সঙ্গে মনোমালিন্য শুরু হয়। তারা মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠাতা, পরিচালক ও ইলমীর দায়িত্বে রয়েছেন। মনোমালিন্যের পর হেলালহ মাদ্রাসাটির চারজনকে আসামি করে আদালতে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, মানহানিসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা করেন জাফর। তবে আদালত মামলাটি খারিজ করে দেয়।
পরবর্তীতে জুলাই আন্দোলনে মারধরে আহত হওয়ার অভিযোগে মাদ্রাসাটির শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ স্থানীয় লোকজনের নামে মামলা করেন তিনি। তবে মামলার আসামিরা ঘটনার দিন ঢাকায় ছিলেন না বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
‘মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন বাদী’
তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে তুলে ধরেছেন, জাফর আহমেদ মোহাম্মদপুরে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বাচ্চাদের কুরআন শিক্ষা দিতেন। ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই ভোর পৌনে ৬টার দিকে বাসা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন। সকাল ৭টা ১০ মিনিটের দিকে বিজয় সরণির মোড়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হন।
মামলার সাক্ষী আ. রহমান খানকে ফোন করে মোটরসাইকেলটি বাসায় পৌঁছে দিতে বলেন তিনি। সেদিন রাত ১২টার দিকে জাফর বাংলাদেশ স্পাইন অ্যান্ড অর্থোপেডিক হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। ৬ অগাস্ট থেকে ৮ অগাস্ট পর্যন্ত লালমাটিয়ার সিটি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতাল থেকে জাফরের চিকিৎসার নথি পর্যালোচনা করা হয়। তাতে দেখা যায়, এজাহারে বর্ণিত জুলাই আন্দোলনের সময় আল্লাহ করিম বাসস্ট্যান্ডে (মোহাম্মাদপুর বাসস্ট্যান্ড) মারধরে আহত হননি তিনি। প্রকৃত ঘটনা গোপন রেখে জুলফিকার আলী ভুট্টো, হেলাল উদ্দিন, আব্দুল্লাহ শাহীন, আব্দুর রহমানদের সঙ্গে মনোমালিন্যের জের এবং তার বাবার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারী-কর্মকর্তাদের ফাঁসাতে মিথ্যা বিবরণ দিয়ে মামলা করেন।
জুলাই আন্দোলনে আহত ও শহীদদের গেজেট পর্যালোচনা করেও জাফর আহমেদের আহত হওয়ার তথ্য মেলেনি বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরেন তদন্ত কর্মকর্তা।
