গৃহকর্মী নির্যাতন: তদন্তে ভয়াবহ চিত্র, অভিযোগপত্রে বিমানের সাবেক এমডিসহ ৪ জন
“শরীরের ক্ষতের দাগগুলো এখনো রয়ে গেছে…টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছি না,” বলছেন গৃহকর্মীর বাবা।
সাড়ে আট মাস আগে যে মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর চাকরি খোয়ান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এমডি সাফিকুর রহমান, সেই গৃহকর্মী নির্যাতন মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ।
সাফিকুর, তার স্ত্রী বীথি আক্তার এবং দুই গৃহকর্মী রুপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগমের বিরুদ্ধে দেওয়া এ অভিযোগপত্রে ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র বর্ণনা করা হয়েছে। গত ৩১ আগস্ট আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা-পশ্চিম থানার এসআই রোবেল মিয়া।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তদন্ত শেষে গত মাসে চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছি। মামলার ঘটনা সত্য।
“ভিকটিমকে কীভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল, তা অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়েছে।”
মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় গত ২৩ সেপ্টেম্বর তা পাঠানো হয় ঢাকার নবম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। সেখান থেকে মামলাটি পাঠানো হয় ঢাকার সপ্তম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক সোহেল রানার কাছে।
মামলার বাদী গোলাম মোস্তফা বলেন, “আসামিদের বিচার চাই। আমার মেয়েকে এমনভাবে নির্যাতন করেছে, অন্যদের সঙ্গে যেন এমনটা না করতে পারে। দৃষ্টান্তমূলক সাজা চাই।
“আসামিদের উপযুক্ত বিচার না হলে আত্মহত্যার হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আমি আদালতেই আত্মহত্যা করব’।”
মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকার আশুলিয়া এলাকায় থাকছেন মোস্তফা।
মেয়ের কথা তুলে ধরে মোস্তফা বলেন, “শরীরের ক্ষতের দাগগুলো এখনো রয়ে গেছে। চোখ দিয়ে পানি পড়ে। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছি না।”
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সাফিকুর-বীথি দম্পতির বাচ্চাকে দেখভালের জন্য শিশু গৃহকর্মী আনা হয়। তবে কিছুদিন পর থেকেই ‘কোনো কারণ ছাড়াই’ এ গৃহকর্মীর ওপর ‘নির্যাতন’ চালানো শুরু করেন বীথি। গৃহকর্ত্রীর দেখাদেখি ও তাঁর নির্দেশে দুই বয়স্ক গৃহকর্মী রুপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগমও শিশুটির ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করেন।
শিশুটিকে দিয়ে কাজ করিয়ে ঠিকমতো খাবার না দিয়ে দিনের পর দিন বাথরুমে আটকে রাখা হতো বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষায়, “ভিকটিম বাথরুম থেকে বের হতে চাইলে তাকে বের হতে দিত না। বাঁচার জন্য সে বাথরুমের পানি, দাঁত মাজার পেস্ট খেত। আবার তাকে বাথরুম থেকে বের করে কাজ করাত।
“অসুস্থ হয়ে সে কাজ করতে না পারলে বীথিসহ তার দুই গৃহকর্মী মিলে রান্না করার লোহার খুন্তি চুলার আগুনে গরম করে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দিত। বাঁশের (কঞ্চি) লাঠি দিয়ে আঘাত করত।
“ভিকটিমের বাবা দেখা করতে আসলে দেখা করতে দিত না। দেখা করতে দিলেও বড় জামাকাপড় পরিয়ে দেখা করাত। বীথিসহ কাজের বুয়ারা পাশে দাঁড়িয়ে থাকত।”
বাবার সঙ্গে নির্যাতনের শিকার শিশুটি।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, শিশু গৃহকর্মীর ওপর নির্যাতনের সীমা অতিক্রম করার পর সে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে তার বাবাকে ডেকে আনেন বীথি। ‘ভুলভাল’ বুঝিয়ে তাকে তার বাবার হাতে তুলে দেওয়া হয়।
সাফিকুরের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, স্ত্রী বীথি গরম খুন্তি দিয়ে একটি শিশুর শরীরে দিনের পর দিন নির্যাতন চালিয়ে এলেও তখনকার বিমান এমডি দেখেও না দেখার ভান করে থাকতেন। স্ত্রীর অন্যায় অপরাধের দায় সাফিকুর কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না।
সাফিকুর রহমানের আইনজীবী আরিফুর রহমান বলেন, “শিশুটি আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। সেখানে সে বলেছে, ‘এমডিকে কখনো দেখেনি’।
“আর চার্জশিট আসলেই কেউ অপরাধী হয়ে যায় না। আমরা ট্রায়াল ফেস করব।”
তিনি বলেন, “উনার দ্বারা এমন কাজ করা সম্ভব না। উনি একটা উচ্চপদে চাকরি করেছেন।
“তার দুটি বাচ্চা আছে। দুজন কাজের লোক ছিল। উনি সবদিকে খেয়াল রাখতে পারেননি।”
জবানবন্দিতে কে কী বলেছিলেন
গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তারের কাছে নিজের ওপর নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে শিশুটি।
শিশুটি বলে, তার কাজ ছিল ‘এমডি স্যারের’ বাচ্চাকে দেখেশুনে রাখা। বাচ্চা মাটিতে কিছু ফেললে সেগুলো উঠিয়ে রাখা। কিন্তু তাকে নেওয়ার পর থেকেই বীথি খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দিত। চিৎকার করলে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে মারত। পায়ের রানে, দুই হাতে, পিঠে গরম খুন্তি দিয়ে মারত। চোখের মধ্যে মরিচের গুঁড়া দিয়ে চেপে ধরত। তার বাবা আসলে বড় জামা পরিয়ে সামনে পাঠাতেন। ‘ম্যাডাম’ ও বুয়ারা সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতেন। ওই বুয়ারাও তাকে খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দিত। লাঠি দিয়ে মারত। পুতা (নোড়া) দিয়ে দাঁত ভেঙে দিয়েছে।
শিশুটি বলে, তাকে বাসায় নেওয়ার পর থেকেই বাথরুমে রাখা হতো। পানিতে থাকতে থাকতে পায়ে পচন ধরে যায়। পুরো শীতে কোনো শীতের কাপড় দেয়নি। ওইখানে যাওয়ার পর কোনো খাবার খায়নি। পেস্ট এবং বাথরুমের পানি খেয়ে থেকেছে। ‘স্যারের’ সামনে যেতে দিত না। ওই বাসায় যাওয়ার পর থেকেই ম্যাডাম ও কাজের অন্য বুয়ারা বাথরুমে আটকে রাখত।
এরপর ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইসমাইলের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বীথি। শিশুটিকে ৩-৪ দিন বিভিন্ন সময়ে মেরেছেন বলে স্বীকার করেন তিনি।
তবে তার জবানবন্দিতে শিশুটিকে ভয়াবহ নির্যাতনের কোনো বর্ণনা আসেনি।
গৃহকর্মী সুফিয়া বেগমও আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
তিনি বলেছেন, শিশুটি তার বিরুদ্ধে বীথির কাছে নারিকেল তেল ও সাবান চুরির ‘মিথ্যা অভিযোগ’ তোলে। এ কারণে দুই দিন তিনি শিশুটিকে মেরেছেন।
শিশুটিকে নির্যাতনের ঘটনায় তার হোটেল কর্মচারী বাবা গত ১ ফেব্রুয়ারি সাফিকুর রহমান, তার স্ত্রী বীথি, বাসার দুই গৃহকর্মী রুপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগমের নামে মামলা করেন। এরপর ওই রাতে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জামিন পান সাফিকুর রহমান ও রুপালী খাতুন। তবে কারাগারে রয়েছেন বীথি ও সুফিয়া বেগম।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরে সাফিকুর রহমানের বাসার নিরাপত্তাকর্মী জাহাঙ্গীর ছোট শিশুদের দেখাশোনার জন্য ১১ বছরের আরেক শিশুকে গৃহকর্মী হিসেবে খুঁজে দেন। মেয়েটির বিয়েসহ যাবতীয় খরচ বহনের প্রতিশ্রুতি পেয়ে তার হোটেল কর্মচারী বাবা গত বছরের জুন মাসে সাফিকুর রহমানের বাসায় তাকে পাঠান। সবশেষ গত বছরের ২ নভেম্বর ওই বাসায় গিয়ে মেয়েকে দেখে আসেন বাবা।
এরপর আর মেয়েটিকে পরিবারের সঙ্গে ‘দেখা করতে দেওয়া হয়নি’ বলে অভিযোগ করা হয় মামলায়।
সেখানে বলা হয়, ৩১ জানুয়ারি সাফিকুরের স্ত্রী ফোন করে গৃহকর্মী মেয়েটির অসুস্থতার কথা বলে তাকে নিয়ে যেতে বলেন। পরে মেয়েকে আনতে গিয়ে শরীরে ‘অমানবিক নির্যাতনের’ চিত্র দেখতে পান বাবা। পরে তাকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
