চা শিল্পকে কৃষি খাতে নিলে শ্রমিকদের ‘উন্নয়ন হবে না’, বলছেন হোসেন জিল্লুর
“মালিকদের সঙ্গে সরকার বসছে। আমাদের সঙ্গে কোনো আলাপ করেনি,” বলেন চা শ্রমিক নেতা নৃপেন পাল।
চা খাতের উন্নয়নে এটিকে শিল্প থেকে কৃষি খাতে নেওয়ার সরকারি টাস্কফোর্সের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান।
এই উদ্যোগের ফলে উদ্যোক্তারা লাভবান হবেন, কিন্তু শ্রমিকদের কোনো উন্নয়ন হবে না বলে মনে করেন তিনি।
বুধবার রাজধানীতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এ সংক্রান্ত এক পরামর্শ সভায় হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, চা শিল্পকে কৃষি খাতে নিয়ে যাওয়া মানে বৈষম্যকে আরও উৎসাহিত করা।
“চা খাতে বৈষম্য সবচেয়ে বেশি। এখানে মালিকরা লাভবান হলেও শ্রমিকরা উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।”
‘বাংলাদেশ চা শিল্প পুনর্গঠন: চা শ্রমিকের ওপর এর প্রভাব’ শীর্ষক সভায় হোসেন জিল্লুর বলেন, “সরকারের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচি রয়েছে। এবার সরকার সৃজনশীল অর্থনীতির কথাও বলছে। কিন্তু অন্তর্ভুক্তি করতে গিয়ে চা খাতকে কৃষিতে নিয়ে যেতে চাচ্ছে।
“এটি করলে চা কোম্পানি উদ্যোক্তারা লাভবান হবেন। স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ পাবেন। কিন্তু শ্রমিকদের কোনো উন্নয়ন হবে না।”
হোসেন জিল্লুর বলেন, “এখানে চা শ্রমিকদের স্বার্থ উপেক্ষা করা হয়েছে। এখানে বিদেশি গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীলতা দেখা যাচ্ছে।”
চা শিল্প পুনর্গঠনে সরকার একটি টাক্সফোর্স গঠন করে চলতি বছরে, যার চেয়ারম্যান করা হয় রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল টি কোম্পানির চেয়ারম্যানকে।
সেই টাক্সফোর্স ৫৯টি সুপারিশ জমা দেয়। যার মধ্যে ১০টি প্রকাশ করা হয়েছে বলে সভায় জানানো হয়।
টাক্সফোর্সের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে- চা শিল্পকে কৃষিতে নিয়ে যাওয়া, কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা, দুই হাজার ৫০ কোটি টাকার চা খাত সহায়তা তহবিল গঠন, ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা, সব পর্যায়ে ব্যয় কমানো ও প্রতি বছরে ২-৩ শতাংশ চারা নতুন করে লাগানো এবং পুরনো চা গাছ এভাবে কেটে ফেলা।
সেই সুপারিশের পর সরকার ১২ সদস্যর একটি মনিটরিং ও অ্যাডভাইজারি কমিটি গঠন করে গত অগাস্টে।
বাণিজ্যমন্ত্রীকে চেয়ারম্যান করে সেই কমিটিতে সদস্য হিসেবে রাখা হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, গভর্নর, ভূমি সচিব, অর্থ সচিব, কৃষি সচিব, এনবিআর চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশীয় চা সংসদ-বিটিএ এর সাবেক চেয়ারম্যান এম. ওয়াহিদুল হক ও বাংলাদেশ টি ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ও বাণিজ্য সচিবকে।
এ কমিটিতে কোনো শ্রমিক প্রতিনিধি রাখা হয়নি দাবি করে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন, “মালিকদের সঙ্গে সরকার বসছে। আমাদের সঙ্গে কোনো আলাপ করেনি। এমনকি আমাদের কোনো প্রতিনিধিও রাখা হয়নি পুনর্মূল্যায়ন কমিটিতে।”
তাতেই, বোঝা যায় সরকার শুধু মালিকদের নিয়ে বসবে। মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করলে তো শ্রমিকদের বিষয়ে কেউ বলবে না।”
চা শ্রমিক খায়রুন আক্তার বলেন, “আমি চা শ্রমিক, এটাই আমার পরিচয়। আমি আমার পরিচয় হারাতে চাই না। চা শিল্পকে কৃষিতে নিলে সড়কে নামব, আন্দোলন করব।”
সরকারের বাইরে গিয়ে চা শিল্পের উন্নয়নে বিকল্প একটি প্রস্তাব দেওয়ার পরামর্শ এসেছে শ্রম সংস্কার কমিশনের সাবেক কমিশনপ্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদের কাছ থেকে।
তিনি বলেন, “আমরা সচেতন মানুষরা একটি প্রস্তাব দিতে পারি। যেখানে শ্রমিকদের উন্নয়নের কথাও বলা হবে।”
নারী অধিকার কর্মী খুশি কবির বলেন, “শুধু মালিক পক্ষকেই গুরুত্ব দিলে তো চা খাতের উন্নয়ন হবে না। শ্রমিকদের কথাও বিবেচনায় নিতে হবে। সব কমিটিতে শ্রমিক প্রতিনিধি রাখা চাই।”
সোসাইটি ফল এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট-এসইএইচডি, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্রাত্যজন রিসার্চ সেন্টার (বিআরসি) যৌথভাবে এই পরামর্শ সভাটি আয়োজন করে।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসইএইচডির পরিচালক ফিলিপ গাইন।
তিনি বলেন, টাক্সফোর্সের হিসাবে দেশে এক লাখ দুই হাজার স্থায়ী ও ৪০ হাজার অস্থায়ী শ্রমিক রয়েছেন।
চা শিল্পকে কৃষি পণ্য ঘোষণা করার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়ে ফিলিপ গাইন বলেন, চা শিল্পকে পুনর্গঠন করতে শ্রীলঙ্কার মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে। তারা এ খাতে সফল হয়েছে।
